জ্বালানি সংকট

‘ফুয়েল পাস’ ও ধৈর্য পরীক্ষার নিদারুণ অভিজ্ঞতা

তানজীল রেজওয়ান

আগে মাত্র ১০ মিনিট সময় ব্যয় আর একটু গল্প করতে করতেই কাজটি হয়ে যেত। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায়ও আমি একই কাজ করতে বের হয়েছিলাম—মোটরসাইকেলে তেল নেওয়া দরকার ছিল।

কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে দীর্ঘ লাইন থাকায় কাজটি করতে আমাকে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ফুয়েল পাসের কিউআর কোড সঙ্গে থাকায় ভেবেছিলাম হয়তো কিছুটা সুবিধা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

সমাধানের গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। সরকার সম্প্রতি মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য তেল নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা।

কাগজে-কলমে বিষয়টি দারুণ শোনালেও বাস্তবতা হলো—এ ব্যবস্থা চালুর একদিনের মধ্যেই সিস্টেমটি বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশ বাইক ব্যবহারকারীই নিবন্ধনের বাইরে থেকে যান।

আমি ভাগ্যবানদের একজন। কোনোমতে প্রথমদিনেই নিবন্ধন করতে পেরেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল যেন লটারি জিতেছি। ফুয়েল পাসে কিছু ‘সুবিধা’র কথা বলা হয়েছিল, যদিও সেটি শুধু রাজধানীর দুটি নির্দিষ্ট ফিলিং স্টেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে পরে বুঝলাম, ওই সুবিধা আদৌ ছিল কি না।

প্রস্তুতি

ঈদুল ফিতরের পরদিন আমি শেষবার তেল নিয়েছিলাম। যা দিয়ে প্রায় ৩৫০–৪০০ কিলোমিটার পথ চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু তেলের পরিমাণ অর্ধেকে নামতেই শুরু হয় দুশ্চিন্তা। অন্যদের মতো আমিও জ্বালানি সরবরাহের জাতীয় তথ্য সরবারহকারী বেসরকারি মাধ্যম—ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে আপডেট খুঁজতে থাকি।

গতকাল সকালে একটি পোস্টে দেখলাম, নির্দিষ্ট একটি ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাসধারীদের জন্য আলাদা ও ছোট লাইন রয়েছে। সেখান থেকে প্রতি বাইকে ১০ লিটার পর্যন্ত তেল দেওয়া হচ্ছে। শুনে মনে হলো, যেন আশার আলো পেলাম।

অফিস শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুনরায় খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়ে সোয়া ৭টার দিকে বের হয়ে পড়লাম।

লাইনে প্রবেশ

এই পাম্পে আমি আগেও গেছি, তাই শর্টকাট ধরে লাইনের শেষ মাথায় যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সাড়ে ৭টা নাগাদ পৌঁছে দেখি—লাইন বিশাল। এত বড় যে, বর্ণনা করা কঠিন।

প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না কোনটা সাধারণ আর কোনটা ফুয়েল পাসের লাইন। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলেও কেউ স্পষ্ট করে উত্তর দিতে পারছিলেন না। শেষে অনেকটা সামনে গিয়ে জানতে পারলাম, এটি সাধারণ লাইন। ফুয়েল পাসের লাইন আরও সামনে।
প্রায় শতাধিক বাইক পেরিয়ে গিয়ে অবশেষে ওই কাঙ্ক্ষিত লাইন খুঁজে পেলাম।

বাস্তবতা

প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নিলাম, কিউআর কোড যাচাই করা হচ্ছে কি না। একজন বললেন, হচ্ছে। কিছুটা স্বস্তি পেলাম।

পাশের সাধারণ লাইনের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কখন এসেছেন? তিনি বললেন, বিকেল ৩টায়। তখন সময় প্রায় রাত ৮টা। পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তার সামনে অপেক্ষমান আরও ২০০ বাইক।

তখনই বুঝলাম—এটা ধৈর্যের পরীক্ষা।

ধীর গতি

প্রতি ৫–১০ মিনিটে আমরা তিন ধাপ করে এগোচ্ছিলাম। এমন গতি আশাব্যঞ্জক নয় মোটেও। হতাশা কাটাতে স্বভাবতই মানুষজন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলাপচারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

একজন রাইড শেয়ারিং চালক জানালেন, প্রতি ৩–৪ দিনে তাকে তেল নিতে হয়, কিন্তু প্রতিবার মাত্র ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হয়।

একজন বয়স্ক ব্যক্তি বললেন, ‘কয়েকদিন ধরে আমরা এমন অবস্থায় আছি। সরকার বলে সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবতা দেখুন—ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি, তেল পাব কি না সেটিও নিশ্চিত না।’

ওই ভদ্রলোকের এমন মন্তব্যের বিপরীতে কেউ তার সঙ্গে তর্কে জড়াননি। নীরবতাই মৌন সম্মতির স্রোত খেলে যায় পুরো লাইন ধরে।

তেলের জন্য লম্বা লাইন। স্টার ফাইল ছবি

এক ‘ফুয়েল পাস বিশেষজ্ঞ’

প্রায় এক ঘণ্টা পর একজনকে পেলাম, যিনি ফুয়েল পাস নিয়ে বেশ উৎসাহী। তিনি বলছিলেন, সার্ভার চালু থাকলে রেজিস্ট্রেশন খুব সহজ। তার যুক্তি ছিল, ‘কোনো খরচ নেই। এক ঘণ্টাও বাঁচলে সেটাই লাভ।’

অনেকেই তার কথা বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনলেন। নিবন্ধনের ইচ্ছা থাকলেও সিস্টেম বন্ধ থাকায় তাদের করার কিছুই ছিল না।

দুশ্চিন্তা ও ছোটখাটো ঘটনা

ফিলিং স্টেশনের কাছে পৌঁছাতেই মাথায় ভর করতে থাকে রাজ্যের উদ্বেগ—তেল শেষ হয়ে যাবে না তো? আজ তেলের গাড়ি কি এসেছিল? এতক্ষণ দাঁড়িয়েও যদি তেল না পাই, ইত্যাদি।

এমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময়ের মাঝেই আসে ক্ষণিকের বিনোদন। দুইজন লাইন ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করলে অন্যদের বাধার মুখে পড়েন। উপায়ান্তর না পেয়ে ব্যর্থতা সঙ্গী করেই ফিরতে হয় তাদের। মন্দ ভাগ্য তাদের—শর্টকার্টের দিন ছিল না এটি।

বাঁক বদল

রাত পৌনে ১০টার দিকে সামনে এলো অমোঘ সত্য। ফুয়েল পাসধারীরাও অন্যদের মতোই মাত্র ৫০০ টাকার তেল পাচ্ছেন। না ১০ লিটার, না অন্যান্য বর্ণিত সুবিধা।

কেননা রাত ৮টার পর কিউআর কোড স্ক্যান করার টিম চলে গেছে। স্ক্যানার না থাকায় যাচাই সম্ভব না, তাই কোনো বাড়তি সুবিধা দেওয়াও অসম্ভব।

অর্থাৎ, হাতে থাকা ‘ফুয়েল পাস’ তখন এই দুঃস্মৃতি ছাড়া আর কিছুই না।

শেষ ধাপ

অবশেষে লাইন জয় করে তেলের ডিসপেনসারের সামনে পৌঁছে স্টেশনের কর্মচারীর সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময়ের চেষ্টা করলাম। তিনি পাত্তা দিলেন না।  

তাকে খুব ক্লান্ত ও বিরক্ত মনে হলো। আমি কথা বললেও ন্যূনতম ভদ্রতাটুকুও দেখালেন না। 
বাধ্য হয়েই বললাম, ‘আমরা টাকার বিনিময়ে তেল নিচ্ছি, তাও এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে—কোনো দয়া চাইতে আসিনি।’

কেউ জবাব দিলেন না। আমাদের সৌভাগ্য, অন্তত তেলটুকু দিয়েছেন।

শেষ হইয়াও হইলো না শেষ

ততক্ষণে ভাবছি—যাক, অবশেষে শেষ হলো। কিন্তু পেমেন্ট করতে গিয়ে বাঁধলো নতুন সমস্যা।

এই স্টেশনটিতে ‘কার্ডে লেনদেন হয়’ সাইনবোর্ড থাকলেও কর্মচারীর মুখ দিয়ে জবাব এলো—‘শুধু নগদ।’

সাইনবোর্ড দেখালাম, উত্তরে শুনলাম—বাইকের জন্য নয়। রসবোধ নয় অবিশ্বাস থেকে হেসে দিলাম।

বাইকটি পার্ক করে অফিসে গিয়ে অভিযোগ দেওয়ার পর শেষে তারা কার্ডেই টাকা নিল, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা দিল না।

শেষ কথা

ফুয়েল পাসের ধারণাটি ভালো, বেশ সময়োপযোগী। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে এটি এখনো অসম্পূর্ণ।

তবুও এ অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে, একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে, এমনকি খুঁজে নেয় হাসির খোরাক।

আর গাড়ির লাইনের অভিজ্ঞতা? ধৈর্য ধরুন, শিগগিরই গাড়ির লাইনে দাঁড়াতে যাচ্ছি।