ট্রাম্পের ভোটার কারা?
এ বছর করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া, মহামারি মোকাবিলায় তার ব্যর্থতা এবং বর্ণবাদ ও পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভসহ যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে।
কয়েক মাসের জরিপ ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, কেবল ট্রাম্প নয়, মার্কিন সিনেট ও হাউসেও রিপাবলিকানদের ভরাডুবি হবে, তারা ব্যাপক ভোটে পরাজিত হবেন।
কিন্তু, আবারও চমকে দিলেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালের তুলনায় এ বছর প্রায় ৭০ লাখ ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ছিল অনেকটাই বিস্ময়কর। কীভাবে তিনি জয় পেলেন, তা নিয়ে জরিপ-বিশ্লেষণের কোনো ঘাটতি ছিল না।
সে বছর নির্বাচনের পরদিন নিউইয়র্ক টাইমসের পাবলিক এডিটর লিজ স্পয়েড লিখেছিলেন, ‘আমি আশা করি টাইমসের সম্পাদকরা আমেরিকার অর্ধেক অংশ নিয়ে ভাববেন, যাদের কথা পত্রিকাটিতে খুব কমই প্রকাশ করা হয়।’
আমেরিকার অর্ধেক অংশ— ৬৩ মিলিয়ন মানুষ ২০১৬ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। সেই অর্ধেক অংশ ২০২০ সালের নির্বাচনেও বিশ্বকে অবাক করেছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে হয়তো আসছেন না, তা মোটামুটি স্পষ্ট হলেও, ২০১৬ সালের চেয়েও এ বছর বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি।
প্রশ্ন হলো— যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন, তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্ধেক অংশ সম্পর্কে ‘যথেষ্ট চিন্তা’ করেন, জরিপ-বিশ্লেষণে তাদের মতামতের প্রতিফলন কি ঘটে?
ভুল ভবিষ্যদ্বাণী
ঘটনাবহুল বছর ২০২০ সালে একটি ধারণা ছিল যে, ট্রাম্প বিভাজন করছেন এবং সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। রাজনৈতিক পোলিংয়ে নিয়মিতভাবে দেখানো হয়েছিল যে, আমেরিকানরা ট্রাম্পের সামগ্রিক কাজের কর্মক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন যে ব্যবস্থা নিচ্ছেন, তা পছন্দ করছেন না। আমেরিকানরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা করছেন, এমন খবরই আমরা দেখতে পেয়েছি।
অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক পোলগুলো ‘জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট পদে ট্রাম্পকে সহজেই পেছনে ফেলে দেবে’ বলে দেখিয়েছে। পোলগুলো দেখিয়েছে, ডেমোক্রেটদের হারানোর জন্য সিনেটের রিপাবলিকানদের রীতিমতো সংগ্রামই করতে হবে।
কিন্তু, পোলের স্ক্রিপ্টকে ভুল প্রমাণ করলেন আমেরিকান ভোটাররা। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি হয়নি।
রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ফ্রাঙ্ক লুন্টজ জানান, এর পেছনে কারণ হলো— যারা এ ধরনের পোল পরিচালনা করেন, তারা ২০১৬ সাল থেকে কিছু শেখেননি।
ফক্স নিউজকে লুন্টজ বলেন, ‘তাদের উচিত ছিল এ বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে যাচাই করা। কারণ, তারা চার বছর আগেও একই ভুল করেছিল।’
ট্রাম্পের ভোটার কারা?
