আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলবিরোধী রাজনীতিকদের অবস্থান কি শক্তিশালী হচ্ছে?

তরুন ইউসুফ, কবি ও কলামিস্ট
তরুন ইউসুফ

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। তার প্রথম বড় আভাস পাওয়া গিয়েছিল নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির উত্থানের মধ্য দিয়ে। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ অ্যান্ড্রু কুওমোকে প্রাইমারিতে পরাজিত করে মামদানি শুধু নিউইয়র্কের রাজনীতিতেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেননি, বরং আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে ইসরায়েল ও জায়োনিজম নিয়ে প্রচলিত অবস্থানকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। পরে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি নিউইয়র্কের মেয়র হন।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি প্রকাশ্যে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার চেষ্টা করবেন।

মামদানির সেই উত্থানকে যদি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা মনে হয়ে থাকে, পরবর্তী কয়েকটি নির্বাচনী ফল সেই ধারণাকে ক্রমেই দুর্বল করেছে। মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদের বিজয় তার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ। ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারিতে তিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মহলের সমর্থনপুষ্ট হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি হয়ে উঠেছেন মিশিগান থেকে মার্কিন সিনেটের জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়া প্রথম মুসলিম।

তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন এআইপ্যাক ও অন্যান্য সংগঠন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে যা ছিল নজিরবিহীন মাত্রার হস্তক্ষেপ। অথচ বিপুল অর্থের সেই রাজনৈতিক শক্তিকে পরাজিত করেই এল-সাইয়েদের উত্থান।

এরপর ক্যালিফোর্নিয়ায় আয়শা ওয়াহাবের উত্থানও একই প্রবণতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে সামনে আসে। আফগান-আমেরিকান ও মুসলিম এই নারী রাজনীতিক ২০২৬ সালের কংগ্রেস নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন। ফিলিস্তিন ও গাজা প্রশ্নে তার অবস্থানও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রচলিত মধ্যপন্থী অবস্থান থেকে অনেক বেশি সমালোচনামুখর। এমনকি তার বিরুদ্ধে এআইপ্যাক ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোর কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রচারও এই নির্বাচনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নকে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় টেনে এনেছে।

তিনটি ঘটনা তিনটি ভিন্ন রাজ্য, তিনটি ভিন্ন নির্বাচন এবং তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মিল রয়েছে—আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টির তৃণমূলের একটি অংশ এখন আর ইসরায়েল প্রশ্নে দলের পুরোনো অবস্থানকে নিঃশর্তভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়; বরং তারা দেখিয়েছেন, ফিলিস্তিন, গাজা, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে আরও কঠোর প্রশ্ন তুলেও নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব।

মামদানি, এল-সাইয়েদ ও আয়শা ওয়াহাবের উত্থান অন্তত সেই সম্ভাবনাটিই সামনে এনেছে। এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে ওঠে—তবে কি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবির দীর্ঘদিনের প্রভাব কমতে শুরু করেছে? বদলে যাচ্ছে ওয়াশিংটনের সেই পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ছিল প্রায় অলিখিত দ্বিদলীয় ঐকমত্যের অংশ?

দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সমর্থন করা শুধু একটি পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা, বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রশ্নে, মূলধারার রাজনীতিকদের জন্য প্রায়ই রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করত।

কিন্তু গাজা যুদ্ধ সেই পুরোনো সমীকরণে গভীর ফাটল তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে, এটা শুধুমাত্র জনমত জরিপের বিষয় নয়, ব্যালট বাক্সেও এর প্রভাব পড়ছে। তবে ঘটনাগুলোকে সরলীকরণ করাও বিপজ্জনক। এটি এখনই বলা যাবে না যে এআইপ্যাকের প্রভাব শেষ হয়ে গেছে, কিংবা আমেরিকা ইসরায়েলবিরোধী হয়ে গেছে। বলা যেতে পারে, পরিবর্তনটি সম্ভবত আরও সূক্ষ্ম।

আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব এখনো শক্তিশালী, তবে ইসরায়েলি সরকারের নীতি এবং মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করা আর আগের মতো রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব নয়। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, প্রশ্নটি এখন শুধু ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির করিডরে সীমাবদ্ধ নেই। সেটি প্রবেশ করেছে নিউইয়র্ক, মিশিগান ও ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটকেন্দ্রে।

সুতরাং জোহরান মামদানি, আবদুল এল-সাইয়েদ কিংবা আয়শা ওয়াহাবের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন—আমেরিকার নতুন প্রজন্মের ভোটাররা কি ইসরায়েল প্রশ্নে তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে? আর যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তবে তার অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে ওয়াশিংটনের বহু দশকের পুরোনো মার্কিন-ইসরায়েল সমীকরণে?

