'স্থায়ী চাকরি না থাকাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ'
বাংলাদেশ নারী কাবাডির সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুখগুলোর একজন শ্রাবণী মল্লিক। সম্প্রতি তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশ প্রথমবারের মতো জাতীয় নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে, যার মাধ্যমে সাবেক চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির আধিপত্যের অবসান ঘটে।
নারী এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ ও নারী কাবাডি বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জজয়ী বাংলাদেশের দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শ্রাবণী জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, নারী কাবাডির অগ্রগতি এবং নিজের জীবনসংগ্রাম নিয়ে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের আনিসুর রহমানের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো—
দ্য ডেইলি স্টার: জাতীয় নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়াটা আপনার কাছে কেমন লাগছে?
শ্রাবণী মল্লিক: কাবাডি খেললেই আমি আনন্দ পাই, তবে সেরা খেলোয়াড় হওয়াটা সেই আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। এবার এই আনন্দ আরও বেশি, কারণ আমার দলে যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশ প্রথমবারের মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। টুর্নামেন্টটি ছিল ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি এবং বিজিবি সব দলেরই জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিল।
ডেইলি স্টার: আপনি আগে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির হয়ে খেলেছেন। পুলিশ দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?
শ্রাবণী: ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমি আনসার ও ভিডিপির হয়ে খেলেছি এবং দুবার চ্যাম্পিয়ন দলেও ছিলাম। ওই সময় আমি আনসারের হয়ে অ্যাথলেটিকস ও রেসলিংয়েও প্রতিনিধিত্ব করেছি। শটপুটে টানা সাতটি স্বর্ণপদক এবং ৭৬ কেজি রেসলিং বিভাগে পাঁচটি স্বর্ণপদক জিতেছি।
আমি একাধিকবার স্থায়ী চাকরির জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। সেই কারণেই চাকরির নিরাপত্তার আশায় বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিই। অন্তত এখন আগের চেয়ে ভালো বেতন পাচ্ছি।
ডেইলি স্টার: বাংলাদেশ পুলিশের হয়ে কি একাধিক ডিসিপ্লিনে খেলা চালিয়ে যাবেন?
শ্রাবণী: তিনটি ডিসিপ্লিন একসঙ্গে খেলা এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে এখন আমি দলের গুরুত্বপূর্ণ কাবাডি খেলোয়াড়। সামনে কী হয়, দেখা যাক।
ডেইলি স্টার: বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে জেতা পদকগুলোর হিসাব কি রাখেন?
শ্রাবণী: ২০১৪ সাল থেকে আমি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা শুরু করি এবং নিজের জেলা নড়াইলের হয়েও খেলেছি। আমার ধারণা, ব্যক্তিগত ও দলগত মিলিয়ে আমি শতাধিক পদক জিতেছি, যার মধ্যে স্বর্ণপদকই সবচেয়ে বেশি।
ডেইলি স্টার: বাংলাদেশ কাবাডির প্রসঙ্গে আসি, শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে আমাদের পার্থক্যটা কোথায়?
শ্রাবণী: দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের কারণে আমরা ব্রোঞ্জ জিততে পেরেছি, তবে ফিটনেস, দক্ষতা ও শারীরিক শক্তিতে এখনও পিছিয়ে আছি। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রক্ষণভাগে, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের গোড়ালি ধরতে না পারা এবং রেইডে বোনাস পয়েন্ট আদায়ে ব্যর্থতা। এই জায়গাগুলোতে আমাদের উন্নতি করতে হবে।
ডেইলি স্টার: এই খেলাটির বড় ঘাটতিগুলো কী বলে মনে করেন?
শ্রাবণী: কাবাডি খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা কোনো জিম নেই, যা বড় সমস্যা। অথচ ফিটনেস এই খেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুইমিং পুল বা আইস বাথ আমরা অন্য জায়গায় ব্যবহার করতে পারি, কিন্তু নিয়মিত জিম সুবিধা একান্ত প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আর্থিক নিরাপত্তা। অনেক খেলোয়াড়ই দরিদ্র পরিবার থেকে আসে এবং তাদের স্থায়ী চাকরি নেই। সম্মানী দেওয়া হলে তারা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হবে।
ডেইলি স্টার: ভবিষ্যতে কি জুনিয়র খেলোয়াড়রা সিনিয়রদের জায়গা নিতে পারবে?
শ্রাবণী: ফেডারেশন খেলোয়াড় তৈরির ধারা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, তবে নারী খেলোয়াড়ের সংখ্যা এখনও কম। কাবাডি যেহেতু শরীরঘেঁষা খেলা, তাই জুনিয়রদের ফিটনেস গড়ে তুলতে সময় লাগে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পেলে তারা একসময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করতে পারবে।
ডেইলি স্টার: খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়ে কোনো আক্ষেপ আছে?
শ্রাবণী: আছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হইনি। আমার বাবা–মা চেয়েছিলেন আমি পড়াশোনায় মন দিই, কিন্তু আমি খেলাধুলাকেই বেছে নিয়েছি। এখন ২৮ বছর বয়সে এসে, যখন আমার খেলোয়াড়ি জীবন শেষের পথে, তখন স্থায়ী চাকরি না থাকাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।