সাক্ষাৎকার

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে কেন

খায়রুল হাসান জাহিন

‘পোস্ট কলোনিয়াল থিওরি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব হিন্দু ন্যাশনালিজম’ (২০২৫) গ্রন্থের লেখক, দার্শনিক ও বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ ড. মীরা নন্দার সঙ্গে আলাপচারিতা।

দ্য ডেইলি স্টার: আপনি যুক্তি দিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বামপন্থীদের পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদ) সংক্রান্ত সমালোচনার ধরন দেখে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীরা। এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের রাজনীতিকে বৈধতা দিতে প্রায় একই ধরনের ‘ডিকলোনিয়াল’ বা ‘উপনিবেশবাদ-মুক্ত’ ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। আদর্শগতভাবে বিপরীত দুই পক্ষ কীভাবে একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করল?

মীরা নন্দা: আমার বইয়ের মূল বক্তব্যই হলো—পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদ) ও ডিকলোনিয়াল (উপনিবেশবাদ-মুক্ত) তত্ত্বের মধ্যে এমন কিছু বিষয় আছে, যা বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাদী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের জন্য খুব সহজেই ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছে।

আমার অনেক সমালোচক পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভারতীয় মনকে উপনিবেশমুক্ত করার’ আহ্বানের যে স্পষ্ট মিল রয়েছে, তা এড়িয়ে যান। তারা দাবি করেন—হিন্দুত্ববাদীরা পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ লক্ষ্যকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বা বিকৃত করছে।

আমার মতে, বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা আসলে বাস্তবতাকে ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাওয়া।

কারণ পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ ভাষার আড়ালে এমন কিছু চিন্তা রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বা বিশেষ মনে করার প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যায়।

হিন্দুত্ববাদীরা সেই চিন্তা বা কাঠামোকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে না। বরং ওই চিন্তার অনেকটাই তাদের নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়।

পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের মৌলিক ধারণাগুলোর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের দীর্ঘদিনের কিছু বিশ্বাসের বেশ মিল রয়েছে। অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে এই মিল স্পষ্ট।

প্রথমত, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের মূল কথা হলো, রাজনৈতিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও মানুষের চিন্তা ও মানসিকতায় ঔপনিবেশিকতার প্রভাব রয়ে গেছে। এটাকেই বলা হয় ‘মানসিক ঔপনিবেশিকতা’।

এই তত্ত্বের মতে, স্বাধীনতার পর ভারত যেসব ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে—যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি অধিকার, মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ এবং উন্নয়নবাদ—এসব মূলত ইউরোপে গড়ে উঠেছে।

ভারতীয় অভিজাতরা এসব ধারণাকে সবার জন্য প্রযোজ্য ও সার্বজনীন মনে করে গ্রহণ করেছেন। এর ফলে ভারত নিজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে আধুনিকতার নিজস্ব পথ তৈরি করতে পারেনি। বরং ইউরোপীয় চিন্তার কাঠামোর মধ্যেই আটকে গেছে।

এই ধারণার সঙ্গে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীদের বক্তব্যের মিল রয়েছে। গান্ধী, বিবেকানন্দ থেকে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত অনেকেই বলে এসেছেন, ভারতের পথ নির্ধারণ করতে হবে তার নিজস্ব ‘আত্মা’ ও ‘আধ্যাত্মিকতার’ ভিত্তিতে।

দ্বিতীয়ত, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, ভারত বা বৃহত্তর প্রাচ্যকে ইউরোপে তৈরি কিছু নির্দিষ্ট ধারণা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতা, মার্ক্সের শ্রেণিসংগ্রামের ধারণা বা আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ দিয়ে ভারতীয় সমাজ ও জ্ঞানকে বিচার করলে তা ‘জ্ঞানমূলক সহিংসতা’ বা ‘জ্ঞানমূলক অবিচার’ তৈরি করতে পারে।

এই চিন্তার পেছনে এডওয়ার্ড সাঈদ, মিশেল ফুকোসহ উত্তর-গঠনবাদী চিন্তাবিদদের প্রভাব রয়েছে। তাদের মতে, আমরা যাকে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান বলে মনে করি, সেটিও অনেক সময় ক্ষমতা ও প্রচলিত চিন্তা কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

তাই ভারতকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপীয় জ্ঞান ও ধারণাকে মানদণ্ড হিসেবে না দেখে ভারতের নিজস্ব ধারণা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ ইউরোপীয় জ্ঞানকে একমাত্র বা সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে দেখা যাবে না।

মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারও শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সময় অনেক ক্ষেত্রে ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞানব্যবস্থা’কে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে হিন্দু দর্শন ও ঐতিহ্য থেকে আসা বিভিন্ন ধারণাও রয়েছে।

