স্বাধীনচেতা কবি জামসেদ ওয়াজেদ
উত্তারাধুনিক কবিরা কবিতা নির্মাণে বেশ স্বাধীন। নিয়মের বেড়াজালে বন্দী থাকতে মোটেই পছন্দ করেন না। তাই উত্তারাধুনিক কবিতা সম্ভারে সনেট তুলনামূলক বেশ কম। শুধু বর্তমানে নয়, অতীতেও কম ছিল।
তবে সনেট চর্চা থেমে নেই। উত্তারাধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে কবি জামসেদ ওয়াজেদ নিরলসভাবে সনেট চর্চায় ব্রতী। তার প্রমাণ 'নির্বাচিত সনেট'।
'নির্বাচিত সনেট' বইটিতে মুদ্রিত কবিতার স্বাদ আস্বাদনের চেষ্টা চালাব। ভিন্নভাবে বলতে গেলে—আমার পাঠ অনুভূতি ভাগাভাগি করব।
প্রথমে, কবিতার শরীর ও গঠনশৈলী নিয়ে আলোচনা করা আবশ্যক। কবি ইতালীয় পেত্রার্কীয় রীতি অনুসরণ না করে শেক্সপিয়ারীয় রীতিতে নির্মাণ করেছেন কবিতা-শরীর।
ইংরেজি সনেটে সাধারণত আইম্বিক পেন্টামিটার ব্যবহৃত হয়, যেখানে প্রতি লাইনে ১০টি সিলেবল থাকে, কিন্তু বাংলাতে অক্ষরবৃত্তে ১৪ মাত্রা বা ১৪ অক্ষর। উচ্চারণে অক্ষরগুলো মুড়ির মতো ঝুরঝুরা হয়। যেমনটি কবির 'আঁচলে সমুদ্র রেখে' কবিতায় দেখা যাচ্ছে—
'এখানে বনেরা যেন বেঁচে আছে সবুজ বিলাতে
অথচ বনের প্রতি যেন আজ কমে গেছে মায়া
বনহীন জনপদে কী করে যে খুঁজি আলো ছায়া
কত যুগ কেটে যায় এই ভাবে হিসাব মিলাতে'
বেশ সহজ ও সাবলীল শেক্সপিয়ারীয়ান। ইতালির বাইরে সনেটের এই রীতিই বেশ জনপ্রিয় এবং কবিদের চর্চায় ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ পেত্রার্কীয় রীতিতে সনেট লিখলেও অন্ত্যমিলে নতুনত্ব এনেছে। যার গাণিতিক বিন্যাস: কখখক : কগগক :: ঘঙঙঘ : চচ।
কবি তার কবিতায় নতুনত্বের স্বাদ দেওয়ার চেষ্টাকে অদমিত রেখেছেন। কবিতার অগ্রযাত্রা এমন হওয়াটাই কাম্য।
কবিতায় মাত্রার গাণিতিকতার মুক্তি দেওয়া সম্ভব হলেও কখনো ছন্দের মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর উক্তি উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেছেন, 'ছন্দ কিন্তু সবসময় চাই। আগেও চাই পরেও চাই। ছন্দ আছে সর্বত্র। কুঁড়ে ঘরেও আছে, আবার আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকাতেও আছে।'
বলা প্রাসঙ্গিক, মাত্রা বা অক্ষরের গাণিতিক চাল বা বিন্যাস ঠিক রাখলেও সু-ছন্দ বা ছন্দ-সাবলীল কবিতা নাও হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, ছন্দের আসল কাজ হলো বাক্যের সাবলীলয়তা এবং উচ্চারণের গতীয় দ্যোতনা ও শ্রুতিময়তা বজায় রাখা।
পড়তে গিয়ে যদি পাঠকের কণ্ঠের অবনমন ঠিক না থাকে বা উচ্চারণে ছেদ ঘটে, তবে সেখানে যতোই গাণিতিকতা ঠিক থাকুক না কেন, গণিতের সুষ্ঠু প্রয়োগ হয়নি। এরকম হলে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
তাই প্রসঙ্গক্রমে এখন সনেট কবিতার আরোপিত বিষয়গুলো নিয়ে কবি জামসেদ ওয়াজেদের কবিতার বিচিত্র স্বাদ ও ছন্দ বিন্যাস চিত্রায়িত করব।
যেহেতু এখানে সনেটের কাব্য নিয়ে আলোচনা করব তাই বলা আবশ্যক যে, ১৪ পঙক্তিযুক্ত এবং সনেটীয় অন্ত্যমিল সম্পন্ন কবিতা মাত্রই সনেট নয়। যেমন: রবীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টি 'চৈতালি', 'স্মরণ' ও 'নৈবেদ্য' কাব্যের চতুর্দশ-পঙক্তি কবিতাগুলোসহ কাহ্নপাদ হতে ঈশ্বরগুপ্ত পর্যন্ত বহু কবি বাংলা ভাষায় চতুর্দশ-পঙক্তি কবিতা রচনা করেছেন, যেগুলোতে সনেটের গুরুগম্ভীর ভাব ও সংহত গঠনশৈলি দৃষ্ট হয় না।
একটি কবিতাকে আদর্শ সনেট বলা যাবে তখনই, যখন এর ভাব-প্রবাহ সনেটীয় রীতিতে প্রবহমান থাকবে এবং অন্ত্যমিলও সনেটীয় রীতিতে বিরচিত হবে।
