অভিবাসন ও সীমান্তনীতি: প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে আজ রাতে। কিন্তু মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যেন আরেকটি ভিন্ন শিরোপার জন্যও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অনাতিথেয় আয়োজকদের অন্যতম হওয়ার শিরোপা। দেশটির কঠোর অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নীতি ফিফার দীর্ঘদিনের প্রচারিত অন্তর্ভুক্তি, বৈষম্যবিরোধিতা এবং 'সবার জন্য ফুটবল' নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

৪৮টি দেশ ও তিনটি আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাকে নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন। এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবে সেইসব বাধার কারণে, যা কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সহায়ক কর্মী এবং সমর্থকদের ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মহোৎসবে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করেছে।

যেখানে মেক্সিকো ও কানাডা খেলাধুলার মাধ্যমে একত্রিত হওয়া বৈশ্বিক সমাবেশের চেতনাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, সেখানে তিন আয়োজক দেশের মধ্যে সর্বাধিক ৭৮টি ম্যাচের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু নীতির কারণে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা কয়েকটি অংশগ্রহণকারী দেশের কাছে নিজেদের অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বৈপরীত্যটি মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর সেনেগাল দলের খেলোয়াড়দের বিমানবন্দরে কঠোর তল্লাশি ও রানওয়েতে আগ্রাসীভাবে শরীর তল্লাশির মুখোমুখি হতে দেখা যায়। অন্যদিকে মেক্সিকোর পুয়েব্লায় স্পেন দলকে স্বাগত জানানো হয় উৎসবমুখর পরিবেশে মারিয়াচি সংগীত, সোমব্রেরো টুপি এবং উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে।

অবশ্য এসব কিছুই খুব একটা বিস্ময়কর নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই অভিবাসন-সংক্রান্ত উদ্বেগ এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে ছিল। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ছিল তার ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। গত বছর ওয়াশিংটন ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার মধ্যে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী চারটি দেশ হাইতি, ইরান, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টও ছিল। ফলে এসব দেশের নাগরিকদের জন্য বিশ্বকাপ দেখতে আসা সমর্থকদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের ভিজিটর ভিসার সুপারিশ করে, তা কার্যত পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এর প্রভাব শুধু গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আইভরি কোস্টের ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য সাপোর্ট অব দ্য এলিফ্যান্টসের জুলিয়েন কুয়াদিও অ্যাডোনিস বিবিসিকে বলেন, 'এটি এমন এক ধরনের বৈষম্য, যার নাম উচ্চারণ করার সাহস করা হয় না, কিন্তু প্রমাণ সামনে রয়েছে। কোনো ইউরোপীয় দেশ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি। তাহলে আফ্রিকাই কেন?'

বিশ্বকাপে নিয়মিত সমর্থক পাঠানো তার সংগঠন শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনাই বাতিল করে। তবে অ্যাডোনিস বলেন, এর একটি ইতিবাচক দিকও ছিল—যুক্তরাষ্ট্রে টিকিটের আকাশছোঁয়া মূল্যের বোঝা তাকে বহন করতে হয়নি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনায় জড়িয়ে থাকা ইরান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি মোকাবিলা করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইরান তাদের অনুশীলন ক্যাম্প অ্যারিজোনার টাকসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি খেলোয়াড়দের ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে এবং ম্যাচের দিনই তাদের দেশ ছাড়তে হবে।

যদিও খেলোয়াড়রা শেষ পর্যন্ত ভিসা পেয়েছেন, ইরানের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক বিভাগের ১৫ জন সদস্য, যাদের মধ্যে ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও রয়েছেন ভিসা পাননি।

ইরানের ফুটবল ফেডারেশন আরও অভিযোগ করেছে যে, গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর জন্য তাদের বরাদ্দকৃত টিকিট যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করে দিয়েছে। ফলে তারা সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে সমর্থকদের কাছে টিকিট বিতরণ করতে পারেনি।

ইরাকও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেইনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগে প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে জানা গেছে। অন্যদিকে দলের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার তালাল সালাহ দীর্ঘ ভোগান্তির পর সম্পূর্ণরূপে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার হারান, যদিও তিনি ইরাকের ৫৩ সদস্যের সরকারি প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবেই সেখানে পৌঁছেছিলেন।

এমনকি ম্যাচ কর্মকর্তারাও রেহাই পাননি। গত বছর আফ্রিকার সেরা পুরুষ রেফারি নির্বাচিত হওয়া সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে তাকে 'অগ্রহণযোগ্য' হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করা প্রথম সোমালি রেফারি হওয়ার আরতানের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

বর্ধমান সমালোচনা এখন ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক সমর্থক, দলীয় কর্মকর্তা এবং একজন শীর্ষ রেফারির টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ থেকে বাদ পড়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান, 'আমি আশা করি বর্ণগত প্রোফাইলিং এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো এই বিশ্বকাপকে সেইভাবে প্রভাবিত করবে না, যেভাবে ইতোমধ্যেই করেছে।'

তিনি অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে 'বৃহৎ পরিসরে পুনর্বিবেচনার' আহ্বান জানান এবং অভিবাসী, শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের 'অমানবিকভাবে উপস্থাপন' করার প্রবণতা বন্ধ করার দাবি জানান।

এমন কঠোর নীতিমালার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনগুলোর আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কতটা উপযুক্ত, সে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। উদ্বেগ শুধু ফুটবলকে ঘিরেই নয়। ২০২৮ অলিম্পিকের আয়োজন করবে লস অ্যাঞ্জেলেস, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আরও বৈচিত্র্যময় ক্রীড়াবিদ, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের সমাগম ঘটবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন আইন প্রয়োগ নিয়ে শহরটিতে ইতোমধ্যেই গুরুতর উত্তেজনা দেখা গেছে। ফলে অলিম্পিক শক্তিধর চীনসহ বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে গ্রহণ করে, তা নিয়ে নজরদারি আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, চীন ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

এখন উদ্বেগ আর শুধু ফুটবলকে ঘিরে নয়। অনেকেই বিশ্বকাপকে এমন একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন, যেখানে বোঝা যাবে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত উন্মুক্ততার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে।

ফিফা বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া আয়োজক দেশগুলোর সার্বভৌম অধিকার। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি সত্য হতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সংস্কৃতি, পরিচয় ও মানুষের এক মহাউৎসব।

যখন সমর্থক, কর্মকর্তা, এমনকি রেফারিরাও অভিবাসনজনিত বাধার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেন না, তখন টুর্নামেন্টের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এসব নীতির কারণে বিশ্বকাপের উত্তরাধিকারে কী ধরনের ক্ষতচিহ্ন থেকে যাবে। আর এই প্রশ্নগুলো ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার অনেক পর পর্যন্তও ২০২৬ বিশ্বকাপকে অনুসরণ করে যাবে।