ঐকমত্যের দেয়ালে প্রথম ফাটল

ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকান জনসমর্থনের পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। হলোকাস্টের স্মৃতি, মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত স্বার্থ, স্নায়ুযুদ্ধের উত্তরাধিকার, ইহুদি-আমেরিকানদের রাজনৈতিক ভূমিকা, শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাস—সবমিলিয়ে ইসরায়েল-আমেরিকা সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকেনি; আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু গাজা যুদ্ধ সেই পুরোনো কাঠামোর ওপর যেন এক প্রবল প্রভাব ফেলেছে। গাজার ধ্বংসস্তূপ, নিহত শিশু, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ সারি, হাসপাতালের দৃশ্য—সবকিছু পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকার ঘরে ঘরে এবং বিশেষ করে তরুণদের সেগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে ওয়াশিংটনের পুরোনো কূটনৈতিক ভাষায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা তরুণ প্রজন্মের কাছে আর একা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। তাদের পাল্টা প্রশ্ন: ফিলিস্তিনিদের ওপর যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে তার কি হবে?

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের জরিপে ৬০ শতাংশ আমেরিকান ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ। ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো তরুণদের অবস্থান। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী আমেরিকানদের মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশ ইসরায়েলিদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন; বিপরীতে ৫৮ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখেন।

তরুণ ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও নাটকীয়। এখানে আমেরিকার রাজনীতির একটি ভবিষ্যত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। আজকের ২০ বছরের ভোটার আগামীকাল ৩০ বছরের ভোটার হবেন। আজকের শিক্ষার্থী তরুণই আগামী সময়ের কংগ্রেসম্যান, সাংবাদিক, অধ্যাপক, আইনজীবী, উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক সংগঠক হবেন। রাজনীতি শুধু আজকের ভোট দিয়ে বদলায় না। প্রজন্ম বদলালে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্মৃতিও বদলায়।

ডেমোক্রেটিক পার্টি: পরিবর্তনের বড় কেন্দ্র

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েল প্রশ্নে যে বড় পরিবর্তন, সেটির প্রাথমিক সূচনা হয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি অভ্যন্তরে। দলটি ইসরায়েলবিরোধী রাজনীতিকদের বড় কেন্দ্রও বটে। দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্রেট নেতৃত্ব ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল। এখন সেই ঐক্যের জায়গায় এসেছে বড় মতানৈক্য।

২০২৬ সালের এপি-নর্ক জরিপে ৫৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন করছে। ২০২৪ সালের শুরুতে এমন মত পোষণ করতেন ৪৫ শতাংশ। এই সংখ্যাটি শুধু একটি জরিপের ফল নয়, এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক মেরুকরণের গভীরতার একটি সংকেত।

বার্নি স্যান্ডার্স বহু বছর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমেরিকার সম্পদ ও ক্ষমতা কার জন্য? বর্তমানে তার উত্তরসূরি প্রজন্ম সেই প্রশ্নকে বিদেশনীতি পর্যন্ত নিয়ে গেছে। আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের রাজনীতি তাই শুধু স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিকের অধিকার কিংবা জলবায়ু নীতির রাজনীতি নয়। তার রাজনীতি ক্রমেই এই প্রশ্নও করছে, আমেরিকা পৃথিবীতে তার সামরিক শক্তি কোথায় এবং কেন ব্যবহার করবে?