তৃতীয়ত, পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ‘সাবঅলটার্ন’ বা সমাজের নিচের স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর সামনে নিয়ে আসা। ঔপনিবেশিক শাসক এবং পরে ঔপনিবেশিক চিন্তায় প্রভাবিত অভিজাতদের কারণে যাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষিত হয়েছে, তাদের নিজেদের দৃষ্টিতে সমাজ ও ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।

এটিকেই পোস্ট-কলোনিয়াল প্রকল্পের একটি ‘মুক্তিকামী’ দিক হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু এই ধারণার সমালোচকদের মতে, সাবঅলটার্ন মানুষের চিন্তা ও চেতনা প্রচলিত ক্ষমতা ও ধর্মীয় ধারণা থেকে পুরোপুরি স্বাধীন নয়। তাদের চিন্তাও সমাজের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ দ্বারা গড়ে ওঠে।

এই কারণে সাবঅলটার্নদের চেতনা অনুসরণ করলে অনেক সময় তা হিন্দুধর্ম, এমনকি হিন্দুত্ববাদের কাছেও গিয়ে পৌঁছাতে পারে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিম্নবর্গের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তাই সাবঅলটার্নদের চিন্তাকে ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানের বিকল্প হিসেবে সরাসরি মহিমান্বিত করলেই তা ‘মুক্তিকামী’ হয়ে যায় না। বরং সেই চিন্তার ভেতরেও প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব থাকতে পারে।


ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ায় একদিকে নতুন প্রযুক্তি আসছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে; অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারও বাড়ছে। আধুনিকায়ন কেন সমাজকে আরও ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী করে তুলতে পারেনি?

মীরা নন্দা: আধুনিক প্রযুক্তি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে ‘পাশ্চাত্য’ ও ‘ঔপনিবেশিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থানই আজকের সংকট তৈরি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বিশ্বায়ন যত বেড়েছে, কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রতা ও দেশজতাবাদও তত শক্তিশালী হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতে এর একটি ভালো উদাহরণ দেখেছি। সেটি হলো তথাকথিত ‘প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা’। ভারতে জনপ্রিয় হওয়া প্রথম দিকের এআইভিত্তিক অ্যাপগুলোর প্রায় সবই জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে! জ্যোতিষীরাই বড় পরিসরে এআই ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। এর কারণ, এসব প্রাচীন কুসংস্কারের চাহিদা অনেক। এমনকি এসব অ্যাপের কোড লেখা সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা নিজেরাই জ্যোতিষের ভক্ত হলেও আমি অবাক হবো না।

পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ ভাষার আড়ালে এমন কিছু চিন্তা রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বা বিশেষ মনে করার প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যায়। হিন্দুত্ববাদীরা সেই মূল চিন্তা বা কাঠামোকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে না। বরং ওই চিন্তার অনেকটাই তাদের নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়।

মীরা নন্দা

এই ‘প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা’র শুরু উনিশ শতকের শেষ দিকে, স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর সময়েই। সে সময়ের ইসলামি সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আমি খুব বেশি পড়িনি। তবে বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দ সরস্বতীর মতো হিন্দু চিন্তাবিদেরা এ ধরনের চিন্তার পক্ষে ছিলেন।

বিবেকানন্দ এমন একটি ভারত চেয়েছিলেন, যার ‘পেশি হবে ইস্পাতের মতো শক্ত’, কিন্তু আত্মা হবে যোগীর মতো। অর্থাৎ ভারত প্রযুক্তিতে উন্নত হবে, কিন্তু তার ‘আধ্যাত্মিক আত্মা’ অক্ষুণ্ণ থাকবে।

গান্ধী অবশ্য নিজের অবস্থানে আরও ধারাবাহিক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যে শক্তি ও পৌরুষের ধারণা যুক্ত হয়, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি আধুনিক জীবনব্যবস্থারও বিরোধিতা করেছিলেন—যেখানে নারী-পুরুষ স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে, শহরে বাস করবে এবং সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেবে।

তাহলে তারা এই দুই বিপরীত ধারণাকে কীভাবে একসঙ্গে মেলালেন?

মূলত তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পকে পুরো মানবজাতির সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যে আধুনিক বিজ্ঞান এসব প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে, তাকে নতুন জ্ঞান হিসেবে স্বীকার করেননি। তাদের দাবি ছিল, আধুনিক বিজ্ঞান আসলে সেই জ্ঞানই নতুন করে আবিষ্কার করেছে, যা প্রাচীন আর্য ঋষিরা বেদ ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে আগেই জানতেন।

তাই রেলপথ, টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন সুবিধা তারা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী চিন্তাকে তারা ইউরোপের নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন।

অর্থাৎ, আধুনিক প্রযুক্তিকে তারা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও কল্যাণকর বলে মনে করলেও, আধুনিক বিজ্ঞানকে হিন্দু ‘আধ্যাত্মিকতা’ ও রহস্যবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন।

এর ফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমে আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানযুগের সূচনা হয়। এই আন্দোলন মধ্যযুগীয় সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

কিন্তু ভারতে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানকে সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘাতে না এনে ‘বৈদিক’ আধ্যাত্মিকতা ও রহস্যবাদের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরের প্রথম কয়েক দশকে নেহরুর নেতৃত্বে ‘বৈজ্ঞানিক মানসিকতা’ ও যুক্তিনির্ভর চিন্তা গড়ে তোলার কিছু চেষ্টা হয়েছিল। এর মাধ্যমে হিন্দুধর্মের প্রচলিত কিছু ধর্মীয় ও অধিবিদ্যাগত ধারণাকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব বেশি দূর এগোয়নি।

বরং ১৯৮০-এর দশক থেকে আধুনিক বিজ্ঞানকেই ‘ইউরোকেন্দ্রিক’ এবং ‘জ্ঞানমূলক সহিংসতার’ উৎস হিসেবে সমালোচনা করা শুরু হয়।

ফলে যা ঘটেছে তা হলো—প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, কিন্তু মানুষের চিন্তা ও সমাজের ঐতিহ্যনির্ভর মানসিকতার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

মীরা নন্দা


ডেইলি স্টার: সরকার ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী যখন দেশীয় জ্ঞানের কথা বলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন বিজ্ঞানীদের কী করা উচিত?

মীরা নন্দা: এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তখন যুক্তি ও বিজ্ঞানের সার্বজনীনতা কীভাবে রক্ষা করা যায়—সেটাই প্রশ্ন।

কাজটি সহজ নয়। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের একাংশও যখন সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের ফাঁদে পড়েছেন এবং মনে করছেন, যা কিছু সার্বজনীন তা-ই ইউরোকেন্দ্রিক—তখন বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

আমার মনে হয়, প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেমন ভারত সরকার আয়ুর্বেদসহ বিভিন্ন দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতির প্রচার করেছিল। এমনকি গোমূত্র ও গোবরের মতো হাস্যকর ‘চিকিৎসা’র কথাও বলা হয়েছিল। এসব দাবির জবাব দিতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করে।

তবে সংকট শেষ হয়ে গেলেই এই কাজ থামানো যাবে না। আয়ুর্বেদের মূল ধারণাগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষায় সেগুলোর কোন কোন দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তা দেখাতে হবে।

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শন আমাদের অনেক সাহায্য করতে পারে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত আমার বই ‘সায়েন্স ইন স্যাফরন: স্কেপটিক্যাল এস্যেস অন দ্য হিস্টোরি অব ইন্ডিয়ান সায়েন্স’-এ আমি প্রাচীন ও প্রাক-আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানের বিভিন্ন ভুল ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তথাকথিত ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞানব্যবস্থা’ যুক্ত করার বিরুদ্ধেও একই ধরনের উদ্যোগ দরকার। আমার সাম্প্রতিক বই ‘অ্যা ফিল্ড গাইড টু পোস্ট-ট্রুথ ইন্ডিয়া’-তে আমি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি।

আমার বিশ্বাস, বিজ্ঞানী ও ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য আমাদের নানা ধরনের অপবাদ শুনতে হতে পারে। কিন্তু সত্য ও যুক্তির পক্ষে দাঁড়ানোর এটাই মূল্য।

মীরা নন্দার ‘পোস্ট কলোনিয়াল থিওরি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব হিন্দু ন্যাশনালিজম’ (২০২৫) গ্রন্থের মোড়ক


ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমেই চাপে পড়ছে। এর ভবিষ্যৎ কী?

মীরা নন্দা: আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

আজকের ভারতের মতো একটি সমাজে, যেখানে দেব-দেবী, ধর্মীয় গুরু, সাধু ও নানা ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের জীবন ও সমাজের গভীরে মিশে আছে, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা কঠিন।

যারা জীবনের প্রায় সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি দেখেন, তারা কেন রাষ্ট্রকে ধর্মীয় বিধান থেকে আলাদা রাখতে চাইবেন? আবার যারা নিজেদের পরিচয়কে ধর্মের মাধ্যমে দেখেন, তারাই বা কেন চাইবেন না যে, রাষ্ট্র তাদের ধর্ম ও বিশ্বাস রক্ষা করুক?