নির্বাচন নিয়ে সব পূর্বাভাস বানচাল করে দিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে কারা ভোট দিলেন? ২০১৬ সালের তুলনায়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অংশে, যে আমেরিকানরা তাকে ভোট দিয়েছিলেন, এ বছরও তাদের সংখ্যা মোটামুটি একই ছিল এবং আরও নতুন সমর্থকও যুক্ত হয়েছেন।
বার্তাসংস্থা এপির ‘ভোটকাস্ট নির্বাচন পরবর্তী’ সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ বছর মার্কিন ভোটারদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (৭৪ শতাংশ) শ্বেতাঙ্গ ছিলেন এবং তাদের মধ্যে ৫৫ শতাংশই ছিলেন ট্রাম্পের সমর্থক। প্রায় অর্ধেক পুরুষ (৫২ শতাংশ) তাকে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়াও, ছোট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসকারী ভোটারদের ৬০ শতাংশ ভোট জিতেছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে বাইডেন পেয়েছেন স্নাতক পাশ করা কলেজ শিক্ষার্থীদের ভোট। তাদের মধ্যে ৫৭ শতাংশের ভোট পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও, ৫৫ শতাংশ নারী ভোটারদের ভোট জিতেছেন বাইডেন।
পাশাপাশি, ৪৫ বছরের কম বয়সীদের ৫৫ শতাংশ ও শহরে থাকা ভোটারদের ৬৫ শতাংশ ও শহরতলির ভোটারদের ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন জো বাইডেন।
তথাকথিত যে ২০৬টি ‘পিভট কাউন্টি’ ২০০৮ ও ২০১২ সালে বারাক ওবামার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু, ২০১৬ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন করে, এ বছর সেগুলোর মধ্যে ১৭৪টিতে জিতেছে ট্রাম্প। বাইডেন জিতেছে মাত্র ২০টি। বাকি কাউন্টিতে এখনো ভোট গণনা চলছে।
বিভাজনের রাজনীতি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন সম্পর্কে অনেক কিছুই লেখা হয়েছে। যেমন— অভিজাত বনাম শ্রমিক শ্রেণি, ধার্মিক বনাম অবিশ্বাসী, নগর বনাম শহরতলি ইত্যাদি।
তবে, ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও হলিউডের সচেতন পর্যবেক্ষক বিশ্লেষকদের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তথাকথিত ‘অভিজাত’দের একপাক্ষিক উদ্বেগ ও আগ্রহকে তারা প্রশ্ন করেন। ট্রাম্প সমর্থকরা বলেছিলেন যে, আমেরিকানদের একটি বিশাল অংশের মধ্যে তথাকথিত ‘অভিজাত’দের অবস্থান ও মতামতের কোনো যৌক্তিকতা, গ্রহণযোগ্যতা নেই।
এরাই হলেন ট্রাম্পের ভোটার। মধ্য আমেরিকায় বসবাসকারীদের অধিকাংশই আগে বারাক ওবামাকে সমর্থন করতেন। তারা এখন ডেমোক্রেট পার্টির প্রতি হতাশ হয়ে পড়েছেন। কারণ, তারা নিজেদেরকে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী বলে মনে করছেন এবং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে উপেক্ষিত বলে মনে করছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পরে তারা এক ধরনের সমীহ পেয়েছিলেন।
ডেমোক্রেটরা এ বছর নির্বাচনে আবারও এই অংশের কথা ভুলে গিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছেন আইডাহোর ভ্যালি কাউন্টির বাসিন্দা ডায়ানা ওয়াগনার। কেন ট্রাম্পকে ভোট দিলেন?, জানতে চাইলে তিনি ওয়াশিংটন ডিসির সরকার সম্পর্কে আল-জাজিরাকে বলেন, ‘তাদেরকে দেখে মনে হয়, তারা ভুলে গেছে যে এর বাইরেও পৃথিবীর বাকি অংশ আছে, দেশের বাকি অংশ আছে।’
ডেমোক্রেটসহ অনেকেই ভেবেছিলেন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি অধিকাংশ আমেরিকানদের যোগাযোগের বাইরে চলে গেছেন, সবার বিদ্বেষের মুখে পড়েছেন। কিন্তু, ওয়াগনারের মতো ভোটারদের তারা আবারও ভুল বুঝেছেন। যার ফলে প্রত্যাশার চাইতেও অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন ট্রাম্প ও রিপাবলিকরা।
ট্রাম্প জিতুক বা হারুক ৭০ লাখেরও বেশি ভোটার, যারা নতুন করে এ নির্বাচনে তাকে সমর্থন করছেন, তারা আবারও একটি স্পষ্ট সংকেত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় অংশ এখনো ট্রাম্পের পক্ষেই আছেন।
আরও পড়ুন:
মার্কিন নির্বাচনের ফল ঘোষণায় দেরি কি এবারই প্রথম?
ট্রাম্পকে শান্ত থাকার আহ্বান জার্মানির, নীরব যুক্তরাজ্য
জর্জিয়ায় ভোট পুনরায় গণনা হবে
পেনসেলভেনিয়ায় ট্রাম্পকে পেছনে ফেললেন বাইডেন
‘ব্যর্থতার দায় রিপাবলিকানদের “দুর্বল” সমর্থন’
ফিলাডেলফিয়ায় ভোট গণনা কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা, তদন্তে নেমেছে পুলিশ
জর্জিয়া ও পেনসেলভেনিয়াতে হারলে ট্রাম্পের সম্ভাবনা শেষ
২৪ ঘণ্টায় ট্রাম্পের ১৬ টুইট, ৭টিই ‘বিভ্রান্তিকর’
ফিলাডেলফিয়ার ভোট গণনা বন্ধে ট্রাম্পের আবেদন খারিজ
জর্জিয়ায় ৯১৭ ভোটে এগিয়ে বাইডেন: এপি
‘মিথ্যা’ দাবি, ট্রাম্পের সংবাদ সম্প্রচার বন্ধ করে দিলো ৩ টিভি চ্যানেল
‘সহিংস’ বক্তব্যের কারণে ট্রাম্প সমর্থকদের গ্রুপ সরিয়ে ফেলেছে ফেসবুক