নির্বাচনের বৈধতা ও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি
নির্বাচনে কে জিতবে, বিএনপি না জামায়াত?—এই প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশিদের বর্তমান স্বাভাবিক ব্যস্ততার বাইরেও ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আরও দুটি সাধারণ প্রশ্ন বা বিতর্কের বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনে কোনো না কোনো মাত্রায় কারচুপি হওয়ায় প্রথম প্রশ্নটি হলো, এবারের নির্বাচনেও কোনো ধরনের কারচুপি হবে, নাকি সত্যিকার অর্থেই জনগণের ভোটের প্রতিফলন দেখা যাবে?
দ্বিতীয় প্রশ্নটি বাংলাদেশের ভেতরে খুব কম মানুষই তুলতে চান। কিন্তু দেশের বাইরে এটি বেশ খোলামেলাভাবে আলোচিত হচ্ছে। প্রশ্নটি হলো, আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় এই নির্বাচনকে কি ন্যায্য ও বৈধ বলা যাবে?
এই লেখাটি মূলত দ্বিতীয় প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করেই। যদিও নির্বাচনী কারচুপির বিষয়টি নিয়েও অল্পবিস্তর আলাপ প্রয়োজন।
এটা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের ভেতরে এবং প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যেও এমন অসৎ শক্তি রয়েছে, যারা সুযোগ পেলেই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে তাদের সমর্থিত পক্ষের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করবে।
সরকার দাবি করছে, এটি হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বচ্ছ নির্বাচন। যদিও নির্বাচন কমিশনের ভেতরে, পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কিংবা গণমাধ্যমে কারচুপি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সুরক্ষা ও নজরদারি আদৌ আছে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন এবং ফলাফল আসার পরই বিষয়টি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। তারপরও যদি কোনো কারচুপি হয়ও, সেটা বেশ সীমিত পরিসরে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে, কারচুপি না হলেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচনকে ‘ন্যায্য’ বা ‘বৈধ’ বলা যায় কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নীতিগতভাবে, যেকোনো ‘ন্যায্য’ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। আর বাংলাদেশের ইতিহাস জুড়েই আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অথবা দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় দল হিসেবে থেকেছে।
এমনকি, এখনো যদি দলটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো, তারা হয়তো নিশ্চিতভাবেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন জিতত এবং সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলত। সম্ভবত, কোন দল সরকার গঠন করবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য কেমন হবে, সেটা নির্ধারণেও আওয়ামী লীগের ভূমিকা থাকত। সংক্ষেপে বললে, আওয়ামী লীগকে অন্তর্ভুক্ত করলে আগামী নির্বাচনের চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।
এই যুক্তির ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ দাবি করছে, নির্বাচন থেকে তাদের বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং সেই কারণে এর ফলাফল হবে অবৈধ।
তবে এই দাবি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে কোনো আলাপ করছে না যে, কেন তাদেরকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সরাসরি ভূমিকায় ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকান্ড, স্থান নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ হয়েছে এখানে। এই প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর হাতে ৮০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। এটা ছোট কোনো বিষয় না। বরং দলটিকে এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার মূল কারণই এটি।
এই বাস্তবতা শুধু আওয়ামী লীগই উপেক্ষা করছে না, দলটির বর্তমান অবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল সাংবাদিক ও অন্যরাও প্রায়শই এই বিষয়টিকে গৌণ হিসেবে দেখেন কিংবা এড়িয়ে যান।
প্রশ্ন হলো, এই যুক্তি কি আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে ভিন্নভাবে। ধরা যাক, এমনই একটি ঘটনা অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে ঘটেছে। তাহলে সেখানে বিষয়টিকে কীভাবে দেখা হতো এবং কী ধরনের রাজনৈতিক পরিণতি হতো? কল্পনা করা যাক, ব্রিটেনে এমনই কিছু ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শত শত মানুষ নিহত হয় এবং হাজারো মানুষ গুরুতরভাবে আহত হন। লেবার পার্টির প্রায় সব মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতারা হয় প্রকাশ্যে এই নীতিকে সমর্থন দিয়েছেন বা নীরব থেকেছেন কিংবা স্পষ্টভাবে সমালোচনা করেননি। স্টারমার ও অন্য শীর্ষ নেতারা স্থানীয় লেবার আসনভিত্তিক সংগঠনগুলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মাঠে নামতে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করলেন। কোনো কোনো এলাকায় লেবার কর্মীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে এবং তাদের অনেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়।
আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা বাড়তে থাকে। এদিকে স্টারমার ও লেবার পার্টির নেতৃত্বের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে পালিয়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ যুক্তরাজ্যে একটি অনুসন্ধানী মিশন পাঠায়। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সমর্থনে ‘লেবার পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস উপাদানগুলো’ পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল, যার মধ্যে ‘শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ রয়েছে। তারপরও পরবর্তী দেড় বছরে স্টারমার বা দেশে-বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ কোনো নেতাই দলটির বা সরকারের দায় স্বীকার করলেন না। উল্টো ফাঁস হওয়া অডিওতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, লেবার পার্টির পদ ধরে রাখা স্টারমার ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যের ভেতরে থাকা দলীয় কর্মীদের সহিংসতা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছেন।
এমন কিছু যদি যুক্তরাজ্যে—অথবা অন্য কোনো উদার গণতান্ত্রিক দেশে—ঘটত, তাহলে কি লেবার পার্টিকে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দিতো? এরপরও লেবার স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, এমনটা প্রায় অকল্পনীয়। কারণ, দলটিকে মৌলিক গণতান্ত্রিক সীমারেখা লঙ্ঘনকারী হিসেবে দেখা হতো এবং নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হতো না। কেবলমাত্র নতুন ও বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পরই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারত দলটি।
যুক্তরাজ্যে এমন আচরণ করায় লেবার পার্টিকে যদি নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি করে, তাহলে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোয় বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিক আচরণ করছে—এ কথা বলা কঠিন। কিছু পরিস্থিতিতে কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া নির্বাচনকে অবৈধ করে না। গণতান্ত্রিক বৈধতার সীমানার বাইরে চলে গেলে এমন সিদ্ধান্ত বরং তাদেরই আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ভূমিকা তেমনই একটি পরিস্থিতি।
এটি সত্য যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিরোধীদের মধ্যে এমন অনেক চরম পক্ষপাতদুষ্ট রয়েছে, যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে যেকোনো ধরনের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা থাকলে সে ‘অপরাধে’ জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করে। এমন ঘটছে জাতীয়, জেলা ও স্থানীয় সকল পর্যায়েই। এর ফলেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। আর তারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রমাণ ছাড়াই শত শত, সম্ভবত হাজারো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করে রাখা।
এসব বাড়াবাড়ি উদ্বেগজনক এবং সেটা স্বীকার করতেই হবে। আওয়ামী লীগকে বর্তমান রূপে এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া উচিত নয়—এই শক্তিশালী যুক্তি উপলব্ধি করতে কোনো অতিরঞ্জিত দাবি মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যভাবে বললে, বিরোধীদের অতিরঞ্জন ও অপব্যবহার স্বীকার করলেও এই আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার মূল যুক্তি সম্পূর্ণ অটুট থাকে। সেই ভিত্তিতে, আওয়ামী লীগ ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনকে অবৈধ বলে খারিজ করা যায় না।
তবে এটাও সত্য যে, আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার একটা মূল্য দিতে হবে—যা এই নির্বাচনের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে তুলে ধরবে। দেশের ভোটারদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সমর্থক। তারা কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কেননা, এবার তাদের এমন দলে ভোট দিতে হবে, যাদের তারা সমর্থন করেন না; কিংবা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। দলটিকে বাদ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি থাকলেও তাদের অনুপস্থিতি দেশের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। এতে লাভবান হবে কেবল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন নয়।
এই কারণেই আওয়ামী লীগকে সমর্থন না করলেও এ কথা বলা যায় যে, আগামীতে নতুনভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করা একটি আওয়ামী লীগের আবির্ভাবের জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া উচিত। সেই আওয়ামী লীগে ১৯৭১, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক উদারনীতির ঐতিহাসিক অঙ্গীকারের ভিত্তি থাকবে এবং নতুন নেতৃত্বে যারা থাকবে, তাদের বিশ্বাসযোগ্যভাবে নিশ্চিত করতে হবে যে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি দায়ীদের সঙ্গে তারা স্পষ্টতই সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
তবে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রবাহে ফিরতে হলে দলটিকে নিজস্ব জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা ও সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সেই পথে দলটিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি চাপও প্রয়োগ করতে হবে।
এমন একটি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সবচেয়ে ক্ষতিকর কিছু চর্চা, বিশেষ করে গণগ্রেপ্তার ও প্রমাণ ছাড়াই দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখার মতো কাজ থেকে সরে আসতে হবে। কেবলমাত্র বিশ্বাসযোগ্য ও পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে যেসব মামলা হয়েছে বা হবে, সেগুলোই চালিয়ে যাওয়া উচিত। যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রমাণ নেই, তাদের মুক্তি দিতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে যদি এভাবে চাপে রাখা হয়, তাহলে দলটির ভেতরের যারা এর সংস্কার চান, তারাও এই কঠিন কাজটি শুরু করতে পারবেন না।