জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পৌরসেবা, নেই জনপ্রতিনিধিও

দীপন নন্দী
দীপন নন্দী

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভার বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুবল দেব কয়েক মাস ধরে নিয়মিত পৌর কার্যালয়ে যাচ্ছেন। নিজের এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের আবেদন জানাতেই তার এই দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু প্রায় প্রতিবারই তার অভিযোগটি নথিভুক্ত করার জন্য কাউকে পান না।

সুবল দেব বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই আমার বাড়ির সামনের সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। সেই পানি কয়েক দিন ধরে থাকে। এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই খারাপ, কিন্তু পৌরসভা এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর নেই, অন্যদিকে তীব্র জনবল সংকট। এই দুই সমস্যার কারণে পৌর প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক সংস্কার, ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া—প্রায় সব ধরনের পৌরসেবাই এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) আদেশে দেশের ৩২৯টি পৌরসভার মধ্যে ৩২৩টির নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরকে অপসারণ করা হয়। বাকি পৌরসভাগুলোতে দায়িত্বে থাকা প্রশাসকরাও পরে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার ও সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে এসব কর্মকর্তার অনেকেই নিজ নিজ নিয়মিত সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি পৌরসভার কাজও করছেন।

এদিকে বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের পৌরসভাগুলোতে অনুমোদিত প্রায় ৫০ হাজার পদের মধ্যে ৩১ হাজার ১৪২টি পদ বর্তমানে শূন্য। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ১ হাজার ৯১২টি এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ২৯ হাজারের বেশি পদ খালি রয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তারা নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও তদারকি, বাজেট বাস্তবায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

তৃতীয় শ্রেণির কর্মীরা প্রশাসনিক কাজ, কর আদায় ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত সেবা দেন। আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা সড়ক ও ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকেন।

জনবল সংকটের কারণে বর্তমানে অনেক কর্মীকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। কোথাও হিসাবরক্ষক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন, আবার একজন কর্মকর্তাকে একাধিক পৌরসভার দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে।

পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, মেয়রদের অপসারণের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমে গেছে। কারণ প্রশাসকদের নিয়মিত সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি পৌরসভার কাজও করতে হচ্ছে। ফলে নাগরিক সেবা আগের তুলনায় ধীর হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল আলীম মোল্লা বলেন, একজন কর্মকর্তার ওপর একাধিক দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে কোনো কাজই ঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না। এতে নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

অধিকাংশ সময় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভায় অনুমোদিত ১৫৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। এর মধ্যে ১৩ জন স্থায়ী ও আটজন অস্থায়ী। নির্বাহী প্রকৌশলী ও সচিবসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।

পৌর প্রশাসক বরকত উল্লাহ সেবা দিতে দেরি হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এত কম জনবল নিয়ে উন্নয়নকাজ তদারকি ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, পৌরসভার আয় এত কম যে বর্তমান কর্মীদের বেতন-ভাতাও নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক কর্মচারী এখনো বেতন-ভাতার টাকা পাননি। নতুন নিয়োগ দেওয়া হলে সেই ব্যয় বহন করাও কঠিন হবে।

লালমনিরহাট পৌরসভায় অনুমোদিত ১৯০টি পদের মধ্যে ৯৭টি পূরণ হয়েছে। অধিকাংশ শূন্য পদ চতুর্থ শ্রেণির। তাই মৌলিক সেবা চালিয়ে নিতে অস্থায়ী কর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

পৌর প্রশাসক রাজিব হাসান বলেন, বর্তমান জনবল নিয়েই আমরা সেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এখনই নতুন নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী নির্বাচিত মেয়র।

বান্দরবান পৌরসভায় ১৭৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১০৯টি শূন্য। বর্তমানে কর্মরত ৭০ জনের মধ্যে স্থায়ী কর্মচারী মাত্র ২৯ জন।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা করুণাময় বড়ুয়া বলেন, জনসংখ্যা ও এলাকার পরিধি বিবেচনায় নতুন নিয়োগ না হলে সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে না।

টাঙ্গাইল পৌরসভায় অনুমোদিত ১৫৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯৭ জন। চিকিৎসা কর্মকর্তা ও স্যানিটারি পরিদর্শকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও শূন্য।

১০৭ বছরের পুরোনো সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ১৫৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ৪৯ জন।

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভায় ১৫৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র ৩৯ জন।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

বান্দরবান পৌরসভার জাদিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মংতিং মারমা বলেন, যে কোনো সেবা পেতে লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়।

তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধন সনদ কিংবা ট্রেড লাইসেন্স—যে কোনো সরকারি কাগজপত্র পেতেই অনেক সময় লাগে। সড়ক সংস্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সন্তোষজনক নয়।

টাঙ্গাইলের বাজিতপুর এলাকার বাসিন্দা আসলাম মিয়া বলেন, জন্মনিবন্ধন কিংবা নাগরিকত্বের সনদ পেতে অনেক সময় লাগে। পৌরসভায় এখন কোনো চিকিৎসা কর্মকর্তাও নেই।

টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনেওয়াজ পারভীন বলেন, অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে সময়মতো সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার শোলঘর এলাকার ক্বারি আমজাদ হোসেন জানান, বাবার মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করতে তিনি কয়েকবার পৌর কার্যালয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়েছে, প্রশাসক বিদেশে থাকায় অন্য কেউ সনদ দিতে পারছেন না।

তিনি বলেন, কবে সনদ পাব, সেটাও এখনো জানি না।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালী কৃষ্ণ পাল বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়োগ দেওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির দক্ষ কর্মকর্তার ঘাটতিই এই সমস্যার অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, দক্ষ জনবল ছাড়া আমরা সঠিকভাবে নাগরিক সেবা দিতে পারছি না।

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বাসিন্দা শুক্কুর আলী বলেন, রাস্তাঘাট ও বাড়ির সামনে ময়লার স্তূপ পড়ে থাকে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাও ঠিকমতো কাজ করে না। পৌরসভা কর নেয়, কিন্তু সে অনুযায়ী সেবা দেয় না।

শ্রীপুর পৌরসভার প্রশাসক সাজিব আহমেদ বলেন, দক্ষ কর্মীর অভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাধান কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনা ওি দ্রুত জনবল নিয়োগ দেওয়া—এই দুই পদক্ষেপই জবাবদিহি বাড়ানো, নগর প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং নাগরিক সেবা উন্নত করার জন্য সবচেয়ে জরুরি।

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, নতুন নিয়োগের আগে প্রতিটি পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গত ২৫ বছরে অনেক পৌরসভা যথেষ্ট যৌক্তিকতা ও আয় সক্ষমতা বিবেচনা না করেই গঠন করা হয়েছে। ফলে অনেক পৌরসভা নিয়মিত কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারে না।

তিনি জানান, ২০২৫ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ২০০টি পৌরসভায় কর্মচারীদের কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।

তার মতে, কিছু অকার্যকর পৌরসভা বিলুপ্ত করা প্রয়োজন হতে পারে। আবার কিছু ইউনিয়ন পরিষদকে পৌরসভায় উন্নীত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

এদিকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর শাখার অতিরিক্ত সচিব নজমুল হুদা শামীম বলেন, জনবল সংকট দূর করতে কাজ চলছে এবং শিগগিরই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তবে তিনি কবে থেকে নিয়োগ শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।

(এই প্রতিবেদন তৈরিতে সিলেট, লালমনিরহাট, বান্দরবান, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের নিজস্ব সংবাদদাতারা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন)