পাহাড়কে ঘর বানিয়েছেন সমতলের যে সাঁওতালরা

সুসান্না টুডু

পানছড়ির পাহাড়ি এলাকায় ঢুকলে সবার আগে চোখে পড়ে চেঙ্গি নদী। নদীর এপার-ওপার ঘিরে গড়ে উঠেছে সাঁওতালদের বসতি। ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন সিপাহী সরেন। বয়স ৯০ পেরিয়েছে। হাতে তুলে নিলেন সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ‘ধদরো বানাম’। খসখসে আঙুলের স্পর্শে বেজে উঠল পুরোনো এক সাঁওতালি সুর।

এই বাদ্যযন্ত্রটি এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। সিপাহী সরেনই এই গ্রামে এর সুর ধরে রাখা শেষ কারিগরদের একজন। তার বাজানো সুরে যেন এই জনপদের দীর্ঘ পথচলার গল্পও শোনা যায়।

খাগড়াছড়ির পানছড়ির এই সাঁওতালরা বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমতলের সাঁওতালদের মতো নন। বহু দশক ধরে তারা পাহাড়ের কোলে বসবাস করছেন। পাহাড়ের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন জীবনযাপন। তবে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছেন।

গত কয়েক দশক ধরে পানছড়ির সাঁওতালরা তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে তাদের জীবন গড়ে তুলছে।

পানছড়ি উপজেলার কানুনগোপাড়াসহ তিনটি পাড়ায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি সাঁওতাল পরিবারের বাস। সব মিলিয়ে এখানে প্রায় ৪০০ মানুষ বসবাস করেন। প্রতিটি পাড়ার সামাজিক বিষয় দেখাশোনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি পরিষদ রয়েছে। এর নেতৃত্ব দেন ‘মাঞ্জহি’ বা স্থানীয়ভাবে ‘কারবারি’ নামে পরিচিত একজন।

কানুনগোপাড়ার মূল অংশের কারবারি আকাশ সাঁওতাল মুর্মু। তিনি প্রায় ৪০টি পরিবারের দেখাশোনা করেন। মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখেন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোও পরিচালনা করেন।

পাহাড়ে দীর্ঘদিনের বসবাস তাদের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি তাদের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খাবার, পোশাক ও ঘরবাড়িতে পাহাড়ি সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে।

সমতলের সাঁওতালরা সাধারণত সিদ্ধ চালের ভাত খান। কিন্তু এখানকার সাঁওতালদের প্রধান খাবার আতপ চালের ভাত। পাহাড়ি অন্য জনগোষ্ঠীর মতো তারাও নাপ্পি (এক ধরনের শুঁটকি পেস্ট), শুঁটকি মাছ, বাঁশকোড়ল (বাঁশের কচি অংশ) ও টক পাতা দিয়ে রান্না করেন।

মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার জন্য বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছে।

পোশাকেও এসেছে পরিবর্তন। কাজের সুবিধার জন্য এখানকার নারীরা পাহাড়ি নারীদের মতো ‘থামি’ পরেন।

পাহাড়ের উঁচু-নিচু জমির সঙ্গে মানিয়ে ঘরবাড়ির ধরনও বদলেছে। সমতলের ভারী মাটির ঘরের বদলে তারা বাঁশ, কাঠ ও কাদার প্রলেপ দিয়ে ঘর তৈরি করেন।

পাহাড়ি সংস্কৃতির ছোঁয়া লাগলেও তারা কিন্তু মাতৃভাষা ‘সান্তালি’ একদম ভুলে যাননি। তবে কথ্য ভাষায় কিছু পাহাড়ি শব্দ যুক্ত হয়েছে। সাঁওতালি ভাষা ছাড়া তারা চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাতেও কথা বলতে পারেন।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা। এখনো সোহরাই, দাশাই ও বাহা পরবের মতো প্রধান উৎসবগুলো পালন করেন।

সোহরাই পালিত হয় শরতের ফসল কাটার পর। ঐতিহ্যবাহী কৃষিকাজে গবাদিপশুর ভূমিকার প্রতি সম্মান জানানো এই উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য। দাশাই সাধারণত আশ্বিন বা কার্তিক মাসে হয় এবং অনেক সময় দুর্গাপূজার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। এটা সাঁওতালদের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক ঘটনা স্মরণে পালন করা হয়। আর বাহা পরব বসন্তের ফুলের উৎসব।

সাঁওতালদের প্রার্থনা সভা।

তবে এই পাহাড়ি জীবনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতি ও জমি হারানোর ইতিহাস।

পানছড়িতে সাঁওতালদের আসার বিস্তারিত কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলে রাস্তা, রেলপথ ও চা-বাগানে কাজ করার জন্য সাঁওতালদের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে আনা হয়েছিল।

খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত গবেষক মানিক মুর্মুর মতে, ভারতের ডুমকা ও হাজারীবাগ থেকে কিছু সাঁওতালকে ব্রিটিশ শাসকরা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে নিয়ে আসে। ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পর তাদের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।

সাঁওতাল বিদ্রোহের আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব ব্যবস্থায় সাঁওতালদের জমি জোর করে কেড়ে নেওয়া হতো। তাদের চড়া সুদে ঋণ দেওয়া হতো, যা পরিশোধ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। ফলে বহু সাঁওতালকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জমিদারদের জমিতে সামান্য মজুরিতে কাজ করতে হয়েছে।

কানুনগোপাড়া (গ্রামের) তিনটি পাড়ায় ৭০-৮০টি সাঁওতাল পরিবারের প্রায় ৪০০ মানুষ বাস করেন।

এই শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮৫৬ সালের ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তা চলে। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সামরিক আইন জারি করে বিদ্রোহ দমন করে।

বিদ্রোহের পর নির্যাতন থেকে বাঁচতে অনেক সাঁওতাল বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। তাদের একটি অংশ চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতেও এসে বসতি গড়ে। 

কিন্তু রাঙামাটিতে তাদের সেই বসতিও বেশিদিন টেকেনি। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পর রাঙামাটির সাঁওতালদের ঘরবাড়ি ও চাষের জমি পানির নিচে চলে যায়। অন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মতো তারাও সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাননি। জমি হারিয়ে বেঁচে থাকার জন্য তাদের অনেকে গহিন পাহাড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

৯০ বছর বয়সী বুধিনী সাঁওতাল এখনো সেই সময়ের কথা মনে করতে পারেন। কাপ্তাই বাঁধের পানিতে কীভাবে এক রাতের মধ্যে তাদের পরিবারের সব জমি হারিয়ে গিয়েছিল, সে কথা বলতে গিয়ে তিনি থেমে যান।

আরেক প্রবীণ সিপাহী সরেনের বয়সও ৯০ পেরিয়েছে। কাপ্তাই বাঁধের সময়ের স্মৃতি তারও মনে আছে। তিনি বলেন, ‘পানি যখন ক্রমেই বাড়ছিল, চারপাশের সাঁওতাল পরিবারগুলো যে যেদিকে পারছিল পালাচ্ছিল। এমন এক তাড়াহুড়ার পরিস্থিতির মধ্যেই আমার বিয়ে হয়ে যায়।’

পরে এই পরিবারগুলো রাঙামাটি থেকে পানছড়িতে এসে বসতি গড়ে। ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা ঘরবাড়ি তৈরি করেন। চাষের জন্য জমিও তৈরি করেন।

কিন্তু সেখানেও জমি নিয়ে নতুন সংকট শুরু হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিষ্কার করে তৈরি করা অনেক জমি ছলচাতুরি করে বা নামমাত্র দামে অন্যদের হাতে চলে যায়। আজকের পানছড়ি বাজারসহ উপজেলা কমপ্লেক্সের বড় একটি অংশ যে জমিতে গড়ে উঠেছে, তার অনেকটাই একসময় সাঁওতালরা পরিষ্কার করে বসতি ও চাষের উপযোগী করেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।

অথচ সেই সাঁওতালদেরই এখন অনেককে দুর্গম পাহাড়ে দিনমজুরি করে জীবন চালাতে হয়।

গবেষক মানিক মুর্মুর মতে, বারবার জমি ও বসতভিটা হারানোর কারণে এই সম্প্রদায় অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘পুরো গ্রামের মধ্যে মাত্র সাত বা আটটি পরিবারের নিজস্ব কৃষিজমি আছে। বাকিরা দিনমজুরি করে চলেন।’

শিক্ষার সুযোগও সীমিত। শহর থেকে দূরে বসবাসের কারণে অনেকেই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। আবার পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিশু মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।

জমি ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পরিচয় নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। মুর্মু, টুডু, হাঁসদা, কিসকু, সরেন, হেমব্রম বা মার্ডি, এসব সাঁওতাল পদবি স্থানীয় অন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে সহজে পরিচিত নয়। তাই নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করতে অনেককে নামের শেষে ‘সাঁওতাল’ যোগ করতে হয়। যেমন মানিক সাঁওতাল বা আকাশ সাঁওতাল।

তরুণ প্রজন্মও এখন নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। সম্প্রতি তারা গঠন করেছে ‘সাঁওতাল স্টুডেন্টস ফোরাম’। নিজেদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

২০২৪ সালের ৯ জুন ফোরামের সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। আবাসিক সনদের আবেদনপত্র নিয়ে থাকা জটিলতা দূর করার দাবিও জানান তারা।

চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের সাঁওতালদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সরকারি স্বীকৃতি। স্থানীয় আইনে তাদের পাহাড়ি নৃগোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। ফলে পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জন্য থাকা সরকারি সুযোগ-সুবিধার অনেকটাই তারা পান না।

খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঞ্যোহ্লা মং বলেন, ব্রিটিশ আমলে সাঁওতালরা পার্বত্য চট্টগ্রামে আসায় তাদের এই অঞ্চলের মূল অধিবাসী বা আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয় না।

তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় তারা স্থান পাননি।’

এর ফলে চাকরি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ছেন বলে জানান ঞ্যোহ্লা মং। এতে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তারপরও পানছড়ির এই সাঁওতালরা নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে চলেছেন। বারবার ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়েও তারা ভাষা, উৎসব, পোশাক ও সংস্কৃতি ধরে রেখেছেন। আর নতুন প্রজন্ম নিজেদের অধিকার নিয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

একসময় সাঁওতাল বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, সেই লড়াইয়ের চেতনা আজও বেঁচে আছে। তারা পাহাড়ের এই জনপদে নিজেদের পরিচয় ও শিকড় ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।