বাংলাদেশি পরীক্ষার্থীরা আইইএলটিএসে যে ভুলগুলো করেন
বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা অভিবাসনের পরিকল্পনায় অনেক বাংলাদেশিকেই আইইএলটিএস দিতে হয়। প্রস্তুতির জন্য কেউ কোচিং করেন, কেউ অনলাইন ভিডিও দেখেন, আবার কেউ বই আর মক টেস্টের ওপর নির্ভর করেন। কয়েক মাস প্রস্তুতি নেওয়ার পরও পরীক্ষার ফল হাতে পেয়ে অনেকের মনে হয়, প্রত্যাশিত স্কোরটি কেন এলো না?
ইংরেজিতে দুর্বলতাই সবসময় এর একমাত্র কারণ নয়। পরীক্ষার ধরন ঠিকমতো না বোঝা, অনুশীলনে কিছু ভুল অভ্যাস কিংবা নির্দিষ্ট একটি অংশকে কম গুরুত্ব দেওয়ার কারণেও স্কোরে প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে এমন কিছু ভুল বেশ পরিচিত।
শুধু গ্রামার আর শব্দভাণ্ডারে আটকে থাকা
আইইএলটিএসের প্রস্তুতি শুরু করেই অনেকে গ্রামারের নিয়ম ঝালিয়ে নেওয়া এবং কঠিন ইংরেজি শব্দ মুখস্থ করার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। ইংরেজির ভিত্তি ভালো করতে এগুলো প্রয়োজন হলেও শুধু এগুলো দিয়েই পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয় না।
আইইএলটিএসে লিসেনিং, রিডিং, রাইটিং ও স্পিকিং—চারটি দক্ষতাই যাচাই করা হয়। ফলে অনেক শব্দ জানা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিডিং শেষ করতে না পারলে কিংবা স্পিকিংয়ে স্বাভাবিকভাবে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে না পারলে সমস্যা থেকেই যায়।
বিশেষ করে রাইটিং ও স্পিকিংয়ে অপ্রয়োজনে কঠিন শব্দ ব্যবহারের চেষ্টা উল্টো বিপদে ফেলতে পারে। যে শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিত নন, সেটি জোর করে বসানোর চেয়ে পরিচিত শব্দ দিয়ে বক্তব্য পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা বেশি কার্যকর।
পরীক্ষার ধরন না বুঝেই অনুশীলন
আইইএলটিএস শুধু ইংরেজি জানার পরীক্ষা নয়, পরীক্ষার কাঠামোর সঙ্গেও পরিচিত থাকা দরকার। কোন অংশে কত সময় পাওয়া যায়, কী ধরনের প্রশ্ন আসে এবং কোথায় কী করতে হবে—এসব না জেনে শুধু ইংরেজি চর্চা করলে পরীক্ষার দিন সমস্যায় পড়তে পারেন।
যেমন: রিডিংয়ে একটি প্রশ্নের পেছনে বেশি সময় ব্যয় করলে শেষের কয়েকটি প্রশ্নের জন্য সময় নাও থাকতে পারে। আবার রাইটিংয়ে দুটি টাস্কের জন্য সময় কীভাবে ভাগ করবেন, সেটি আগে থেকে অনুশীলন না করলে একটি অংশ লিখতেই অতিরিক্ত সময় চলে যেতে পারে। তাই প্রস্তুতির শুরুতেই পুরো একটি নমুনা পরীক্ষা দেখে নেওয়া এবং পরে সময় ধরে অনুশীলন করা কাজে দেয়।
স্পিকিংয়ে মুখস্থ উত্তর তৈরি করা
স্পিকিং পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে, তা দেখে প্রস্তুতি নেওয়া স্বাভাবিক। সমস্যা হয় যখন পরীক্ষার্থী সম্ভাব্য প্রশ্নের পুরো উত্তর মুখস্থ করে ফেলেন। নিজের শহর, পরিবার, পড়াশোনা, শখ কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আগে থেকেই সাজানো দীর্ঘ উত্তর মুখস্থ করলে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন একটু বদলে গেলেই তাল কেটে যেতে পারে। আবার মুখস্থ বক্তব্য অনেক সময় স্বাভাবিক কথোপকথনের মতোও শোনায় না।
বরং পরিচিত বিষয়গুলো নিয়ে নিজের ভাষায় কথা বলার অভ্যাস করা ভালো। একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর কেন এমন মনে করেন বা ছোট একটি উদাহরণ কী হতে পারে, সেটি যোগ করার চর্চাও করা যায়।
উচ্চারণ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা
ইংরেজি বলতে গেলেই ব্রিটিশ বা আমেরিকান উচ্চারণ করতে হবে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। ফলে স্পিকিং পরীক্ষার আগে কেউ কেউ নিজের স্বাভাবিক উচ্চারণ বদলানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু অন্য কারও উচ্চারণ নকল করতে গিয়ে কথার স্বাভাবিক গতি নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো কথা যেন পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। কোনো শব্দের উচ্চারণ ভুল হলে সেটি ঠিক করার চর্চা অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু পুরো কথার ধরন বদলে ফেলার দরকার নেই।
