ডিজিটাল হয়রানি নিঃশব্দে তাড়া করে বেড়ায় নারী অ্যাথলেটদের

আনিসুর রহমান
আনিসুর রহমান
সামসুল আরেফীন খান
সামসুল আরেফীন খান
5 December 2025, 08:38 AM
UPDATED 5 December 2025, 14:48 PM

নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনের আন্তর্জাতিক দিবসকে কেন্দ্র করে ২৫ নভেম্বর শুরু হওয়া '১৬ দিনের অ্যাক্টিভিজম'-এর অংশ হিসেবে দ্য ডেইলি স্টার স্পোর্টস নজর দিয়েছে বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের ডিজিটাল হয়রানির অভিজ্ঞতার দিকে। নারী ক্রিকেটার রুমানা আহমেদ ও শুটার কামরুন নাহার কলি তুলে ধরেছেন ট্রল, ব্ল্যাকমেইল, বডিশেমিং ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানি কীভাবে তাদের আত্মবিশ্বাস, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা দেখায় দেশে সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অভিযোগ জানাতে বাধাগুলো কীভাবে এখনও রয়ে গেছে।

যখন কোনো অ্যাথলেটকে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বেশি ভাবতে হয় অনলাইনের আক্রমণ নিয়ে এবং তা মূলত দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে, তখন বোঝা যায়, সমস্যাটি কতটা গভীরে গেঁথে আছে। নিঃশব্দে এ সমস্যা নারীদের ক্রীড়া অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

রুমানা আহমেদের কাছে অনলাইন নির্যাতন কখনোই 'ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ' নয়, এটি সরাসরি তার মনোযোগ ও পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, 'যখন নেতিবাচক মন্তব্য দেখি, যা আমি করিইনি, এসব সরাসরি আমার ক্যারিয়ার ও খেলায় প্রভাব ফেলে।'

ফর্ম একটু খারাপ হলেই নির্যাতন বেড়ে যায়। অপরিচিত অনেকেই তার ফর্ম নিয়ে গল্প বানায়, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নেতিবাচকতা জমে আরও বড় সমস্যায় রূপ নেয়।

তিনি জানান, নির্যাতনের কারণে কারও খেলা ছাড়ার ঘটনা না দেখলেও, নারীদের ক্রিকেট যত বেশি আলোচনায় এসেছে, নেতিবাচক মন্তব্যও ততই বেড়েছে।

'আগে মেয়েদের দিকে এত নজর ছিল না। এখন আলো পড়ছে, তাই সমালোচনা ও খারাপ মন্তব্যও বাড়ছে,' বলেন তিনি।

বেশিরভাগ নির্যাতনকারীই বেনামে থাকে। রুমানা বলেন, 'অনেক মন্তব্যই আসে যাদের আমি চিনি না।'

মানসিক চাপ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ জানিয়ে সেভাবে ফল পাওয়া যায় না। কোচ বা কর্মকর্তারা সাধারণত বলেন 'এড়িয়ে চলতে', কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার উপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের রিপোর্ট অপশনও অ্যাথলেটরা খুব কম ব্যবহার করেন, একদিকে ঘটনাগুলো গুরুতর অবস্থায় না পৌঁছানোয়, অন্যদিকে অভিযোগ জানিয়ে লাভ হবে কিনা সেই সন্দেহে।

রুমানা মনে করেন, কঠোর আইন প্রয়োগ ও বিসিবির শক্ত অবস্থান নেওয়া জরুরি।

'ওরা এসব করছে কারণ তাদের কিছুই হয় না। বিসিবির উচিত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া; এটা আমাদের খেলায় প্রভাব ফেলে।'

শুটার কামরুন নাহার কলি ভিন্ন ধরনের হয়রানির কথা বলেন, যা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিযোগিতার আগে অ্যাথলেটদের মানসিকভাবে অস্থির করে দেয়।

'কখনো ফেক আইডি, কখনো আশপাশের কেউ। এমনকি সহকর্মীরাও কখনো ঈর্ষা থেকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হয়রানি করে,' জানান তিনি।

হয়রানি অনেকসময় সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে ছড়িয়েও পড়ে।

'সরাসরি সামনাসামনি করা মন্তব্যও অনেক সময় ক্ষত করে, ইচ্ছা করেই এমন কিছু বলা হয়।'

এআই প্রযুক্তির কারণে ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে মনে করেন কলি। ছবি বিকৃতি, মনটাজ, জাল ভিডিও এসব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে, যা অ্যাথলেটদের আত্মবিশ্বাসে বড় আঘাত হানে। তার কথায়, নারী অ্যাথলেটরা 'সবসময়ই অনিরাপদ বোধ করেন।'

দুই ক্রীড়াবিদই বলছেন, তারা স্পষ্টভাবে জানেন না কোথায় বা কীভাবে ডিজিটাল নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে হয়। কলি জানান, পিসিএসডাব্লিউ  (পুলিস সাইবার সাপোর্ট ফর ওম্যান) সম্পর্কে শুনলেও অ্যাথলেটদের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা নেই। অভিযোগ করা হলেও বিশেষ করে প্রভাবশালী বা সিনিয়র ব্যক্তির বিরুদ্ধে হলে সেগুলো 'চাপা পড়ে যায়', বিচার মেলে না।

তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য তার পরামর্শে এই বাস্তবতাই প্রতিফলিত, 'আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কঠিন। তাই নিজেকেই সাবধান হতে হবে, কম পোস্ট করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় কম থাকা, খুব সতর্ক থাকা।'

কিন্তু অ্যাথলেটদের যখন বলা হয় 'এড়িয়ে চলতে' বা 'কম পোস্ট করতে', তখন আসলে অপরাধীদের জন্য আরও বেশি জায়গা তৈরি হয়।

রুমানা ও কলির অভিজ্ঞতা দেখায়, নারী অ্যাথলেটরা ডিজিটাল নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রায় একা লড়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ জানানোর স্পষ্ট পথ নেই, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা সীমিত, আর অপরাধীরা প্রায়ই বেপরোয়া থেকে যায়। নারীদের ক্রীড়া যত দৃশ্যমান হচ্ছে, ততই তাদের সুরক্ষার কাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি।