মাউন্ট মানাসলু অভিযান

বাবর আলী
বাবর আলী
30 October 2025, 13:35 PM
UPDATED 30 October 2025, 20:44 PM

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ পর্বত মানাসলু (৮ হাজার ১৬৩ মিটার) শিখরে আরোহণ করেছেন পর্বতারোহী বাবর আলী। গত ২৬ সেপ্টেম্বর নেপালের স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এই পর্বত-শিখর স্পর্শ করেন তিনি।

'মাউন্টেন অব দ্য স্পিরিট'-খ্যাত এই পর্বতের অবস্থান নেপালের মানসিরি হিমাল রেঞ্জে। দ্য ডেইলি স্টারের পাঠকদের জন্য মাউন্ট মানাসলু আরোহণের রোমাঞ্চকর গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন এভারেস্টজয়ী এই পর্বতারোহী। 

বাবর আলীর লেখায় 'মানাসলু অভিযানের দিনলিপি'র আজ বৃহস্পতিবার পড়ুন ষষ্ঠ পর্ব।

56.jpg
বেসক্যাম্প। ছবি: বাবর আলী

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

'তোমার ড্রিম মাউন্টেন কোনটা?' সকালে উঠেই গেসমেনকে পাকড়াও করলাম।
- নাঙ্গা পর্বত। 
শুনেই মুষ্টিবদ্ধ হাত বাড়ালাম ওর দিকে। এই জায়গায় আমাদের দুজনের দারুণ মিল। সকাল থেকেই ফুর্বা দাই ব্যস্ত বেস ক্যাম্পের জন্য মালবাহক ঠিক করতে। স্নোয়ি হরাইজন্সের বেস ক্যাম্পের জন্য বেশকিছু মাল ওপরে পাঠাতে হবে। তবে এখানে চাইলেই নিজের চেনা কিংবা পছন্দের কাউকে মালবাহক হিসেবে ঠিক করা যায় না। গ্রামবাসীর একটা সমিতি আছে। যার কিংবা যাদের সিরিয়াল আসবে, তারাই বেস ক্যাম্পে যাবে মালবাহক হিসেবে। এই গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই মাল বহনের কাজ করে। 

64.jpg
সন্ধ্যার ম্লান আলোতে পর্বত। ছবি: বাবর আলী

৮টা কুড়ি নাগাদ পথে নামলাম। ক্রিস আজকের দিনটা সামাগাঁওতে থাকবে। ফুর্বা দাই আগেরদিন জানতে চাইছিল আমরা এখানে একদিন বিশ্রাম করতে চাই কিনা। ইতোমধ্যে যেহেতু ৫ হাজার ১০০ মিটার অতিক্রম করে ফেলেছি, তাই বেস ক্যাম্পে যাবার সিদ্ধান্তই নিলাম। বিশ্রামের দিন ওপরে হওয়াই শ্রেয়। প্রথমদিকের রাস্তা চেনা। কুড়ি মিনিট টানা চলে বেসক্যাম্পের রাস্তা বাঁদিকে এগিয়ে গেছে। পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠা। পাথরের টুকরা একেরপর এক সাজিয়ে বানানো হয়েছে ধাপ। কিছুদূর উঠতেই উল্টোদিকের একটা পাহাড় নজর কাটল। এই পাহাড়ের নাম বাহরাইন পিক। বাহরাইনের রাজদুলাল মানাসলু আরোহণের পর তার দেশের নামে এই পাহাড়ের নামকরণ করে গ্রামবাসী।

66.jpg
বীরেন্দ্র লেক। ছবি: বাবর আলী

পথের দুপাশে জুনিপারের ঝোপ। আর কিছুদূর উঠতেই বীরেন্দ্র লেক আবছা দেখা দিতে শুরু করেছে আমাদের অবস্থান থেকে বেশ নিচে। 'এমারেল্ড গ্রিন' রঙের অতীব সুন্দর উদাহরণ এই হ্রদের জল। পথের ধারে নানান সাইজের পাথর বসিয়ে ছোটো ছোটো বিশ্রামের জায়গা বানানো আছে। লোকে এসব জায়গাতেই থামে।

আর কিছুক্ষণ পা চালাতেই সিঁড়ি উধাও। মাটি আর পাথর মেশানো পথ আর দুপাশে ছোপ ছোপ সবুজ। অনিন্দ্যসুন্দর এই পথ ঠিক যেন ইয়েটসের কবিতা; বাস্তব নাকি জাদু- ঠিক ঠাহর করা যায় না। এই শ্যামলিমার দেখা ফের যে কবে পাব, সেটা অদৃষ্টের হাতে; তাই দুচোখ ভরে দেখে নেওয়ার চেষ্টা। আর কিছুক্ষণ এই পথ ধরে চড়াই ভাঙতেই ছোট্ট একটা অস্থায়ী চায়ের দোকান। সামাগাঁওয়ের এক লোক এর মালিক। এখান থেকে বীরেন্দ্র লেকের পুরো কলেবর দৃষ্টিসীমায় আসে। নেপালের সাবেক রাজা বীরেন্দ্রর নামে নামকরণ করা হয়েছে এই লেকের। অনেক বছর আগে হেলিকপ্টারে চেপে নেপালের তৎকালীন নৃপতি এসেছিলেন এখানে। 

65.jpg
অপার্থিব সন্ধ্যা। ছবি: বাবর আলী

বীরেন্দ্র লেক থেকে একটা ঝিরি নিচের দিকে নেমে গেছে। আরও ওপরে উঠতেই পুরো মাউন্টেন সিস্টেমটাই চোখে পড়ল। অনেক ওপর থেকে গ্লেসিয়ার গলা পানি নেমে আসছে। সেই পানি গিয়ে জমা হচ্ছে বীরেন্দ্র লেকে। আবার হ্রদ থেকে একটা ঝিরি নেমে গেছে নিচের জনপদে। প্রথম টি শপে না থামলেও পরের ছোট্ট টি শপে থামলাম। ততক্ষণে সকাল থেকে ৬০০ মিটার উচ্চতা আরোহণ করে ফেলেছি। তানভীর ভাই আর ফুর্বা বেশ খানিকটা পেছনে পড়েছে। কানাডিয়ান তরুণী কেলির সঙ্গে এখানেই পরিচয়। কেলি এসেছে এলিট এক্সপেডের সঙ্গে। মানাসলু অভিযানের আগে মেরা পিক আরোহণ করে এসেছে। অভিজ্ঞতা কেমন ছিল জিজ্ঞেস করায় উত্তর এলো, 'মেরা পিক বেশ সহজই। কিন্তু চ্যালেঞ্জ অন্য জায়গায়। বেস ক্যাম্প অবধি যাত্রাপথে লজ পেতেই বেশি মুশকিল হয়েছে। অফ সিজন বলে অধিকাংশ লজের দোরগোড়ায় তালা ঝুলছে। তার ওপর ছিল জোঁকের অত্যাচার।'

63.jpg
মানাসলু ইস্টের শিখর। ছবি: বাবর আলী

কেলি গতকালই সামাগাঁও উড়ে এসেছে কাঠমান্ডু থেকে। চলমান আন্দোলন একদম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর। আন্দোলনকারীদের দেওয়া আগুনে ভস্ম হয়ে যাওয়া পাঁচ তারকা হোটেল হিলটন থেকে ওর হোটেলের অবস্থান শ-খানেক মিটার দূরে ছিল। ওই আগুন দেখে ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠেছে ও। আরেকটু হলেই মুণ্ডুটা কাঠমান্ডুতে রেখে আসতে হতো। অভয় দেওয়ার জন্যই বললাম, 'মাউন্টেনস আর অলওয়েজ ওয়ে টু সেফার প্লেস দ্যান দ্য বিগ সিটিজ'। পাহাড়ে অপরের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করাটাকেও খুব একটা অসমীচীন মনে করা হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে আসলে লোকে মনের সব চাপা কথাও স্বল্প পরিচয়ে উগরে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। এমন পথের বন্ধুরাই তো এসব অভিযানের বড় পুরষ্কার। 

60.jpg
গন্তব্য বেসক্যাম্প। ছবি: বাবর আলী

তানভীর ভাই আর ফুর্বা দাই আসার পর রারা নুডলস আর কফি গলাধঃকরণ করা হলো। এদিকে প্রায় পুরো পথেই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। আমি অবশ্য পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আর ফরহান ভাইকে নিজের অবস্থান জানিয়ে ফোনের ফ্লাইট মোড চালু করে দিয়েছি। ফুর্বা দাই নাকি পুরো পথ কানের কাছে ফোন নিয়ে নানান নিউজ শুনতে শুনতে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী হবার দৌড়ে কে এগিয়ে আছে জিজ্ঞেস করায় ফুর্বা দাই সুশীলা কার্কি নামের এক ভদ্রমহিলার কথা জানাল। অবশ্য বয়স বেশি হওয়ায় ফুর্বা দাইয়ের ওনাকে পছন্দ না। 