রাইটিংয়ে মুখস্থ কাঠামোর ওপর বেশি নির্ভর করা
অনলাইনে আইইএলটিএস রাইটিংয়ের অসংখ্য টেমপ্লেট পাওয়া যায়। ভূমিকা কীভাবে শুরু করবেন, কোন অনুচ্ছেদে কী লিখবেন, উপসংহারে কোন বাক্য ব্যবহার করবেন—এসবের তৈরি কাঠামো অনেকেই মুখস্থ করেন।
লেখা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কাঠামো সম্পর্কে ধারণা থাকা কাজে দেয়। কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নে একই ধরনের মুখস্থ বাক্য বসানোর চেষ্টা করলে মূল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জায়গাটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। রাইটিংয়ের প্রশ্নটি আসলে কী জানতে চাইছে, সেটি প্রথমে বোঝা জরুরি। এরপর নিজের বক্তব্য, যুক্তি ও উদাহরণ সেই প্রশ্ন অনুযায়ী সাজাতে হবে। শুধু সুন্দর কিছু বাক্য লিখলেই ভালো উত্তর তৈরি হয় না।
লিসেনিংয়ে একটি উত্তর মিস করে সেখানেই আটকে থাকা
লিসেনিংয়ের সময় একটি উত্তর শুনতে না পারলে সেটি মনে করার চেষ্টা করতে গিয়ে পরের উত্তরটিও মিস হয়ে যেতে পারে। তখন একটি ভুল খুব দ্রুত দুই বা তিনটি ভুলে পরিণত হয়। কোনো উত্তর মিস হলে সেখানে বেশি সময় আটকে না থেকে পরের প্রশ্নে মনোযোগ দেওয়া ভালো। অনুশীলনের সময়ও এই অভ্যাস তৈরি করা যায়। একইসঙ্গে প্রশ্নগুলো আগে দেখে সম্ভাব্য উত্তরের ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চর্চাও কাজে আসে।
মক টেস্ট দিলেই প্রস্তুতি হচ্ছে মনে করা
একের পর এক মক টেস্ট দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ভুলগুলো কেন হচ্ছে তা দেখা হচ্ছে না—এমন প্রস্তুতি খুব বেশি কাজে আসে না। ধরুন, রিডিংয়ে প্রতিবার একই ধরনের প্রশ্নে ভুল হচ্ছে। শুধু আরেকটি মক টেস্ট দিলে সেই সমস্যাটি থেকেই যেতে পারে।
প্রতিটি অনুশীলনের পর ভুলের কারণ খুঁজে দেখা দরকার। শব্দের অর্থ বুঝতে সমস্যা হয়েছিল, প্রশ্ন ভুল বুঝেছেন, নাকি সময়ের চাপে তাড়াহুড়া করেছেন, কারণটি জানা গেলে পরের অনুশীলনে সেটির দিকে আলাদা নজর দেওয়া যায়।
অন্যের ব্যান্ড স্কোর দেখে নিজের প্রস্তুতি সাজানো
কেউ এক মাস পড়ে ব্যান্ড ৮ পেয়েছেন, আবার কারও ছয় মাস লেগেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অভিজ্ঞতা দেখে নিজের জন্যও একই সময়সীমা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কারও ইংরেজির ভিত্তি আগে থেকেই শক্ত হতে পারে, আবার কারও রাইটিং বা স্পিকিংয়ে বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। প্রস্তুতি শুরুর দিকে একটি মক টেস্ট দিলে নিজের অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। এরপর কোন অংশে বেশি কাজ করা দরকার, সেই অনুযায়ী সময় ভাগ করা সহজ হয়।
পরীক্ষার আগে নিজের দুর্বলতা চিনুন
আইইএলটিএসের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে সব অংশে সমান সমস্যা আছে ধরে নিয়ে একইভাবে পড়তে থাকা। কারও রিডিং ভালো হলেও রাইটিং দুর্বল হতে পারে। আবার কেউ সহজে লিখতে পারলেও স্পিকিংয়ের সময় আটকে যান।
তাই পরীক্ষার তারিখ সামনে রেখে শুধু কত ঘণ্টা পড়ছেন, সেই হিসাব না করে কোথায় ভুল হচ্ছে, সেটি বোঝা বেশি জরুরি। নিয়মিত অনুশীলন করুন, ভুলগুলো লিখে রাখুন এবং যে অংশে বারবার সমস্যা হচ্ছে সেখানে বাড়তি সময় দিন।
শেষ পর্যন্ত আইইএলটিএসে ভালো করার জন্য কোনো একটি গোপন কৌশল নেই। পরীক্ষার ধরন জানা, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী নিয়মিত চর্চা করাই প্রস্তুতিকে অনেক বেশি গোছানো করতে পারে।