শুরুতেই বলেছি, 'নির্বাচিত সনেট' বইয়ের সবগুলো কবিতা শেক্সপিয়ারীয়ান রীতির, অর্থাৎ ৪ লাইনের ৩টি স্তবক এবং শেষে ২ লাইনের একটি কাপলেট এবং অন্ত্যমিল: কখকখ : গঘগঘ :: ঙচঙচ : ছছ।
মাত্রা বা অক্ষরের স্বাতন্ত্রতা অমিত্রাক্ষর কবিতার অনন্য বৈশিষ্ট্য। অক্ষরের স্বাতন্ত্রতা বজায় রাখতে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনেক শব্দ তৈরি করেছেন। দুটি শব্দকে একটি শব্দে পরিণত করেছেন। বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সনেট 'কবি-মাতৃভাষা' দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
অমিত্রাক্ষর মানে মুক্তস্বর। যেমন: কবি জামসেদ ওয়াজেদের কবিতায় পাই—
'বিপুল রহস্য মনে পুষে রাখি পরিমিতি বোধ'। - একাকী অরণ্যহীন
তবে, 'আমার কবিতা' কবিতায় 'সাইবেরিয়ার সেই পেঙ্গুইন হাটি হাটি পা-পা' এ পঙক্তিটি যদি কপোতাক্ষ নদ কবিতার 'সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে' এই পঙক্তির পাশাপাশি বসাই, তাহলে স্পষ্ট হয় যে 'সাইবেরিয়া' শব্দটি অমিত্রাক্ষর ছন্দের অক্ষরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মুক্ত অক্ষরের জন্য শব্দের শরীরে অনেক পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন হয়। যদি এমনটা না করা হয় তাহলে কী হয়? কী হয় সেটা কবিতা পড়ার সময়ই টের পাওয়া যায়।
কবিতার প্রয়োজনে শব্দে যোজন-বিয়োজন কাম্য। এতে শুধু নতুন শব্দের জন্ম হয় না ভাবেও নতুনত্ব আসে। কবি 'নির্বাচিত সনেট' বইয়ে অনেক শব্দ—যেমন: নাকফুল, হয়তোবা, মাহমুদ, নায়কগণ, কাচগৃহে-সহ—বেশকিছু শব্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দে মাত্রাসিদ্ধ করতে চেয়েছেন।
অমিত্রাক্ষর ছন্দে এই শব্দগুলোর মাত্রাভিত্তিক ভবিষ্যৎ কবির কবিতার পঙক্তিতেই বলে দেওয়া সম্ভব—'এখন আমরা হাটি মোহময় অনিশ্চিত এই অন্ধকারে' (অনিশ্চিত এই অন্ধকারে)। সত্যবিচারে দুটো দিক ফুটে ওঠে—এক. ন্যায়পরায়ণতা, দুই. নির্মমতা।
একজন কবির কবিতা পড়তে গিয়ে যদি আরেক কবির কবিতা অনায়াসে মনে চলে আসে, তবে সেই কবির কবিতাকে যুগসচেতন কবিতা বলা যায়। কবিকে অবশ্যই যুগ সচেতন হতে হয়।
'অদ্ভুত সকাল আজ পুলকিত আমার হৃদয়'—কবির 'নির্বাচিত সনেট' বইয়ের কবিতা পড়ে আমার হৃদয়ও এখন কবির উক্ত পঙক্তির মতো। কবিতা পিপাসু এই আমি কবিতার শরীরে ডুব দেই আর রূপ খুঁজি।
কবির এই কাব্যের কবিতায়ও পেয়েছি বেশ রূপ ও রস। যেমন:
তোমাকে দেখেনি যারা পায়নি তো রূপের খবর
এ রাত্রি আঁধার বটে তথাপিও পথিক প্রবর।
সত্যি চমৎকার। পড়তে পড়তে মুগ্ধ হই।
কবিতার বিতানে 'নির্বাচিত সনেট' বইটি কেন ভিন্নতর, তার আরও কিছু নির্দেশন উপস্থাপন না করলে আলোচনার কলেবর অপূর্ণ থেকে যাবে।
কবিতাগুলোর ভিন্নতা আসলে মূলভাব ও উপমায়। যেমন: 'মানুষ আকাশ হলে পাখিগুলো হয়ে যাবে ফুল' অথবা 'বাতাসে ই'মেল ওড়ে আরো ওড়ে ষোড়শীর চুল'। কবি জীবনবোধ তুলে ধরেছেন ভিন্ন ভঙ্গিমায়। বদলে দিয়েছেন আকাঙ্ক্ষার প্রার্থনা। কবির ভাষায়—
একটি হাসির জন্য নিত্য ফোটে পৃথিবীর ফুল
তোমাকে চাই না আমি হাসিটির খুব প্রয়োজন।
একজন উত্তারাধুনিক সনেটকারকের কাছে সনেট প্রিয়দের নতুনত্বের প্রত্যাশা স্বাভাবিক। সনেটের প্রাণ ভোল্টায় দুরন্ত স্পিন অবশ্যই প্রত্যাশার।
যদিও ভাব ও ভাষার বৈচিত্র্যতায় বইয়ের কবিতগুলো ভিন্নতায় রূপ নিয়েছে—যা পাঠক হৃদয়ে শুধু আলোড়ন সৃষ্টি করবে না, বোধকে নাড়িয়ে দিতেও সক্ষম।