62.jpg
ক্যাম্প এরিয়া। ছবি: বাবর আলী

ভোজনান্তে তানভীর ভাইকে আগেই রওনা করিয়ে দিলাম। ফুর্বা দাই আর আমি গাত্রোত্থান করলাম আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে। মূলত ফুর্বা দাইয়ের ফোন চার্জের জন্যই থামা ওখানে। এবার পথে নামতেই মেঘে সব ঢেকে গেলো। খানিক পরে শুরু হলো বৃষ্টি। পঞ্চো চাপিয়ে চড়াই ভাঙা শুরু। ছোটো ছোটো পানির ধারা পেরোতে হচ্ছে জায়গায় জায়গায়। এক জায়গায় ব্লু শিপের বড়সড় একটা দল দেখলাম। আপনমনে ঘাসের ফাঁকে কী যেন খুঁটে খাচ্ছে। কাছাকাছি যেতেই পগারপার।

59.jpg
নুডলস খেতে খেতে দেখা বীরেন্দ্র লেক। ছবি: বাবর আলী

পাথর আর মাটি মেশানো গিরিশিরা ধরে উঠতে শুরু করলাম। দুপাশে হিমবাহ গলা জলের ধারার গর্জনে কানে তালা লাগার জোগাড়। পথ একদম খাড়া উঠে গেছে বেস ক্যাম্পে। সামাগাঁও থেকে বেস ক্যাম্প অবধি পথটুকুকে শ্রদ্ধা না করে উপায় নেই। আবহাওয়া বিগড়ে যাওয়ায় হয়েছে আরও মুশকিল। পথচলার আনন্দ ছাপিয়ে পথক্লেশ তার কামড় বসাতে শুরু করল। শরীরের জোর ছাড়াও আজ পথ চলতে নির্ভর করতে হচ্ছে খানিকটা মনের জোরের ওপরও। ধীর পায়ে চলতে চলতে একসময় কিছুটা দূরে আবছা মতো তানভীর ভাইকে দেখা গেল। আজকে ওনার হাঁটার গতি বেশ ভালো। পথের অন্ত নেই। সাপের মতো বামে-ডানে মোচড় মেরে ওপরের দিকে উঠে গেছে। পাশেই অতলান্ত খাদ। পা হড়কালে আঁকড়ে ধরার মতোও কিছু নেই; নিজের প্রাণটি বাদে। সন্তর্পণে একটু পা চালিয়ে গিয়ে তানভীর ভাইয়ের ব্যাকপ্যাক চাপড়ে দিলাম। ইচ্ছে ছিল পিঠ চাপড়ে দেবার। কিন্তু ব্যাক বা পিঠ যে ঢাকা পড়ে গেছে ব্যাকপ্যাকে। এখান থেকেই বামদিকে সাদা একটা তাঁবু নজরে এলো। বেস ক্যাম্প তাহলে আর বেশি দূরে নয়।

61.jpg
সন্ধ্যা নামছে বেসক্যাম্পে। ছবি: বাবর আলী

১টার দিকে বেস ক্যাম্পে। সামাগাঁও থেকে পাক্কা ১ হাজার ৩০০ মিটার উঠে এসেছি গত কয়েক ঘণ্টায়। ফোরটিন পিকসের বেস ক্যাম্প এরিয়া ছাড়িয়ে কিছুদূর এগোতেই আমাদের গন্তব্য স্নোয়ি হরাইজন্সের বেস ক্যাম্প এরিয়া। ঢোকার মুখেই মিংমা দাইকে দেখা গেলো। হেড কুক পেম্বা দাইয়ের শালা আর গেসমেনের বড়ো ভাই মিংমার সঙ্গে পরিচয় আমা দাবলাম অভিযানের সময়। পরে এভারেস্ট-লোৎসে অভিযানে পেম্বা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় নিচের গ্রাম থেকে চলে এসেছিল। একটু বাদেই ধর্মা উঁকি দিলো। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের সেই ধর্মা। কত-শত স্মৃতি ওর সঙ্গে। এতদিনের কিচেন স্টাফ ধর্মা এবার রীতিমতো ক্লাইম্বার। ওর মামা গেসমেনের সঙ্গে মানাসলু আরোহণ করবে। ইতোমধ্যে দুবার মানাসলুর ক্যাম্প-১ ঘুরে এসেছে। গত বছর এনএমএ (নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন) এর কোর্সও করে নিয়েছে। ফুর্বা দাই এলো আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে। আসার সময় ওর আপন মামাকে পেয়ে গেছে। মামারবাড়ির গল্প করতে করতেই ওর এত দেরি।

