কোন ব্যক্তিত্বের মানুষ বেশি আয় করেন, গবেষণা যা বলছে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, একই ধরনের দক্ষতা; তারপরও দুজন মানুষের আয় কেন এক নয়? কেউ চাকরিতে দ্রুত এগিয়ে যান, কেউ ব্যবসায় ভালো করেন, আবার কেউ একই জায়গায় দীর্ঘদিন থেকেও খুব বেশি আয় করতে পারেন না। এর পেছনে শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সুযোগের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিত্বেরও কিছু ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিত্বের মানুষ হলেই বেশি আয় করবেন। গবেষণায় বরং কিছু ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি আয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

২০২৩ সালে জার্নাল অব ইকোনমিক সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ব্যক্তিত্ব ও আয়ের সম্পর্ক নিয়ে ৬২টি গবেষণার ফল একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলাবোধ এবং মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারার মতো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি আয়ের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত অন্যের মন জোগানোর প্রবণতা ও আবেগের অস্থিরতার সঙ্গে আয়ের সম্পর্ক কিছুটা কম।

২০২৪ সালে বুলেটিন অব ইকোনমিক রিসার্চে প্রকাশিত আরেকটি মেটা-অ্যানালাইসিসেও প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। গবেষক মেলচর ভেলা বিভিন্ন গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলাবোধ এবং বহির্মুখিতার সঙ্গে তুলনামূলক বেশি আয়ের সম্পর্ক আছে। তবে আয়ের ওপর এককভাবে ব্যক্তিত্বের প্রভাব খুব বেশি নয়। বরং শিক্ষা, পারিবারিক পটভূমি, জ্ঞানগত সক্ষমতা, কাজের অভিজ্ঞতা ও পেশার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

Harvard graduate loses one-third of his six-figure income to AI, turns to a  tech-resistant skill for career switch - The Economic Times

নতুন কিছু শেখার আগ্রহ যাদের বেশি

আপনি কি নতুন কিছু শিখতে পছন্দ করেন? পুরোনো পদ্ধতির বদলে নতুনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেন? নতুন কোনো ধারণা শুনলে সেটি নিয়ে ভাবেন? এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে গবেষণায় ‘ওপেননেস’ বলা হয়। এর সঙ্গে আয়ের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও জ্ঞানগত সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক দেখা গেছে।

বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রের কথাই ধরা যাক। প্রযুক্তি, ব্যাংকিং, গণমাধ্যম, বিপণন, সফটওয়্যার বা অনলাইন ব্যবসার মতো অনেক ক্ষেত্রেই কাজের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ থাকলে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে। নতুন দক্ষতা অর্জন বা নতুনভাবে সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতাও কিছু পেশায় বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তবে কৌতূহলী হলেই যে বেশি আয় হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

What we learned from the biggest study on guaranteed income programs

দায়িত্বশীল ও গোছানো মানুষ

যারা কাজ সময়মতো শেষ করেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যান না, পরিকল্পনা করে এগোন এবং লক্ষ্য পূরণে নিয়মিত কাজ করেন; তাদের বৈশিষ্ট্যকে গবেষণায় ‘দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলাবোধ’ বলা হয়। এই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও আয়ের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

চাকরি হোক কিংবা ব্যবসা; সময় মেনে কাজ করা, কথা রাখার চেষ্টা করা, হিসাব-নিকাশ ঠিক রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার মতো অভ্যাস একজন মানুষকে কর্মক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে পেশাগত উন্নতির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

বহির্মুখীরা কি কিছুটা এগিয়ে?

যারা সহজে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এবং নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেন, তাদের বলা হয় বহির্মুখী। গবেষণায় বহির্মুখিতার সঙ্গেও তুলনামূলক বেশি আয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর কিছু সহজ উদাহরণ আছে। বিক্রয়, বিপণন, জনসংযোগ, গণমাধ্যম, ব্যবসা বা এমন চাকরিতে যেখানে নিয়মিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, সেখানে যোগাযোগের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, নিজের কাজ বা ধারণা তুলে ধরা এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরি করাও কখনো কখনো সুযোগ বাড়াতে পারে।

কিন্তু এখানেও বিষয়টি এত সহজ নয়। শুধু বেশি কথা বলা বা সামাজিক হলেই বেশি আয় হবে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। শিক্ষা, দক্ষতা, পেশা ও শ্রমবাজারের সুযোগ বিবেচনায় নিলে বহির্মুখিতার সঙ্গে আয়ের সম্পর্কও কিছুটা দুর্বল হয়ে আসে।

How Universal Basic Income changes the future | Mashable

তাহলে অন্তর্মুখীরা কি পিছিয়ে

একেবারেই নয়। গবেষণায় এমন কথা বলা হয়নি যে, অন্তর্মুখী মানুষ কম আয় করেন। ব্যক্তিত্ব ও আয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তা মূলত গড় প্রবণতা। এটি কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আয়ের হিসাব নয়।

বরং কোন ধরনের কাজ করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সঙ্গে সারাক্ষণ যোগাযোগের প্রয়োজন এমন কাজে বহির্মুখিতা সুবিধা দিতে পারে। আবার গভীর মনোযোগ, বিশ্লেষণ, গবেষণা, লেখালেখি বা একা বসে দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষেত্রে অন্তর্মুখী বৈশিষ্ট্য ভালো কাজে আসতে পারে।

তাই ‘বহির্মুখী হলেই বেশি আয়’ এমন কোনো সূত্র নেই।

কেবল ব্যক্তিত্ব দিয়ে আয় নির্ধারিত হয় না

একজন মানুষের শিক্ষা, পারিবারিক পটভূমি, জ্ঞান, কাজের অভিজ্ঞতা, পেশা, কোন শিল্পখাতে কাজ করছেন এবং শ্রমবাজারে কী ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন, এসব বিষয়ও আয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় এসব বিষয় হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আয়ের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে আসে।

তাই একই ধরনের ব্যক্তিত্বের দুজন মানুষের আয় সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। অর্থাৎ, ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু কোথায় জন্মেছেন, কী শিখেছেন, কী কাজ করছেন এবং কী ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন, এসবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Employee or Capitalist? Equity Compensation Merges the Two - UCLA Anderson  Review

আয় কি মানুষের ব্যক্তিত্ব বদলে দেয়

২০২৬ সালে সাইকোলজিক্যাল বুলেটিনে প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি মেটা-অ্যানালাইসিসে ব্যক্তিত্ব ও আয়ের সম্পর্ককে দুই দিক থেকে দেখা হয়েছে। ১১টি বড় গবেষণার প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, দায়িত্বশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আয়ের ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।

একই সঙ্গে বেশি আয়ের পর মানুষের দায়িত্বশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তনের সঙ্গেও একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ব্যক্তিত্ব যেমন আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তেমনি কাজ ও আয়সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাও সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আনতে পারে।

এই গবেষণাগুলোর সবচেয়ে বাস্তব শিক্ষা হলো, বেশি আয় করার জন্য নিজের ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে হবে বিষয়টি এমন নয়।