বগুড়ায় বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত ৬, চোখ উপড়ে নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদদাতা, বগুড়া

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়া প্রেসক্লাবে বিএনপি ও জামায়াত নেতারা এই বিষয়ে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

এর আগে গত রাতে নন্দীগ্রাম উপজেলার থালতা-মাঝগ্রাম ইউনিয়নের পারশুন গ্রামে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বগুড়া-৪ (কাহালু ও নন্দীগ্রাম) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে ভোট কেনার অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতাকে বিএনপির নেতাকর্মীরা আটক করেন। একে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে হয়।

তিনি বলেন, আবদুল মজিদ আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে জামায়াতের হয়ে কাজ করছেন। গত রাতে জামায়াত-শিবিরের কয়েকজন কর্মী নিয়ে তিনি পারশুন গ্রামে এক ভোটারের বাড়িতে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে টাকা বিতরণ করতে গিয়েছিলেন।

‘বিএনপি কর্মীরা দুজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশকে খবর দেন। কিন্তু পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মোটরসাইকেলে শত শত জামায়াত সমর্থক সেখানে পৌঁছে স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুদ রানার বাড়িতে হামলা চালান। তারা ভাঙচুর করেন এবং মজিদসহ দুইজনকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যান,’ অভিযোগ করেন মোশাররফ।

তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা মাসুদকে মারধর করেন, তার একটি চোখ উপড়ে ফেলেন এবং তার ভাইকেও মারধর করেছেন। মাসুদ বর্তমানে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন, তার একটি চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে।’

মোশাররফ বলেন, হামলার পর মাসুদকে তার স্ত্রী সালমা বেগম ও কলেজপড়ুয়া মেয়ে মীম আকতার হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক তার ডান চোখ হারানোর কথা জানান। সালমা মোবাইল ফোনে বিষয়টি তার বৃদ্ধা শাশুড়ি রাবেয়া বেওয়াকে জানান। ছেলের চোখে হারানোর কথা জানার পরপরই রাবেয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আজ রাত ৯টার গ্রামের বাড়িতে মাসুদের মায়ের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এর তীব্র নিন্দা জানান।

বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের এক ঘণ্টা পর প্রেসক্লাবে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন বগুড়া-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোস্তফা ফয়সাল।

তিনি বলেন, গতকাল নন্দীগ্রামে দুটি ‘দুঃখজনক’ ঘটনা ঘটেছে—‘জুলাই যোদ্ধা’ আসাদুল্লাহ আল গালিব ও আমাদের কর্মী ফারুকসহ কয়েকজনের ওপর হামলা এবং আমরা লোকজনদের আটকে রাখা।

ফয়সালের দাবি, গণভোট প্রচার শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিএনপি কর্মীরা গালিবের ওপর  হামলা করেন। এছাড়া ফারুকসহ কয়েকজনের ওপর হামলা চালিয়েছেন বিএনপি নেতা মাসুদ রানা ও তার ভাই রবিউল ইসলাম।

‘আমাদের কর্মীদের মারধর করা হয়েছে, মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিএনপি নেতার একটি বাড়িতে নিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল,’ বলেন তিনি।

ফয়সাল আরও বলেন, বিষয়টি আমি জানার আগেই স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল, কিন্তু পারশুন গ্রাম অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সেখানে পৌঁছাতে দেরি হয়। পরবর্তীতে আটক ব্যক্তিদের স্বজন ও দাঁড়িপাল্লার কিছু কর্মী-সমর্থক ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে আমাদের লোকজনকে উদ্ধার করেন। সেখানে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

‘বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো এবং আমরা দুজনই একমত যে, কাহালু-নন্দীগ্রামে আমরা কোনো সহিংসতা চাই না। তবে গতকাল যা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বারবার প্রশাসনকে বলেছি, একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জন্য। কিন্তু এখনো অনেক সন্ত্রাসী অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে,’ যোগ করেন ফয়সাল।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নন্দীগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘কিছু লোককে (জামায়াত কর্মী) আটকে রাখা হয়েছে—আমরা এমন খবর পেয়েছিলাম। তবে বিএনপি নেতাদের ওপর হামলার ঘটনাটি কখন হয়েছে সেই বিষয়টি আমার জানা নেই।’

যোগাযোগ করা হলে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক মঞ্জুর এ মুর্শেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মাসুদ রানার চোখে গুরুতর আঘাত রয়েছে। আরও কয়েকজন ভর্তি রয়েছেন। মাসুদের চোখের আঘাত গুরুতর।’

হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মাসুদ রানার ডান চোখের পাশের হাড় ভেঙে চোখে ঢুকে গেছে। চোখের অক্ষিগোলকের তরল বের হয়ে গেছে। তার ডান চোখ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এখান থেকে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে রেফার্ড করা হয়েছে।’