ধর্মনিরপেক্ষতা টিকিয়ে রাখতে হলে মানুষের চিন্তাভাবনাতেও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা থাকতে হবে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বলা যত সহজ, বাস্তবে করা ততটাই কঠিন। এর কোনো সহজ সমাধান আমার জানা নেই।

আমি শুধু বলতে পারি, যেখানেই অযৌক্তিকতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি দেখা যাবে, সেখানেই তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’ দিনকে দিন প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে শ্রেণি, শ্রম ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনায় কী প্রভাব পড়েছে?

মীরা নন্দা: বাম ও ডান—দুই পক্ষের সাংস্কৃতিক রাজনীতিই শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের বাস্তব জীবন ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছে।

পোস্ট-কলোনিয়াল বামপন্থীরা শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, এই বিশ্লেষণ ‘মৌলবাদী’ ও ‘ইউরোকেন্দ্রিক’। তারা মনে করে, নিম্নবর্গের মানুষের চিন্তা ও চেতনা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের চেয়ে সমাজ ও সম্প্রদায়ের মূল্যবোধের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।

ভারতে ‘নিচ থেকে ইতিহাস লেখার’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো সাবঅলটার্ন স্টাডিজ। এই ধারার গবেষকেরা ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। মার্ক্সবাদ বা আধুনিকায়ন তত্ত্বে শ্রমজীবী শ্রেণিকে যেভাবে দেখা হয়, তারা সেটিকে গুরুত্ব দিতে চান না।

তাদের কাছে শ্রেণিসংগ্রামের ধারণাই পুরোনো। তাই তাদের প্রস্তাব হলো—দরিদ্র মানুষ, নতুন সামাজিক আন্দোলন, এনজিওসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী জোট গড়ে তুলবে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’ তত্ত্বও মূলত এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীরা নিম্নবর্ণ, দলিত ও শ্রমজীবী মানুষকে হিন্দু পরিচয়ের অধীনে একত্রিত করতে চাইছে। একইসঙ্গে তাদের মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস তাদের শাখা, স্কুল এবং এমনকি শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমেও তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষকে নিজেদের শ্রমিক পরিচয়ের আগে ‘হিন্দু’ হিসেবে ভাবতে শেখানো হচ্ছে।

পোস্ট-কলোনিয়াল বামপন্থীদের মতো হিন্দুত্ববাদী চিন্তাবিদদেরও দাবি, শ্রেণিসংঘাত পশ্চিমা সমাজের বিষয়, ভারতের নয়। তাদের মতে, হিন্দু সমাজ একটি ‘অখণ্ড’ বা ‘জৈবিক’ সমাজ। এখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মতো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

তাদের যুক্তি হলো, মানবদেহের একটি পা যেমন মাথার বিরুদ্ধে লড়াই করে না, তেমনি শ্রমজীবী নিম্নবর্ণের মানুষও (যাদের তারা ‘পা’ হিসেবে দেখেন) ব্রাহ্মণদের অর্থাৎ ‘মাথার’, বিরুদ্ধে কেন লড়াই করবে?

এই তথাকথিত ‘অখণ্ড সমাজে’ শ্রেণিসংঘাতের কোনো জায়গা নেই। বরং সব গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির ওপর জোর দেওয়া হয়।

ইলাস্ট্রেশন: আনোয়ার সোহেল/ স্লো রিডস


বর্তমান সরকারও সামাজিক সমস্যার সমাধান হিসেবে বাজারব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করছে। এর অর্থ হলো, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল ভর্তুকি, করছাড় ও জমি দেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবসায়ীকে দরিদ্র মানুষের ‘অভিভাবক’ বা ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের জন্য থাকছে সীমিত নগদ সহায়তা। এসব সহায়তা অনেক সময় ভোটব্যাংক তৈরির মাধ্যম হয়ে উঠছে। সবার জন্য ভালো স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অবকাঠামো তৈরির বদলে দরিদ্র মানুষকে নগদ অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিজেপি সরকার হিন্দুধর্মকে ব্যবহার করছে ‘ব্র্যান্ড ভারত’ গড়ে তোলার জন্য। বিদেশি কোম্পানি ও অন্যান্য দেশের কাছে ভারতকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান, যোগব্যায়াম ও প্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং সবার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সেবার বিষয়গুলো ঐতিহাসিকভাবে বামপন্থীদের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক অধিকার ও জীবনযাত্রার বাস্তব সমস্যা নিয়ে আন্দোলন বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে আনতে পারে।

ভারতের পাঞ্জাবে কৃষক আন্দোলনের সময় কিংবা নাগরিকত্বকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা সাংবিধানিক সংশোধনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমরা এমন ঐক্যের কিছু উদাহরণ দেখেছি।

বামপন্থীদের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন এখনো সক্রিয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বুদ্ধিজীবীদের মনোযোগ শ্রেণি, শ্রম ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বদলে সাংস্কৃতিক পরিচয় ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে।