মোহন রায়হানের পুরস্কার স্থগিতের সিদ্ধান্ত ‘অন্যায়, অপমান ও অপ্রত্যাশিত’

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের ঘোষিত তালিকায় কবিতা বিভাগে নাম ছিল মোহন রায়হানের। কিন্তু কোনো ঘোষণা ছাড়াই পুরস্কার প্রদানের দিন তার নাম স্থগিত করা হয়। এরপর বাংলা একাডেমীর এমন অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

সমালোচনাকারী কেউ বলছেন, ‘মনোনয়ন দিয়ে পুরস্কার স্থগিত করা অন্যায়, অপমানজনক ও অপ্রত্যাশিত।’

কারো কারো মনে, এটা লেখক সমাজের জন্য লজ্জার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবি মোহন রায়হান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অনুষ্ঠানে আসার পর জানতে পারলাম, আমাকে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে না। আমি এখনো জানি না এটা দাপ্তরিকভাবে বাতিল করা হয়েছে কি না। যদি বাতিল করা হতো, তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন থাকা উচিত ছিল।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমার পুরস্কার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত “সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়” থেকে এসেছে।’

তার দাবি, কর্নেল তাহেরকে নিয়ে চার দশক আগে লেখা ‘তাহেরের স্বপ্ন’ কবিতার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মোহন রায়হানের ভাষ্য, ‘আমি শুনেছি ৪০ বছর আগে লেখা ওই কবিতার কারণেই আমাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।’

যোগাযোগ করা হলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘কবি মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ওঠায় পুরস্কারটি “সাময়িকভাবে স্থগিত” রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘পরপর দু’বছর পুরস্কার ঘোষণা করার পর প্রত্যাহার বা স্থগিত করে লেখক-কবিদের যেভাবে অপমান করা হলো, তার তীব্র নিন্দা জানাই। এই ধারার সূচনা হয়েছিল আওয়ামী লীগ আমলে অধ্যাপক নিয়াজ জামানকে পুরস্কার প্রদানকে কেন্দ্র করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গতবছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছে। এবারও ঘটল। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দু’জন মন্ত্রী একই ধরনের মন্তব্য করলেও এ কথা বলেননি যে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কোনো সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত কি না! মন্ত্রণালয় তো হস্তক্ষেপ করেছেই, বাংলা একাডেমিও হস্তক্ষেপ করতে দিয়েছে। একাডেমির মহাপরিচালক এবং নির্বাহী পরিষদ একাডেমির স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর দায় তারাও এড়াতে পারেন না।’

গীতিকার ও সমাজ বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়েজী বলেন, ‘একজন কবিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় সাহিত্যিক অনন্যতা, ভাষার সৃজনশীলতা ও মানবিক চেতনার প্রতি প্রভাবের জন্য—তার রাজনৈতিক পরিচয় বা আনুগত্যের জন্য নয়। সাহিত্যিক সম্মান কোনো মতাদর্শগত আনুগত্যের পুরস্কার হতে পারে না। রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের মর্যাদা হরণ করতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোহন রায়হান একজন সংগ্রামী কবি। ভাষার ভেতর তিনি মানুষের স্বপ্ন, প্রতিবাদ ও বিবেককে উচ্চারণ করেছেন। তাকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে মনোনীত করার মাধ্যমে যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, তা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের মূল্যায়ন ছিল না; তা ছিল একটি সাহিত্যিক ধারার প্রতি সম্মান। কিন্তু শেষে যে আচরণ করা হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। সাহিত্য পুরস্কার সরকারের কোনো অনুগ্রহ নয়।’

জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘কবি মোহন রায়হান এতদিন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি, এটাও লজ্জাজনক। এরপর মনোনয়ন দিয়ে পুরস্কার স্থগিত করা অন্যায়, অপমান ও অপ্রত্যাশিত। এটা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের জন্য অসম্মানজনক। কেন স্থগিত বা বাতিল তারও ব্যাখ্যা আমরা জানলাম না, এটা হতে পারে না। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ও তার সাহিত্য পুরস্কারে বাঁধা হতে পারে না। তারা কি ভুলে গেছে, সাহিত্য ও ব্যক্তির মতাদর্শ আলাদা?’

তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, শিল্প-সংস্কৃতির রাজনীতিকীকরণ কখনোই সভ্য দেশের পরিচয় নয়। তাহলে তার কথা ও বাস্তবের ঘটনা বিপরীতমেরুতে অবস্থান করছে। গণতান্ত্রিক সরকারের এই বিষয়গুলোর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।’