যে ম্যাচে টিকিটের দাম ছিল একটি অস্ত্র
শনিবার সকালে বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হবে ব্রাজিল ও হাইতি। গ্রুপ ‘সি’ থেকে নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে দুই দলের জন্যই ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ফিলাডেলফিয়ায় ৯০ মিনিটের এই লড়াইয়ের আড়ালে আছে আরও গভীর এক গল্প। একটি সম্পর্কের গল্প, যেখানে ফুটবল একসময় হয়ে উঠেছিল শান্তির দূত।
আজ থেকে ২২ বছর আগে হাইতি ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষে বিপর্যস্ত ছিল। সেই সংকটময় সময়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের নেতৃত্বে ছিল ব্রাজিল। আর তখনই জন্ম নেয় এমন এক ম্যাচের, যা এখনও হাইতির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি।
২০০৪ সালের ১৮ আগস্ট পোর্ট-অ-প্রিন্সে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘ম্যাচ ফর পিস’ বা ‘শান্তির ম্যাচ’। মাত্র দুই বছর আগে বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিল দলকে নিয়ে হাইতিতে গিয়েছিল সেলেসাওরা। মাঠে এটি ছিল একটি প্রীতি ম্যাচ, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল আশা, ঐক্য ও শান্তির প্রতীক।
সাবেক ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার রজারের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল সেই সফর। তিনি বলেন, 'রোনালদো বলেছিল, বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্রাজিলে উদযাপনের সময়ও তারা এতটা ভালোবাসা পায়নি, যতটা হাইতির মানুষ তাদের দিয়েছিল। তারা ছিল অনেক কষ্টে থাকা মানুষ, কিন্তু ব্রাজিল দলকে ঘিরে তাদের আনন্দ ছিল অবিশ্বাস্য।'
ম্যাচের ফল ছিল ৬-০। তবে স্কোরলাইন সেদিন প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল। কারণ স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো মানুষের কাছে ব্রাজিলের তারকাদের সামনাসামনি দেখা ছিল স্বপ্নপূরণের মতো।
সাবেক ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার এদু গাসপার স্মরণ করেন, 'স্টেডিয়াম পুরোপুরি ভর্তি ছিল। আমি ভেবেছিলাম তারা শুধু রোনালদো, রোনালদিনিয়ো বা রবার্তো কার্লোসদের চিনবে। কিন্তু তারা আমাদের প্রত্যেকের নাম জানত। আমরা গোল করলেই তারা উল্লাস করছিল।'
হাইতির সাবেক ফুটবলার জেমস মার্সেলিন, যিনি ২০১৬ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের বিপক্ষে হাইতির একমাত্র গোলটি করেছিলেন, তখন ছিলেন শিশু। টেলিভিশনে দেখা সেই ম্যাচ এখনও তার মনে গেঁথে আছে।
'এটি ছিল বিশেষ একটি মুহূর্ত। উদ্দেশ্য ছিল দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা দেওয়া। তখন হাইতি খুব কঠিন সময় পার করছিল। তাই ম্যাচটি মানুষের কাছে অনেক বড় অর্থ বহন করেছিল,' বলেন মার্সেলিন।
সেই সফরের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলোর একটি ছিল বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত ব্রাজিল দলের যাত্রা। ব্রাজিলিয়ান সেনাবাহিনীর উরুতু সাঁজোয়া যানবাহনের ওপরে চড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন খেলোয়াড়রা। রাস্তার দুই পাশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে তাদের স্বাগত জানিয়েছিল।
এদু বলেন, 'অনেকবার যান থামাতে হয়েছিল। মানুষ সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল, শুধু আমাদের একটু কাছ থেকে দেখার জন্য, হাত ছোঁয়ার জন্য।'
সেই ম্যাচে খেলেছিলেন ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সাত সদস্য রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, রবার্তো কার্লোস, জিলবার্তো সিলভা, হুয়ান, রোকে জুনিয়র ও জুলিয়ানো বেলেত্তি। রোনালদিনিয়ো করেছিলেন হ্যাটট্রিক, রজার করেছিলেন দুটি গোল এবং নিলমার যোগ করেছিলেন আরেকটি।
মজার বিষয় হলো, ম্যাচটির একটি লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের হাতে থাকা অস্ত্র জমা দেওয়ার প্রচারণা চালানো। তাই টিকিট বিক্রি করা হয়নি প্রচলিত পদ্ধতিতে। অনেক দর্শক অস্ত্র জমা দিয়ে ম্যাচের টিকিট পেয়েছিলেন। প্রায় ১৫ হাজার দর্শক সেদিন স্টেড সিলভিও ক্যাটরে উপস্থিত ছিলেন।
এই মানবিক উদ্যোগের স্বীকৃতিও পেয়েছিল ব্রাজিল ফুটবল। ২০০৪ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) ফিফার ফেয়ার প্লে পুরস্কার জিতেছিল। একই অনুষ্ঠানে বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছিলেন রোনালদিনিয়ো।