সাক্ষাৎকার

বিয়ে পড়ানোর কাজ থেকে অফ-স্পিনের ঝলক: রুবেলের উত্থানের গল্প

সামসুল আরেফীন খান
সামসুল আরেফীন খান

বহু বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটের নিচের সারির লিগগুলোতে নীরবে খেলে গেছেন। একসময় সংসার চালানো ও ক্রিকেট খেলার খরচ জোটাতে মামার সঙ্গে কাজী অফিসে বিয়ে নিবন্ধকের (কাজী) কাজও করতে হয়েছে নিয়মিত। কিন্তু মোহাম্মদ রুবেলের ভাগ্য বদলে যেতে শুরু করে গত বছরের এনসিএল টি-টোয়েন্টি থেকে। চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে ১০ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের উদীয়মান খেলোয়াড় হওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খেলেছেন বিপিএল ও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল)। এইচপি দলের হয়ে এবার অস্ট্রেলিয়া সফরেও আলো ছড়াচ্ছেন তিনি। দ্য ডেইলি স্টারকে রুবেল শুনালেন তার পথচলার গল্প। 

ডারউইনে দারুণ বল করছেন। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ও মাঠের অবস্থা তো স্পিনারদের জন্য সহজ নয়, কিন্তু আপনি চার ম্যাচে ১৪টি শিকার করে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক। সেখানে কি বোলিং করাটা দেশের চেয়ে সহজ মনে হচ্ছে?

মোহাম্মদ রুবেল: না না, এখানকার টুর্নামেন্টটা খুব প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং মানসম্পন্ন। আমি শুধু নিজের শক্তি অনুযায়ী বোলিং করার চেষ্টা করছি, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।

উইকেটের আচরণ কেমন দেখছেন?

রুবেল: একই ধরনের উইকেটে খেলা হচ্ছে। উইকেট খারাপ নয়, তবে খুব বেশি রানও উঠছে না। ঘূর্ণি বল করাদের জন্য কিছুটা সুবিধা আছে।

আপনাকে তো প্রতিটি খেলায় পাওয়ারপ্লেতে বল করতে দেখা যাচ্ছে...

রুবেল: হ্যাঁ, প্রথম চার ওভারের পাওয়ারপ্লের মধ্যে আমি দ্বিতীয় ও চতুর্থ ওভার দুটি করি। এমনকি ১০ ওভার পর প্রতিপক্ষ দল (টুর্নামেন্টের বাইলজ অনুযায়ী) যখন তাদের পছন্দের পাওয়ারপ্লে নেয়, তখনও আমি বল করি। অধিনায়ক আমার ওপর ভরসা রাখছেন এবং আলহামদুলিল্লাহ ফলও ভালো আসছে।

গত বিপিএলের নিলামে শুরুতে নাম ছিল না, পরে সুযোগ পেয়েই চমক দেখালেন। শেষ আট-নয় মাসে আপনার খেলোয়াড়ি জীবনে যে বড় পরিবর্তন আসলো, এই উন্নতিটা কীভাবে এলো?

রুবেল: সত্যি বলতে, আগে আমি শুধু সাধারণ অফস্পিন করতাম, এত বৈচিত্র্য (ভেরিয়েশন) ছিল না। ২০২৩-২৪ মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সময় থেকে বোলিংয়ে নতুন বৈচিত্র্য আনা শুরু করি। সেবার দ্বিতীয় বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৭টি শিকার ধরি। পরের বছর প্রথম বিভাগে সর্বোচ্চ ৪৩টি শিকার পেয়ে জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) বিশ ওভারের খেলায় সুযোগ পাই। সেখানে ১১টি শিকারের পাশাপাশি উদীয়মান খেলোয়াড় হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (২০টি শিকার) সুযোগ পাই। মূলত বোলিংয়ে নতুন সব বৈচিত্র্য আনার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়।

আপনার বয়স ৩০ হয়ে গেছে। ক্রিকেট খেলা কি অনেক দেরিতে শুরু করেছিলেন, নাকি সুযোগ পাচ্ছিলেন না?

রুবেল: না, আমি ২০১১ সাল থেকেই ঢাকার লিগে খেলছি। তবে দীর্ঘ সময় প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগেই কেটে গেছে, সেভাবে উচ্চ পর্যায়ে (এলিট লেভেলে) সুযোগ মিলছিল না।

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রিকেট খেলার এই যাত্রায় কখনও কি হতাশা বা খেলা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা এসেছে? পরিবারের সমর্থন কেমন ছিল?

রুবেল: না, কখনও হতাশা আসেনি, খেলেই গেছি। কারণ চট্টগ্রাম লিগে ভালো পারিশ্রমিকে খেলতাম, তাই আর্থিক চাপটা অতটা ছিল না। আর পরিবার থেকেও বলা হয়েছিল—কষ্ট করে যাও, বাকিটা আল্লাহ ভরসা।

খেলার পাশাপাশি আপনি বিবাহ নিবন্ধকের (কাজী) কাজও তো করতেন...

রুবেল: হ্যাঁ, আমার মামা রেজিস্ট্রি করাতেন, আমিও ওনার সঙ্গে কাজ করতাম। মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় হতো, যার কারণে পরিবার বা নিজের খরচের জন্য অতিরিক্ত চাপ নিতে হতো না। এখনও চট্টগ্রামে থাকলে সময় সুযোগ বুঝে কাজটা করি।

প্রায় ১৫ বছরের লড়াই শেষে এখন হাই পারফরম্যান্স(এইচপি) দলে আছেন, লাল-সবুজ জাতীয় দলের পোশাক প্রতিনিধিত্ব করছেন—বিষয়টি কেমন উপভোগ করছেন?

রুবেল: জাতীয় দলের পরই তো এইচপি দল বা 'এ' দল। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার আনন্দই আলাদা। লক্ষ্য একটাই—সামনে যে খেলাই আসবে সেখানে যেন সেরাটা দিতে পারি এবং দিন দিন নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারি।