বুলবুল স্বস্তিতে থাকলেও বিতর্ক তুঙ্গে
কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই এবং ভবিষ্যতে একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি—সোমবার লাহোরে নিজের ‘অবিশ্বাস্যভাবে সফল’ সফর শেষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল দারুণ রোমাঞ্চিত ছিলেন। তবে তার এই উদ্দীপনায় সবাই একমত হতে পারছেন না।
‘আইসিসি সম্ভবত এমন কিছু সিদ্ধান্তের কথা ভাবছিল যা আমাদের জন্য ভালো হতো না। কিন্তু আমরা পরিস্থিতি এমনভাবে সামাল দিয়েছি যাতে ভবিষ্যতে আমাদের ক্রিকেটের পথ চলা মসৃণ থাকে,’ সোমবার টি-স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দৃশ্যত স্বস্তিতে থাকা বুলবুল এ কথা বলেন।
গত রবিবার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির আমন্ত্রণে আইসিসি ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা এবং পিসিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় সংলাপে অংশ নিতে খুব অল্প সময়ের নোটিশে লাহোর উড়ে গিয়েছিলেন বুলবুল।
পরের দিন আইসিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করে যে, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারত ভ্রমণে অস্বীকৃতি জানানোর জন্য বাংলাদেশকে কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক জরিমানার মুখে পড়তে হবে না। এছাড়া ২০৩১ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে (যা ভারত ও বাংলাদেশের যৌথভাবে আয়োজন করার কথা) বাংলাদেশ একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের অধিকারও পাবে।
বিসিবি সভাপতি এই ঘটনাপ্রবাহকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার পর (যেখানে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়েছে) আইসিসির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমে আসার লক্ষণ হিসেবেই তারা এটিকে দেখছেন।
তবে বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক প্রশ্ন তুলেছেন, আইসিসি আদৌ কখনো বাংলাদেশকে শাস্তি দেওয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছিল কি না। কারণ অতীতে যেসব দল বিশ্বকাপ ম্যাচ বা আইসিসি ইভেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করেছে, তাদের কখনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।
‘তারা আগে কখনো কোনো দলকে জরিমানা করেনি। হয়তো চাপের মুখে রাখার জন্য মৌখিকভাবে এটা বলা হয়েছিল। আমরা যদি এটা নিয়ে উদযাপন করি, তবে বোঝা যায় আমাদের সংগঠকরা খেলার চেয়ে টাকার দিকেই বেশি মনোযোগ দেন,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন আশরাফুল।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই ক্ষতিকে ‘অপূরণীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন আশরাফুল। তিনি উল্লেখ করেন যে, লিটন দাস এবং মোস্তাফিজুর রহমান এর মতো খেলোয়াড়রা তাদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে একটি বিশ্ব আসর মিস করলেন, ‘অহংকারের কারণে বিশ্বকাপ মিস করা লক্ষ লক্ষ টাকা জরিমানার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর।’
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এবং আইসিসির সঙ্গে এই আলোচনা আরও আগে হওয়া উচিত ছিল, ‘আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি—আলোচনা করুন, আলোচনা করুন। আলোচনার মাধ্যমেই সব সমাধান সম্ভব।’
এদিকে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক এবং বিসিবির সাবেক পরিচালক আকরাম খান সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার আশঙ্কা, আইসিসির এই ইতিবাচক ঘোষণার নিচে হয়তো ক্ষোভ জমা হয়ে আছে, ‘আইসিসি বিষয়টিকে হালকাভাবে নেবে না। প্রকাশ্যে যাই বলা হোক না কেন, ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে চলার ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।’
আকরাম স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। তার মতে কিছু সিদ্ধান্ত হয়তো তাড়াহুড়ো করে নেওয়া হয়েছে, ‘আমি প্রাথমিক নিরাপত্তা উদ্বেগকে সমর্থন করি, কিন্তু অন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমাদের আরও আলোচনার জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল। আইসিসি ফিফার মতো নয়—এখানে অনেক সময় যা বলা হয় তা সঙ্গে সঙ্গে ফলে না। এর প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পারব।’
লাহোরের আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। বুলবুলসহ বিভিন্ন অংশীজনের অনুরোধে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি বয়কট করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে পাকিস্তান।
এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছিলেন যে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ম্যাচটি বয়কট করছেন। পিসিবিকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য রাজি করানোই ছিল লাহোরে আইসিসির জরুরি আলোচনার প্রধান কারণ।
আইসিসি তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পিসিবিকে শান্ত করতে কী করতে হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে না বললেও, তারা এটা নিশ্চিত করেছে যে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি (যা ক্রিকেটের বাণিজ্যিকভাবে অন্যতম মূল্যবান ম্যাচ) নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে।
আশরাফুল দাবি করেন, এক বড় ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে বাংলাদেশকে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এই ঘটনার মাধ্যমে পাকিস্তান এক শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এত শোরগোলের পর পাকিস্তান এবং অন্যান্য দলগুলো যথারীতি তাদের বিশ্বকাপ অভিযান চালিয়ে যাবে, আর বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চ থেকে অনুপস্থিতই থেকে যাবে।