ফুটবল হারিয়ে গেল উত্তেজনার আগুনে
মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত চার জাতির আমন্ত্রণমূলক ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অলিম্পিক দলের পারফরম্যান্স অনেক ইতিবাচক বার্তা বহন করেছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াকু ফুটবল খেলে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে তরুণরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অর্জনগুলো আড়াল হয়ে গেছে এক হতাশাজনক সমাপ্তির কারণে। স্বাগতিক মালদ্বীপের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে ফুটবলের সৌন্দর্যের বদলে আলোচনায় উঠে এসেছে উত্তেজনা, প্রতিবাদ, লাল কার্ড এবং মাঠের বাইরে সংঘাতের দৃশ্য।
রোববার রাতে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ছিল দুই দলের জন্যই বাঁচা-মরার লড়াই। বাংলাদেশ জিতলে জায়গা করে নিতে পারত ফাইনালে। অন্যদিকে স্বাগতিক মালদ্বীপের জন্য জয় ছিল নিজেদের মাটিতে আয়োজিত টুর্নামেন্টে তলানিতে থেকে শেষ করার লজ্জা এড়ানোর সুযোগ। ফলে ম্যাচজুড়ে উত্তেজনা থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। তবে শেষ দিকে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা ক্রীড়াসুলভ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ সময়েই খেলোয়াড়রা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি একই দিনে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের ম্যাচে চিত্র ছিল ভিন্ন।
বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ স্পষ্ট ছিল। তাদের বিশ্বাস, ম্যাচজুড়ে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে গেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অনেক সময় ফল অনুকূলে না গেলে রেফারিং নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, খেলোয়াড়রা সেই পরিস্থিতিতে নিজেদের কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে।
খেলার আবেগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই আবেগ যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তাহলে তা দ্রুত শৃঙ্খলাভঙ্গে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকে আরও পরিণত আচরণের। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ম্যাচের শেষ দিকে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের উদীয়মান ফরোয়ার্ড আল আমিন, যিনি ইতোমধ্যে সিনিয়র জাতীয় দলেও খেলেছেন, রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দুবার তাকে ধাক্কা দেন। একই সময়ে বাংলাদেশের হয়ে গোল করা মিরাজুল ইসলাম বেঞ্চ থেকে রেফারিকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর মন্তব্য করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। দুজনই সরাসরি বহিষ্কৃত হন। টুর্নামেন্টটি ফিফার আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা হলে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারত।
তবে ঘটনাপ্রবাহ সেখানেই থেমে থাকেনি। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও ডাগআউটের সদস্যরা মালদ্বীপের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে খেলা শেষ হওয়ার পর নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় রেফারিকে মাঠ ছাড়তে হয়।
এই ঘটনা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ফুটবলারদের ছোটবেলা থেকেই কৌশল, দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব, শৃঙ্খলা এবং ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অর্জনের গল্প কম ছিল না। মারুফুল হকের দল ছিল একমাত্র দল, যারা অলিম্পিক স্কোয়াড নিয়ে অংশ নিয়েছিল। অন্য তিনটি দলই মাঠে নামিয়েছিল সিনিয়র জাতীয় দল।
বাংলাদেশ তিনটি ম্যাচই ড্র করেছে। মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের মতো ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষেও তারা পরাজিত হয়নি। আক্রমণাত্মক ফুটবলে হয়তো টুর্নামেন্ট মাতাতে পারেনি, কিন্তু দলটি ছিল সংগঠিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং হারানো কঠিন। একটি তরুণ দলের জন্য এসবই ছিল সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক।