ফ্রাঙ্কো বারেসির প্রয়াণ: মিলানের ডিএনএতে খোদাই করা যার নাম
এসি মিলান ও ইতালির কিংবদন্তি সেন্টার ব্যাক এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি ৬৬ বছর বয়সে মারা গেছেন।
গত বছর ফুসফুসের একটি নোডিউল অপসারণের জন্য বারেসির অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তিনি একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে মিলানে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিক গেমসের মশালবাহী হিসেবে তাকে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল।
এক বিবৃতিতে বিখ্যাত ইতালিয়ান ক্লাব মিলান জানিয়েছে, ‘বারেসির বিদায়ে মিলান আজ অশ্রুসিক্ত। তার আদর্শ ও সততা ক্লাবের ডিএনএতে চিরকাল খোদাই করা থাকবে, ঠিক যেমনটি থাকবে তার বিখ্যাত ৬ নম্বর জার্সিটি।’
মিলানের যুব একাডেমি থেকে উঠে আসা বারেসি তার ২০ বছরের (১৯৭৭-১৯৯৭) দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারের পুরোটাই কাটিয়েছেন রোজোনেরিদের হয়ে। এর মধ্যে ১৫ বছরই তার হাতে ছিল ক্লাবটির অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। তাদের হয়ে মোট ৭১৯টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি, রেকর্ডের পাতায় যা কেবল সতীর্থ ও ইতালির আরেক কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনির চেয়েই পিছিয়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক বার্তায় মালদিনি লিখেছেন, ‘আজ আমার ঠিক তেমনটাই লাগছে, যেমনটা লাগত যখন কোনো কারণে আপনি আমাদের সঙ্গে মাঠে নামতে পারতেন না— (ভাবতাম) আমাদের অধিনায়ককে ছাড়া আমরা কী করব?’
‘আপনি আমাকে শিখিয়েছেন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত কীভাবে লড়তে হয়, জার্সির প্রতি অনুগত থাকার অর্থ কী এবং একজন সত্যিকারের নেতার মূল্য কতটা। আপনি প্রতিদিন নিজের কাজের মাধ্যমে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন— কথা বলেছেন কম, কিন্তু করেছেন অসংখ্য কাজ,’ যোগ করেছেন তিনি।
তবে বারেসি ও মিলানের গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত। তরুণ বয়সে ইন্টার মিলানে ট্রায়াল দিয়েছিলেন বারেসি। কিন্তু নেরাজ্জুরিরা তাকে বাদ দিয়ে তার বড় ভাই জিউসেপ্পে বারেসিকে দলে টানে। এরপর ফ্রাঙ্কো যোগ দেন তাদের শহরকেন্দ্রিক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের যুব দলে। জিউসেপ্পে ইন্টারের অধিনায়কও হয়েছিলেন। আশির দশকের শেষদিকে মিলান ডার্বিতে কিক-অফের আগে দলনেতা হিসেবে দুই বারেসি ভাইয়ের স্মারক বিনিময়ের দৃশ্যটি হয়ে উঠেছিল এই দ্বৈরথের অন্যতম প্রতীক।
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জিউসেপ্পেও দারুণ একটি ক্যারিয়ার কাটালেও পরবর্তীতে ‘বারেসি’ নামে এককভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ফ্রাঙ্কোই। ছয়টি সিরি আ এবং তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ/উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার কারণে শুধু ডিফেন্ডার নয়, যেকোনো পজিশনের বিবেচনাতেই তাকে ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে স্মরণ করা হয়।
আশির দশকে ম্যাচ পাতানো কেলেঙ্কারির জেরে মিলানকে যখন সিরি বিতে অবনমন করা হয়েছিল, তখনও দল ছেড়ে না গিয়ে ক্লাবের প্রতি অবিচল আনুগত্য দেখিয়েছিলেন বারেসি। তাদের প্রতি এই অসামান্য অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার ৬ নম্বর জার্সিটি অবসরে পাঠানো হয়। এছাড়া, ২০২০ সাল থেকে তিনি মিলানের সম্মানসূচক সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিলেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বারেসির প্রভাব ছিল ঠিক সমান উজ্জ্বল। ১৯৮২ সালের ইতালি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ঠিক ১২ বছর পর তার নেতৃত্বেই আজ্জুরিরা আবারও ফাইনালে উঠেছিল। ১৯৯৪ সালের ওই বিশ্বকাপে অসামান্য দৃঢ়তা দেখিয়ে হাঁটুর চোট থেকে ফিরে ফাইনালে মাঠে নেমেছিলেন তিনি।
ব্রাজিলের রোমারিও ও বেবেতোর সমন্বয়ে গড়া আক্রমণভাগকে দারুণভাবে সামলে ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বারেসি। সেটিই ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম ফাইনাল, যার নিষ্পত্তি হয়েছিল টাইব্রেকারে। সেখানে বারেসি প্রথম পেনাল্টিটি মিস করেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল ৩-২ ব্যবধানে জয়লাভ করে। যদিও ফাইনালটিতে রবার্তো বাজ্জিওর স্পট-কিকে ব্যর্থতাই ফুটবল ইতিহাসে বেশি আলোচিত।
ইতালির সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর মিলানের বিপক্ষে (পার্মার হয়ে) আমার সিরি আতে অভিষেক হয়। আমার বয়স তখন ১৭ বছর, আর অন্যদিকে ছিলেন সেই দলের অধিনায়ক— বারেসি।’
তিনি যোগ করেছেন, ‘সেদিন থেকেই আমি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলাম যে আভিজাত্য, নেতৃত্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুটবলের প্রতিনিধিত্ব করার অর্থ কী। বিদায় ফ্রাঙ্কো। শান্তিতে ঘুমান।’