আর জোহরান মামদানি এই প্রশ্নের সঙ্গে যোগ করেছেন শহুরে জীবনের নির্মম বাস্তবতা—ভাড়া, বাসস্থান, পরিবহন, মজুরি ও স্বাস্থ্যসেবা। এই নতুন প্রগতিশীল রাজনীতির শক্তি এখানেই। এটি শুধু ফিলিস্তিনের কথাই বলছে না, আমেরিকার প্রান্তিক পরিবার এবং মানুষের কথাও বলছে। একটি আমেরিকান পরিবার যখন মাসের শেষে বাড়িভাড়া দিতে হিমশিম খায়, স্বাস্থ্যসেবার খরচ সামলাতে পারে না, তখন বিদেশে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার প্রশ্ন তার কাছে আর সম্পূর্ণ বিদেশনীতি থাকছে না, সেটি হয়ে উঠছে আমেরিকানদের জীবনের প্রশ্ন।

নিউইয়র্কের পর মিশিগান: টাকাই শেষ কথা নয়

২০২৬ সালের মিশিগান সিনেট প্রাইমারি এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক দৃশ্যগুলোর একটি। মিশিগান সিনেটের প্রাইমারিতে প্রগতিশীল আবদুল এল-সাইয়েদ প্রতিষ্ঠিত ডেমোক্রেট প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেছেন। ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তার কঠোর সমালোচনা ছিল তার প্রচারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর গুরুত্ব শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, আরও একটি জায়গায়। এআইপ্যাক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো স্টিভেন্সের পক্ষে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পরবর্তী ব্যয়ের পরিমাণ ৩২ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলে এসেছে। তারপরও এল-সাইয়েদ জিতেছেন।

এখানে একটি পুরোনো রাজনৈতিক ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একসময় আমেরিকার রাজনীতিকদের মধ্যে ধারণা ছিল, ইসরায়েল তার সমর্থকদের পক্ষে এবং সমালোচকদের বিপক্ষে প্রচুর অর্থ খরচ করে, যা প্রতিপক্ষকে নিশ্চিত পরাজয় বরণে বাধ্য করে। অর্থাৎ ইসরায়েলের সমালোচনা করলে তারা অর্থ দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

মিশিগানের আবদুল এল-সাইয়েদের প্রাইমারিতে বিজয় বলছে, সবসময় অর্থ দিয়ে জনমত পরিবর্তন করা যায় না। তবে এই ঘটনাকে এআইপ্যাকের পরাজয় হিসেবে দেখাও ভুল হবে। একই সময়ে মিসৌরিতে প্রগতিশীল কোরি বুশ হেরে গেছেন ওয়েসলি বেলের কাছে, যিনি ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের জন্য এআইপ্যাকের সমর্থন পেয়েছিলেন। অর্থাৎ এআইপ্যাক দুর্বল হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি।

কিন্তু একটি বিষয় বদলেছে। ইসরায়েলের বিরোধিতা করা এখন আর রাজনৈতিক আত্মহত্যা বলে গণ্য হচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে এবং এটাই হচ্ছে পরিবর্তনের প্রকৃত বার্তা।

ইসরায়েলবিরোধীতার প্রকৃত রূপ

যেসব রাজনীতিক ইসরায়েলি সরকারের গাজা নীতির সমালোচনা করেন, তাকে যদি সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী বলা হয়, তাহলে বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। কারণ, অনেক মার্কিন রাজনীতিকের অবস্থান আসলে অনেক বেশি সূক্ষ্ম। তারা বলছেন, ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার আছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তার অধিকার আছে, হামাসের সন্ত্রাসের বিরোধিতা করা উচিত; কিন্তু একইসঙ্গে ফিলিস্তিনিদেরও রাষ্ট্রের অধিকার আছে, গাজার বেসামরিক মানুষের জীবনরক্ষার অধিকার আছে, আন্তর্জাতিক আইন মানা উচিত। একইসঙ্গে আমেরিকার সামরিক সহায়তারও সীমা ও শর্ত থাকা উচিত।

এই অবস্থানকে শুধু ইসরায়েলবিরোধীতা বললে পরিবর্তনটি বোঝা যাবে না। বরং আমেরিকান রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নটি হলো—ইসরায়েলের নিরাপত্তা কি ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, নাকি দুইপক্ষের নিরাপত্তার জন্যই নতুন রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

এ ছাড়া, হামাস প্রশ্নেও আমেরিকান জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি বাড়লেও তারা হামাসের কার্যক্রমকে সেভাবে পছন্দ করছে না। পিউ রিসার্চের ২০২৬ সালের জরিপে তরুণ ডেমোক্র্যাটদের মাত্র ১৬ শতাংশ হামাসের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ বেশিরভাগ আমেরিকান ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের প্রতি সমর্থন এবং হামাসের প্রতি সমর্থন—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখছেন।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমেরিকার রাজনৈতিক মূলধারায় জায়গা পেতে হলে প্রগতিশীলদের একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। তাদের একদিকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের কথা বলতে হবে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ ও বেসামরিক হত্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট থাকতে হবে। এই ভারসাম্য যত পরিষ্কার হবে, তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে।

