দেশে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে প্রাণীদের ‘ভ্যাকসিনেশন কার্ড’
প্রাণিস্বাস্থ্যের সুরক্ষা, খামারিদের জীবিকার নিরাপত্তা ও পশু-পাখি থেকে মানুষের রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে দেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীদের জন্য ‘ভ্যাকসিনেশন কার্ড’ বা টিকাদান কার্ড চালু করতে যাচ্ছে আইসিডিডিআরবি ও সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস)।
এর অংশ হিসেবে আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘অ্যানিমেল ভ্যাকসিনেশন কার্ড’ বা প্রাণীদের টিকাদান কার্ড তৈরির বিষয়ে একটি পর্যালোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আইসিডিডিআরবি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিডিডিআরবি জানায়, এ কর্মসূচির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি এবং পোষা প্রাণীর কার্যকর টিকাদান ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ তৈরির চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
সরকারি বিশেষজ্ঞ, ইপিআই প্রতিনিধি, ওষুধ শিল্প ও প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।
শিশুদের জন্য ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’ থাকলেও, প্রাণীদের ক্ষেত্রে এমন কোনো সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা এতদিন ছিল না বাংলাদেশে।
সংস্থাটি আরও জানায়, বাংলাদেশ সংক্রামক ব্যাধির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যার প্রায় ৭০ শতাংশই প্রাণীবাহিত রোগ। অধিক জনসংখ্যা, মানুষ-প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সহাবস্থানের কারণে এখানে অ্যানথ্রাক্স (তড়কা), জলাতঙ্ক ও অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক বেশি। একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ বা রেকর্ড-কিপিং সিস্টেম না থাকায় রোগ মোকাবিলা বা নজরদারি করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে।
এ সমস্যা সমাধানেই গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও পোষা প্রাণীর জন্য আলাদা টিকাদান কার্ড বা কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রাণীর পরিচয়, টিকাদানের ইতিহাস ও পরবর্তী টিকার সময়সূচি লেখা হবে হবে, যা সেবার সঠিক ট্র্যাকিং এবং সমন্বয়ে সহায়তা করবে।
এর ফলে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে, চিকিৎসার খরচ কমবে ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলে মনে করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) বয়জার রহমান বলেন, 'প্রাণীদের ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় টিকাদান সক্ষমতা মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী না করলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।'
বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাতের জিডিপিতে প্রায় ১ দশমিক ৮১ শতাংশ অবদান এবং প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এই খাতের সঙ্গে জড়িত। তবে গ্রামীণ খামারিদের মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের হার মাত্র ২০ শতাংশের মতো।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, 'সম্প্রতি বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের শিখিয়েছে যে টিকাদানের ঘাটতি কীভাবে মানুষ ও প্রাণী উভয়ের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। প্রাণীদের টিকা দেওয়া মানে শুধু তাদের রক্ষা করা নয়, বরং পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকেও রক্ষা করা।'
আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, 'নতুন এ উদ্যোগের মাধ্যমে খামারিরা সহজে টিকার হিসাব রাখতে পারবেন, যা তাদের প্রাণীর রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হবে। এটি শেষ পর্যন্ত খামারি এবং ভোক্তা—উভয়কেই লাভবান করবে।'
আইসিডিডিআরবির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্ডটি ইপিআই কার্ডের মতো হবে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এ সংক্রান্ত একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থাকবে।'