58.jpg
চলতি পথে। ছবি: বাবর আলী

স্নোয়ি হরাইজন্সের সহ-অভিযাত্রীদের বেশিরভাগই গেছে ক্যাম্প-১ ছুঁতে। এক নম্বর ক্যাম্প ছুঁয়ে ফের চলে আসবে বেস ক্যাম্পে। ব্যাপারটাকে ইংরেজিতে বলা হয় অ্যাক্লেমাটাইজেশন। বাংলায় বলা যায় অতি উচ্চতা আর নিম্ন তাপমাত্রার সঙ্গে শরীরকে খাপ খাওয়ানো। চেক প্রজাতন্ত্রের মেয়ে বেথা অবশ্য আগেই ক্যাম্প-২ ছুঁয়েছে। সে বেস ক্যাম্পে এসেছে বাকি সবার আগে। ইতোমধ্যে ১০ দিন পেরিয়ে গেছে তার বেস ক্যাম্প বাসের। ডাইনিংয়ে পরিচয় হলো ওর সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চ এলো। তাঁবুতে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে থেকে সেই চিরায়ত 'ডক্টরজি' সম্বোধন। তাঁবুর চেইনের ওপারে বীরে তামাং দাঁড়িয়ে। আমার ক্লাইম্বিং গাইড আর দীর্ঘদিনের পর্বতসঙ্গী। দীর্ঘ আলিঙ্গনে বেঁধে একদফা কুশল বিনিময় হলো। ওর সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু শরীরের মধ্যপ্রদেশ আগের চেয়ে খানিকটা স্ফীত হয়েছে। আমি নেপাল পৌঁছানোর আগেই ও বেস ক্যাম্প অভিমুখে হাঁটতে শুরু করেছিল। বীরেকে বললাম, 'তোমার এই ঊর্ধ্বগামী ভুঁড়িকে অচিরেই অধোগামী করা প্রয়োজন।' বিকেল নাগাদ বেস ক্যাম্পের আশেপাশে হাঁটতে গিয়ে পেম্বা ছিরিংয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ওর পুরানো এজেন্সি সেভেন সামিট ট্রেকসের হয়েই এখনো কাজ করছে।

57.jpg
বেসক্যাম্পের পথে পাথুরে সিঁড়ি। ছবি: বাবর আলী

সন্ধ্যায় ডাইনিং টেন্টে বাকি সবাইকে পাওয়া গেল। ক্যাম্প-১ ছুঁয়ে তিন ইতালিয়ান প্রৌঢ় ফেরত এসেছে। ওদের তিনজনের ইংরেজি জ্ঞান আর আমার ইতালিয়ান জ্ঞান প্রায় সমান। ওদের কাছে ইংরেজি আমাদের মতো অর্থ উপার্জনের ভাষা নয় বলে সেটা শেখার তাগিদও অনুভব করে না খুব একটা। তিনজনের মধ্যে একজনের গোড়ালি মচকে গেছে। মোজা পরা পায়ের গোড়ালি একটু পর পর ঘষছেন উনি। চেহারা দেখতে সাবেক জার্মান টেনিস তারকা বরিস বেকারের মতো। অপরজন একেবারে বাকশক্তিহীন। ওর মানসিক শক্তি দেখে আমার বিস্ময়ে বাকরহিত হওয়ার দশা। ইশারায় কথাবার্তা সারে ও। ওর নাম-সাকিন কিছুই জানা হলো না। কথাবার্তা যা বলছি, তা বেথার সঙ্গেই। তবে চেক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে ফ্রানৎস কাফকাকে না চেনাটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধই মনে হলো আমার কাছে। যাহোক, সহযাত্রীদের সাহচর্য সবসময়ই দারুণ। কম্বল সম্বল করে ঘুমানোর দিন ফুরিয়েছে। ঘুমথলি বা স্লিপিং ব্যাগের উষ্ণতার সান্নিধ্যসুখ পেতে হবে আজ রাত থেকে।