পাকা ধান পানির নিচে, শোকে দুই জেলায় দুই কৃষকের মৃত্যু

নিজস্ব সংবাদদাতা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ

পাকা ধান চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তারা দুজনই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। হঠাৎ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজন ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে গতকাল শনিবার সকালে আহাদ মিয়া (৫৫) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়। তার বাড়ি উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে।

শনিবার সকালে খেতের পাকা ধান কাটতে গিয়েছিলেন আহাদ মিয়া। গিয়ে দেখেন, টানা বৃষ্টিতে তার ছয় বিঘা জমির পুরোটাই পানিতে তলিয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনেরা জানান, পানিতে ডুবে থাকা পাকা ধান দেখে আহাদ মিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি খেতের পাশেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে তারা বলন, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হতে পারে।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আহাদ মিয়া প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এই ধান চাষ করেছিলেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে নাসিরনগরে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, শুধু গোয়ালনগর ইউনিয়নেই কয়েক হাজার বিঘা ধানখেত এখন পানির নিচে। সোনাতলা, ঝামারবালী ও কদমতলীর মতো পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চোখের সামনে এই ক্ষতি দেখে এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান শাকিল বলেন, ‘দুদিন আগেও উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি তলিয়ে ছিল। টানা বৃষ্টির কারণে নতুন করে আরও দুই-তিন হাজার বিঘা জমি প্লাবিত হয়েছে। কৃষকের মৃত্যুর খবর পেয়ে আমাদের এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উনার বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিনা নাসরিন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হবে। তাদের প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।’

কিশোরগঞ্জে কৃষকের মৃত্যু

শনিবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরে আখতার হোসেন (৬০) নামের আরেক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর পশ্চিম পাড়ার মৃত দুধা মিয়ার ছেলে।

স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, আখতার হোসেন প্রায় তিন একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে তার খেতের সব ধান পানিতে তলিয়ে যায়। কিছু ধান কাটতে পারলেও তা বাড়িতে নিতে পারেননি। বিকেলে খেতে গিয়ে ধানের এই অবস্থা দেখে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

আখতার হোসেনের চাচাতো ভাই মনসুর আলী জানান, আখতার প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ফসল নষ্ট হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। বিকেলে খেতের পাশেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সন্ধ্যায় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দেওঘর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য নাসিমা আক্তার এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

কৃষি বিভাগের সূত্রমতে, শনিবার নতুন করে আরও দুই হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এ নিয়ে জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টরে। এতে প্রায় ৩২ হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার হাওর এলাকায়।