মে দিবসের অঙ্গীকার ও শ্রমিকের অপূর্ণ অধিকার
মে দিবস কেবল স্মরণের নয়, এটি শ্রমিক অধিকারের চলমান প্রশ্নকে সামনে আনার দিন।
মে দিবসের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমঘণ্টা কমানো, মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা ব্যক্তি-জীবনের দাবিতে বিশ্বজুড়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আজকের মে দিবস।
আমরা শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের কথা বলি। কিন্তু দিবসটি পেরিয়ে গেলে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশের শ্রমিক আজ কতটা নিরাপদ, কতটা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছেন?
শ্রমিকের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও তাদের বাস্তব জীবন এখনও অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, বৈষম্য ও বঞ্চনায় আচ্ছন্ন।
বাংলাদেশের সংবিধান শ্রমের মর্যাদা স্বীকার করেছে। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির কথা বলা হয়েছে। ১৫ অনুচ্ছেদে কাজের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ আছে। ২০ অনুচ্ছেদে শ্রমকে সম্মানের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলোতে কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ট্রেড ইউনিয়নসহ নানা বিষয়ে বিধান রয়েছে।
কিন্তু আইন থাকা আর তার কার্যকর প্রয়োগ—এই দুইয়ের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি অর্থনীতির পেছনে শ্রমিক শ্রেণির অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো শ্রমিক দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, চা শিল্প, চামড়া শিল্প, সেবা খাত—সবখানেই শ্রমিকরা উৎপাদনের মূল শক্তি।
কিন্তু এই উৎপাদনের নেপথ্যের মানুষগুলো প্রায়ই ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি দিয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে আয় বাড়ে না। ফলে শ্রমিকের আয় ও জীবিকার মধ্যে গভীর বৈষম্য তৈরি হয়।
তবে সব চিত্রই হতাশার নয়। গত এক দশকে শ্রমখাতে সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাকখাতে মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ, কারখানার নিরাপত্তা পরিদর্শন জোরদার, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভবন নিরাপত্তা মানদণ্ড উন্নয়ন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল বেতন পরিশোধ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক ক্রেতা, শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন ও উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বয়ে কর্মপরিবেশ উন্নয়নের কিছু উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়েছে। যদিও এসব উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়, তবু এগুলো ভবিষ্যৎ অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বাংলাদেশের শ্রম বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি। প্রতি বছর বিভিন্ন খাতে বহু শ্রমিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বা গুরুতর আহত হন। নির্মাণখাতে নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, পরিবহনখাতে অতিরিক্ত ঝুঁকি, কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তার দুর্বলতা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম—এসব কারণে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে।
বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে ৭১৩টি কর্মস্থল দুর্ঘটনায় মোট ৮০২ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু পরিবহনখাতেই নিহত হয়েছেন ৩৮৫ জন। ২০২৪ সালে ৬৩৯টি কর্মস্থল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৭৫৮ শ্রমিক।
অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় গতবছর কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এ ছাড়া, কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৭৮ শ্রমিক।
সংস্থাটির জরিপ অনুযায়ী, কর্মস্থল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে পরিবহনখাতে। এরপর রয়েছে সেবা প্রতিষ্ঠান (ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) খাতে ১৪৫ জন, নির্মাণখাতে ১২০ জন, কারখানা ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে ৫৮ জন এবং কৃষিখাতে ৯৪ জন।
মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৭৯ জন, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৯৬ জন, বজ্রপাতে ৭৮ জন, উঁচু স্থান থেকে পড়ে ৫০ জন, পানিতে ডুবে ২৮ জন, ভারী বস্তু চাপা পড়ে বা আঘাতে ২৫ জন, আগুন ও বিস্ফোরণে ২০ জন, পাহাড়/মাটি/ভবন/দেয়াল ধসে ১৪ জন, বিষাক্ত গ্যাসে আটজন ও অন্যান্য কারণে চারজন নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ শ্রমিক।
শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কারণ জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
কোনো শ্রমিক যেন অনিরাপদ ভবন, অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ কারখানা, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি কিংবা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন, নিয়মিত পরিদর্শন, কঠোর জবাবদিহি ও দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের কর্তব্য। শ্রমিকের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হলে উন্নয়নের সাফল্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আরেকটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো শ্রমিক নেতা, সংগঠক ও প্রতিনিধিদের ওপর হামলা, মামলা, হয়রানি বা দমন-পীড়নের অভিযোগ।
বিভিন্ন সময়ে শ্রম অধিকার নিয়ে সক্রিয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উসকানি, ষড়যন্ত্র বা অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক সংগঠকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এসব ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হওয়ার অভিযোগ আস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে। তবে ইতিহাস বলে, শ্রমিকের পক্ষে উচ্চারিত কণ্ঠকে ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করা যায় না। ন্যায়সঙ্গত দাবি দমন করা গেলেও তা নিঃশেষ করা যায় না।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, গৃহকর্মী, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র দোকানের কর্মচারী, অস্থায়ী নির্মাণশ্রমিক—এদের অধিকাংশের নেই লিখিত নিয়োগপত্র, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, চিকিৎসা সুবিধা বা বিমা। তারা অসুস্থ হলে আয় বন্ধ হয়ে যায়, দুর্ঘটনায় পড়লে ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত থাকে, কাজ হারালে কোনো সামাজিক সুরক্ষা থাকে না।
অথচ এই শ্রমিকরাই শহর ও গ্রামের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। বিশ্বের বহু দেশ এখন অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশেও এ খাতকে আইনি ও নীতিগত কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মৌলিক কনভেনশনগুলো সংগঠনের স্বাধীনতা, সমষ্টিগত দরকষাকষি, বৈষম্যহীনতা ও জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ করার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশ এসব নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
কিন্তু শ্রমিক সংগঠন গঠন, প্রতিনিধি নির্বাচন, অভিযোগ উত্থাপন কিংবা ন্যায্য দাবি আদায়ের ক্ষেত্রগুলো এখনও সবসময় সহজ নয়। অনেক শ্রমিক ভয়, অনিশ্চয়তা বা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় নিজের অধিকার নিয়েও কথা বলতে পারেন না।
মে দিবস তাই কেবল উদযাপনের নয়, আত্মসমালোচনার দিনও। আমাদের ভাবতে হবে—যে শ্রমিকের ঘামে শহর দাঁড়ায়, যে শ্রমিকের হাতে কারখানা চলে, যে শ্রমিকের পরিশ্রমে অর্থনীতি এগোয়, তার জীবন কেন অনিরাপদ থাকবে?
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র হতে চায়, তবে শ্রমিকের অধিকারকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রস্থলে আনতে হবে। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, নারী শ্রমিকের মর্যাদা, অনানুষ্ঠানিক খাতের স্বীকৃতি ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন শ্রমিক কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নয়—একজন পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী