নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী রানী
প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে রংপুর–৩ আসনের (সদর ও সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা) স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী মানবাধিকারকর্মী আনোয়ারা ইসলাম রানী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
শনিবার রাতে রংপুর নগরীর নূরপুর এলাকায় 'ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার' নিজস্ব কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে তিনি অন্য কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানাননি।
আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে আমি রংপুর–৩ আসন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।’
এ সময় তিনি ভোটারদের উদ্দেশে হরিণ প্রতীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, তার এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি একটি নীতিগত ও আন্দোলনমুখী অবস্থান।
রানী আরও বলেন, ‘আমার এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যেন কোথাও কোনো ধরনের উত্তেজনা, সংঘাত কিংবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়—সে বিষয়ে আমি সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, তাদের সমর্থক এবং আমার নির্বাচনী কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। আমরা শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করি।’
কারো সঙ্গে আপোষ কিংবা ‘বিক্রি’ না হয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না, কষ্ট পাবেন না। আপনাদের রানী কারো কাছে বিক্রি হয় না, কারো সঙ্গে আপোষ করে না। এটি কোনো বিদায় নয়—এটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ়, নীতিগত ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার এই যৌক্তিক দাবির পক্ষে সংহতি জানিয়ে আপনারা আমার হাতকে শক্তিশালী করবেন। এতে করে হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হবে।’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সমাজের প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরে আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘সময় বদলেছে, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের প্রত্যাশিত পরিবর্তন এখনও আসেনি। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের মৌলিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। আমাদের ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’ বলা হয়—আমি এই শব্দটিকে মানি না। আমরা পিছিয়ে পড়া নই, বরং পিছিয়ে রাখা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আমরা মূলধারায় মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ চাই।’
রানী জানান, দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কাছে জুলাই জাতীয় সনদের ভবিষ্যৎ পথরেখা প্রণয়নের আগেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন কার্যকর করার দাবি জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন হলো এমন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়। নারীদের ক্ষেত্রেও একসময় এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।’
হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, ‘১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল ১৫টি, যা পর্যায়ক্রমে বেড়ে বর্তমানে ৫০টিতে পৌঁছেছে। এর সুফলে আমাদের মা ও বোনেরা রাষ্ট্র ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অথচ এই ৫০টি সংরক্ষিত আসনের একটিও হিজড়া বা অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ নেই।’
উল্লেখ্য, আনোয়ারা ইসলাম রানী ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি এবং সামাজিক উদ্যোগ ‘রূপান্তর’-এর উদ্যোক্তা। তিনি ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর–৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও, ঈগল প্রতীক নিয়ে ২৩ হাজার ভোট পেয়ে রানী তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।
রংপুর সদর উপজেলা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর–৩ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৬৯টি। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ২৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৯ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৫ জন।