রিপাবলিকান পার্টি: ইসরায়েলবিরোধীতার উল্টোস্রোত

ডেমোক্রেটিক পার্টি যখন ইসরায়েল প্রশ্নে বিভক্ত হচ্ছে, সেখানে রিপাবলিকান পার্টির প্রায় সব রাজনীতিক ইসরায়েলের মানবাধিকারবিরোধী কার্যক্রমকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ইসরায়েল সমর্থনের পরিমাণও বেশি।

পিউ রিসার্সের ২০২৬ জরিপে রিপাবলিকানদের ৫৮ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। এ ছাড়া, রক্ষণশীল রিপাবলিকান রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন শক্তিশালী। কিন্তু এটি ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক কোনো পরিস্থিতি নয়। বরং অসুবিধার পরিমাণটা এখানে বেশি। এতদিন ডেমোক্রেট রিপাবলিকান নির্বিশেষে ইসরায়েল দীর্ঘদিন আমেরিকার দ্বিদলীয় সমর্থন পেয়েছে। ইসরায়েলের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ ছিল। কারণ, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি ইসরায়েলের প্রতি শুধুমাত্র রিপাবলিকানদের সমর্থন থাকে এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভক্তি বেড়ে দ্বিদলীয় ঐকমত্য ক্ষয়ে যায়, তাহলে ইসরায়েলের জন্য জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমস্যা তৈরি হবে। দ্বিদলীয় ঐকমত্য বদলে যাওয়া মানে ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকার একচ্ছত্র সমর্থনের কবর রচনা হওয়া।

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও আমেরিকা-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যত

সেই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে—আমেরিকা কি ইসরায়েলের সঙ্গে তার কয়েক দশকের সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখবে, নাকি সেই সম্পর্কের শর্ত ও সীমা নতুন করে নির্ধারণ করবে? যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশ এখন ইসরায়েলকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি মিত্র হিসেবে দেখছে না; তারা এটিকে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক ব্যয়, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক ক্ষমতা ব্যবহারের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করছে।

২০২৬ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিগুলোতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহ এবং এআইপ্যাকের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা তরুণ ভোটারদেরকে প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আবাসন সংকট, স্বাস্থ্য ব্যয়, শিক্ষা ঋণ, বৈষম্য, সামরিক বাজেট ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয়।

অর্থাৎ, ইসরায়েল প্রশ্নটি ধীরে ধীরে ইসরায়েলপন্থী না ফিলিস্তিনপন্থী এই সরল দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে আমেরিকা প্রথমে কোথায় অর্থ ও শক্তি ব্যয় করবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনগুলোতে এইসকল প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া শুরু হয়েছে। নিউইয়র্কে জোহরান মামদানি, মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদের মতো রাজনীতিকদের উত্থান দেখাচ্ছে যে ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি অংশ এখন পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত। মিশিগানের ২০২৬ সালের ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রাইমারিতে এল-সাইয়েদের বিজয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ তিনি ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থায়নের কাঠামোকে প্রশ্ন করে জয় পেয়েছেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল রাজনীতিকদের কাছে প্রশ্নটি ক্রমেই এমন হয়ে উঠছে: আমেরিকা কি তার মিত্রদের সমর্থন করবে—নাকি মিত্র হলেও তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করবে? ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে—অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা কি নিঃশর্ত থাকবে, নাকি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে তা যুক্ত করা হবে? এই অবস্থান ইতিমধ্যে কংগ্রেসের ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি জায়গা করে নিয়েছে।

এখানে অবশ্য আরেকটি বাস্তবতা আছে। প্রাইমারি নির্বাচন আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এক নয়। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে যে অবস্থান ভোটারদের উজ্জীবিত করতে পারে, তা মধ্যপন্থী ও দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে একইভাবে প্রভাবিত করবে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। ফলে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রগতিশীল প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে একই সঙ্গে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকার নীতি কতটুকু এবং কিভাবে বদলাবে। সেই পরিবর্তিত নীতি আমেরিকার বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে? ইতিমধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যপন্থীরা সতর্ক করছে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করা মানে শুধু একটি মিত্রকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়; এর অর্থ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কৌশলগত অবস্থানও দুর্বল করা। তবে মধ্যপন্থীরা ইসরায়েলকে সমর্থন করেও স্বীকার করছে যে পুরোনো নিঃশর্ত সমর্থন নীতি আর টেকসই হচ্ছে না।

অন্যদিকে রিপাবলিকানদের বড় অংশ সম্ভবত আরও স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের পাশে থাকবে। এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখবে শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ভোটারদের দীর্ঘদিনের ইসরায়েলপন্থী অবস্থান এবং রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতি। ফলে ২০২৮ সালে ইসরায়েল প্রশ্নটি দুই দলের মধ্যকার একটি পুরোনো বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে। একদিকে ‘শক্তিশালী মিত্র ও শক্তিশালী আমেরিকা, অন্যদিকে শর্তহীন সামরিক সমর্থনের অবসান ও পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস। এখানেই ২০২৮ সালের নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে কি ইসরায়েল-আমেরিকা সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে?

আসলে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনো আসেনি। ইসরায়েল এখনো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র। দুদেশের সামরিক, গোয়েন্দা, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর। কংগ্রেসেও ইসরায়েলপন্থী শক্তি যথেষ্ট প্রভাবশালী। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইসরায়েলি সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন, এই দুইটি আর একই অর্থ বহন করছে না। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। একসময় আমেরিকান রাজনীতিকের জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এখন কিছু নির্বাচনে উল্টো ইসরায়েলের সমালোচনা রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

পুরোনো সমীকরণের সামনে নতুন আমেরিকা

আমেরিকায় ইসরায়েলপন্থী রাজনীতি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এআইপ্যাক (AIPAC) এখনও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারে। ইসরায়েল এখনও ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। রিপাবলিকান পার্টির বড় অংশ এখনও ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ়ভাবে অনুগত। সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কও গভীর। কিন্তু যে বিষয়টি বদলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী রাজনীতিকদের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ইসরায়েলি সরকারের নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করা রাজনীতি দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। এটি এখন আর প্রান্তিক অবস্থান নয়। এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে একটি বড় রাজনৈতিক স্রোত। তরুণ আমেরিকানরা পুরোনো ইসরায়েল-সমর্থনের ধারণাকে প্রশ্ন করছে। ডেমোক্রেটিক ভোটারদের বড় অংশ মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন করছে। প্রগতিশীল রাজনীতিকরা এআইপ্যাকের মতো শক্তিশালী সংগঠনের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছেন। একসময় ইসরায়েলকে সমালোচনা করা ছিল রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এখন সেটিই কোনো কোনো ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর জন্য নির্বাচনে রাজনৈতিক শক্তির উৎস। তাই এটি শুধু কোন রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের গল্প নয়, এটি আমেরিকার রাজনৈতিক স্মৃতি বদলে যাওয়ারও গল্প।

মামদানির নিউইয়র্ক, এল-সাইয়েদের মিশিগান এবং ওয়াহাবের ক্যালিফোর্নিয়া—এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন নির্বাচনী গল্পের মধ্য দিয়ে সেই পরিবর্তনের রেখাটি দেখা যাচ্ছে। আজ যে প্রশ্নটি নিউইয়র্কের মেয়র, মিশিগানের সিনেট প্রাইমারি কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কংগ্রেশনাল আসনে উঠছে, কাল সেটিই হয়তো ওয়াশিংটনের জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। আর তখন আমেরিকার রাজনীতির সামনে শুধু একটি প্রশ্ন থাকবে না—কে ইসরায়েলের পক্ষে? প্রশ্নটি আরও কঠিন হবে— যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি আর আগের মতো ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত থাকবে? যদি উত্তরটি ধীরে ধীরে না এর দিকে যেতে শুরু করে, তাহলে এটাই হয়ে উঠবে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রথম দৃশ্যমান প্রতীক। ওয়াশিংটনের বহু দশকের পুরোনো মার্কিন-ইসরায়েল সমীকরণ নতুন করে লেখার সূচনা।

তরুন ইউসুফ: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক