কাজটা তো এআই দিয়েই করা যাবে, তাহলে আপনাকে আর কী দরকার?
শুনতে কঠিন লাগলেও, খুব শিগগির চাকরির ইন্টারভিউতে এই প্রশ্ন শুনতেই হতে পারে যে, কাজটা তো এআই দিয়েই করা যাবে, তাহলে আপনাকে আর দরকার কী?
সম্প্রতি এক তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হয়েছে, হাতে ডিগ্রি, কয়েকটি ইন্টার্নশিপ, লিংকডইনে সুন্দর প্রোফাইল; কিন্তু মাথায় দুশ্চিন্তা, ‘এআই তো এখন সব করতে পারে। আমরা যারা নতুন, আমাদের চাকরি হবে তো?’
প্রশ্নটা শুনে আমার নিজের প্রথম চাকরির দিনের কথা মনে পড়ল। তখন এআই নিয়ে ভয় ছিল না, ভয় ছিল অন্যরকম। আমি এত কিছু শিখেছি, কিন্তু আসলে কী করতে পারি? আজকের তরুণদের সমস্যাটা একটু আলাদা। তাদের প্রতিযোগিতা কেবল তার মতোই অন্য একজন ব্যক্তির সঙ্গে নয়, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গেও। তাদের প্রতিযোগী কয়েক সেকেন্ডে একটা প্রতিবেদন লিখতে পারে, প্রেজেন্টেশন বানাতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কোড লিখতে পারে, ছবি বানাতে পারে, এমনকি ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতিও করিয়ে দিতে পারে।
তাহলে নতুন গ্র্যাজুয়েটরা করবেন কী?
প্রথম কথা, এআইকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। বরং একটা বিষয় মেনে নেওয়া ভালো, কাজের কিছু অংশ এআই আপনার চেয়ে ভালো ও দ্রুত করবেই। এটা খারাপ খবর নয়। একজন গ্রাফিক ডিজাইনারের প্রাথমিক ড্রাফট এআই বানিয়ে দিতে পারে, একজন কমিউনিকেশন কর্মকর্তার প্রথম ড্রাফট লিখে দিতে পারে, একজন গবেষকের জন্য শত শত নথির মূল কথা বের করে দিতে পারে।
কিন্তু একটা মজার বিষয় আছে। এআই মানুষের চেয়ে দ্রুত প্রতিবেদন লিখতে পারলেও যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘এই রিপোর্টে কোন কথাটা বলা উচিত নয়’, কিংবা ‘এই গল্পটা আমাদের টার্গেটেড অডিয়েন্সের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ’, তখন বিষয়টা একটু বদলে যায়।
চাকরিদাতারা কেবল একজন কনটেন্ট প্রস্তুতকারী খোঁজেন না। তারা এমন একজন চান, যিনি বুঝতে পারবেন যে কী করতে হবে, কেন করতে হবে এবং কার জন্য করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েই ‘সব জানি’ ভাবার দরকার নেই। সদ্য গ্র্যাজুয়েট হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে ‘আপনি এখনও শিখতে পারেন’। আপনার হয়তো পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু যদি নতুন কোনো সফটওয়্যারের কাজ শিখতে পারেন, ডেটা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, একটা সমস্যাকে ভিন্নভাবে দেখতে পারেন, তাহলে আপনার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সিভির অভিজ্ঞতা কলামে লেখা যায় না।
অনেক সময় দেখি, তরুণরা ইন্টারভিউয়ের আগে নিজের স্কিলের একটা লম্বা তালিকা তৈরি করে—এমএস ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এমএস এক্সেল, ক্যানভা, এআই টুলস, কমিউনিকেশন, লিডারশিপ ইত্যাদি।
সবই ভালো। কিন্তু, ইন্টারভিউয়ের সময় যদি জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি এক্সেল জানেন। সেটা দিয়ে শেষবার কী সমস্যা সমাধান করেছিলেন?’ তখন অনেকেই থেমে যান। সেখানেই আসল পার্থক্য তৈরি হয়। টুল জানাটা স্কিল নয়, সেটা ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করতে পারাটাই স্কিল।
একটা ছোট উদাহরণ দিই। ধরুন, একটি এনজিওর সোশ্যাল মিডিয়া টিমে ইন্টার্নশিপ করছেন। আপনাকে বলা হলো, ‘একজন নারী কৃষকের গল্প লিখুন।’ আপনি এআইকে বললেন, ‘একজন নারী কৃষক সম্পর্কে উৎসাহমূলক কনটেন্ট লিখে দাও।’ এআই সুন্দর একটা গল্প লিখে দিলো। কিন্তু আপনি যদি মাঠে গিয়ে একজন নারী কৃষকের সঙ্গে ৩০ মিনিট কথা বলেন, তাহলে হয়তো জানতে পারবেন যে তিনি প্রথম প্রথম সমবায় মিটিংয়ে কথা বলতে ভয় পেতেন, নিজের আয় সম্পর্কে পরিবারের সামনে বলতে সংকোচ করতেন এবং সেই তিনিই এখন অন্য নারীদের নিয়ে সঞ্চয় গ্রুপ চালান। তাহলে আপনি শুধু একটা গল্প পেলেন না, একজন মানুষকেও বুঝলেন। এই পার্থক্যটাই ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আরেকটা জিনিস শেখা উচিত। সেটা হলো, প্রশ্ন করা। সদ্য গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলোর একটি হলো, সব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করবেন না, কিন্তু ভালো প্রশ্ন করতে শিখুন। ‘কেন এই প্রজেক্ট করা হচ্ছে?’, ‘কৃষক এটা গ্রহণ করছেন না কেন?’, ‘এই ডেটা কোথা থেকে এসেছে’, ‘আমরা যে গল্পটা বলছি, উপকারভোগী কি একইভাবে দেখছেন?’, ‘এই ক্যাম্পেইনের আসল অডিয়েন্স কে?’, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আপনার ভেতরে থাকতে হবে।
কোনো সিনিয়র কাজ দিলে ‘ঠিক আছে’ বলার আগে একবার জিজ্ঞেস করুন, ‘এর মূল উদ্দেশ্যটা কী?’ এই একটি প্রশ্ন আপনার কাজের মান অনেক বদলে দিতে পারে।
এআই ব্যবহার করুন, কিন্তু নিজের মাথার ব্যবহার বন্ধ করে না
এআই দিয়ে সিভি বানান, প্রেজেন্টেশনের কাঠামোটা তৈরি করুন, গবেষণার শুরুটা দ্রুত করুন, বানান ও ব্যাকরণ ঠিক করুন, কোনো আইডিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করুন, পরিসংখ্যানের সূত্র খুঁজুন; কিন্তু এআই যা বলল, সেটাকেই সত্য ধরে নেবেন না। তথ্যগুলো যাচাই করুন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গল্পের মানুষটির সঙ্গে কথা বলুন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের মাথা ব্যবহার করুন। কারণ, আগামী দিনের চাকরির বাজারে হয়তো দুই ধরনের মানুষ থাকবে—প্রথমত, যারা এআই ব্যবহার করে কাজ করে এবং দ্বিতীয়ত, যারা এআইয়ের ফলাফল নিয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কাজ করে। আর দ্বিতীয় দলটির চাহিদা বেশি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
একইসঙ্গে নিজেকে খুব তাড়াতাড়ি ‘বিশেষজ্ঞ’ বানানোর চেষ্টা করবেন না। প্রথম চাকরিতে হয়তো আপনাকে বড় কোনো জায়গায় কাজ দেওয়া হবে না, হয়তো মিটিংয়ের কার্যবিবরণী লিখতে হবে, ডেটা বিশ্লেষণ করতে হবে, ৫০টা কল করতে হবে, প্রেজেন্টেশন ঠিক করতে হবে। হয়তো সেখানে আপনার আইডিয়া কেউ শুনবেই না। কিন্তু, এসবের মধ্যেই শিখতে হবে। কারণ, ক্যারিয়ার অনেক সময় বড় কোনো সুযোগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় না, ছোট ছোট কাজ ভালোভাবে করার অভ্যাস থেকেই তৈরি হয়। আজ একটা ভালো ইমেইল লিখলেন, কাল একটা মিটিং ভালোভাবে পরিচালনা করলেন, পরশু এমন একজন সহকর্মীর সঙ্গে দারুণভাবে কাজ করলেন যার সঙ্গে কাজ করাকে সবাই কঠিন মনে করে। তারপর একসময় দেখবেন, আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য খোঁজা হচ্ছে।
তাহলে, এআইয়ের যুগে একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েটের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কী? আমার কাছে উত্তরটা খুব কঠিন মনে হয় না। উত্তরটা হলো, কৌতূহল বা প্রশ্ন করার অভ্যাস, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তা বোঝার ক্ষমতা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও শোনার ক্ষমতা, নতুন কিছু এলে তা শেখার মানসিকতা এবং অপর মানুষটির জায়গায় দাঁড়িয়ে বিষয়টা দেখার ক্ষমতা।
একইসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের চিন্তা নিজে করার অভ্যাস। কারণ, এআই আপনার হয়ে লিখতে পারে, প্রেজেন্টেশন বানাতে পারে, গবেষণার একটা বড় অংশ করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা আপনার কাছেই থাকবে—‘আপনি কী ভ্যালু যোগ করছেন?’ সেই উত্তরটা এখন থেকেই খুঁজতে শুরু করুন।
চাকরির বাজারে এআই আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এআইয়ের যুগে আপনার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে নিজের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয়। ভয় না পেয়ে শেখা শুরু করুন। কারণ, ভবিষ্যৎটা হয়তো এআইয়ের হাতে নয়। ভবিষ্যৎটা তাদের, যারা এআইকে কাজে লাগিয়ে আরও ভালো মানুষ, আরও ভালো চিন্তক ও আরও ভালো সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম।
আব্দুল্লাহ সেরু: একটি এনজিওতে যোগাযোগ ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত।