যে ছক্কায় নিজেকে অন্যভাবে চেনালেন সাইফ

একুশ তাপাদার
একুশ তাপাদার

পেছনের পা উঠিয়ে লেগ স্টাম্পের উপরে পড়া বলটা কব্জির মোচড়ে নান্দনিক ফ্লিকে উড়িয়ে দেন গ্যালারিতে।  নুয়ান তুশারার বলে সাইফ হাসানের চোখ ধাঁধানো ছক্কার ক্লিপ হয়ে গেছে ভাইরাল। মূলত তেমন কোন ব্যাকলিফট ছাড়াই কীভাবে এত শক্তি প্রয়োগ করলেন কৌতূহলী অনেকে। দেখে মনে হয়েছে পেছনের পা তুলে ফেলায় সামনের পায়ে ভারসাম্য তৈরি করে শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছেন ডানহাতি ব্যাটার।

সাইফের এরকম সামর্থ্যের কথা অনেকের কাছেই ছিলো অজানা। বরং টি-টোয়েন্টি দলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা ছিলো কিছুটা চমকে, অনেকেই তুলেছিলেন প্রশ্ন। নির্বাচকদের ধন্যবাদ এক্ষেত্রে প্রাপ্য, সাইফের মাঝে নিশ্চয়ই তারা এমন কিছু দেখেছিলেন। না হলে এত বড় মঞ্চে ভরসা করা কেন!

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৬৯ রান তাড়ায় প্রথম ওভারে ১ রানেই বিদায় নেন তানজিদ হাসান তামিম। এর আগে দেখা গেছে শুরুতে ধাক্কা খালি কিছুটা খোলসে ঢুকে পড়েন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। টি-টোয়েন্টিতে সময় কম থাকায় পরে তা হয়ে যায় বিপদের কারণ। সাইফ নেন প্রতি আক্রমণের পথ। তুশারা আর দুশমন্ত চামিরাকে চেপে বসতে না দিয়ে তাদের উপরই চেপে বসেন তিনি।

বয়সভিত্তিক দল থেকে সাইফের পরিচয় আঁটসাঁট টেকনিকের ব্যাটার। এক সময় কিছুটা সময় নিয়ে প্রথাগত শটে ইনিংস গড়তেন বলে লাল বলের ভবিষ্যৎ মনে করা হতো তাকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগও প্রথমে পান টেস্টে। দীর্ঘ পরিসরে সাইফের সেই যাত্রা এক ভোগান্তির নাম। ৬ টেস্ট খেলে কোন ফিফটি করতে পারেননি, গড় কেবল ১৪.৪৫ । সর্বোচ্চ পর্যায়ের জন্য তিনি প্রস্তুত কিনা এই প্রশ্ন উঠে জোরেসোরে। বাদ পড়ে আড়ালেও চলে যান দ্রুত।

সাইফের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি অভিষেক নাটকীয়ভাবে। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের বিপর্যয়ের পর দলে আনা হয় এক ঝাঁক বদল। তখন দায়িত্বে থাকা খালেদ মাহমুদ সুজন সাইফকে নিয়ে আসেন টি-টোয়েন্টি সেটআপে। বিস্ময়ের জন্ম হয়েছিলো তখন। সেই দফায় সাফল্য পাননি তিনি। সাইফ কেন? এই প্রশ্ন তখন নির্বাচকদের জন্য ছিলো অস্বস্তির।

এরপর যে তিনটা ম্যাচ খেলেছিলেন সেটা এশিয়ান গেমসে। সিনিয়র দল না খেলায় পরিসংখ্যানে থাকলেও এটাকে বাইরে রাখা যায়।

সাইফের মূলত ফেরা এবার এশিয়া কাপের ঠিক আগে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাকে নামিয়ে দিয়ে চমক দেওয়া হয়। এমন না যে গত বিপিএলে তিনি আহামরি কিছু করেছেন। সেরা দশের বাইরে থাকা সাইফ ১৩ ম্যাচে ২৫.৫০ গড় ও ১১৯.০৬ স্ট্রাইকরেটে করেন ৩০৬।

সাইফের দলে আসার কারণ হিসেবে বলা হয় টপ ও মিডল অর্ডারের ব্যাট করার সামর্থ্য, পাশাপাশি অফ স্পিন বোলিং। মোটামুটি টি-টোয়েন্টিতে কন্ডিশনের চাহিদায় তিনি একটা প্যাকেজ হতে পারেন এই ছিলো প্রত্যাশা।

সংক্ষিপ্ত সংস্করণের উপযোগী ক্রিকেটার হিসেবে সাইফ গত কয়েক মাসে নিজেকে বিকশিত করছিলেন। ডাচদের বিপক্ষে ফেরার ম্যাচে ১৯ বলে ৩৬ করে পাওয়ার হিটিংয়ের ট্রেলার দেখান।

এশিয়া কাপের সুপার ফোরের মঞ্চে দেখা গেল পুরো ছবি। সাইফ ছক্কা মেরেছেন চারটি। প্রতিটি শটেই ছিলো অথরিটি। ফিটনেস নিয়ে কাজ করেছেন বোঝা যায়। কোন শট প্রপার টাইমিং করতে মাথাটা স্থির রাখা খুব জরুরি। সাইফের মাঝে দেখা গেছে সেটা।

টেস্ট দলের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারতেন। তবে কোচ ও কাছের মানুষদের কাছে বার্তা পেয়েছেন তিনি স্রেফ টেস্ট নয়, সাদা বলেও ভালো করতে পারেন। নিজেকে সেভাবে বিবর্তন করতে কাজ করেছেন।

আপাতত স্রেফ শুরু। বড় মঞ্চে একটা ঝলকই দেখিয়েছেন, তিনি কে? কীভাবে এগুলেন এসব নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের গণমাধ্যমের হুট করে আগ্রহ বেড়েছে। কেউ যখন নজরে চলে আসেন তখন তার দুর্বলতা, শক্তি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে প্রতিপক্ষ। এরপর আসবে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। সাইফ নিজেকে চেনানোর কাজ করতে পেরেছেন, এখন এগুনোর পালা।