ঘটনা নয়, মানুষের ভেতরকে দেখিয়েছেন তিনি
ঋতুপর্ণ ঘোষকে শুধু একজন চলচ্চিত্রকার বললে তার পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। আবার তাকে কেবল একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বললেও কম বলা হয়। তিনি এমন এক মানুষ, যিনি একাধারে সিনেমা বানিয়েছেন, গল্প বলেছেন, বিতর্ক উসকে দিয়েছেন, সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলেছেন, আবার সেই সমাজকেই নিজের আয়নায় দেখতে বাধ্য করেছেন। বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন মানুষ খুব বেশি আসেন না। যারা আসেন, তারা একটি নির্দিষ্ট পেশার গণ্ডি পেরিয়ে সময়ের ভাষায় পরিণত হন। ঋতুপর্ণ ছিলেন তেমনই একজন।
তার মৃত্যু হয়েছে ২০১৩ সালের ৩০ মে। তবু তার নাম উচ্চারিত হলেই কেবল কয়েকটি সিনেমার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে এক ধরনের আলো। এক ধরনের ঘর। এক ধরনের নীরবতা। মনে পড়ে প্রশ্ন। এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর আমরা এখনো পুরোপুরি খুঁজে পাইনি।
একটি দৃশ্য কল্পনা করা যাক। পুরোনো বাড়ি। বিকেলের আলো ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। জানালার পর্দা সামান্য দুলছে। দূরে কারও কথা বলার শব্দ। ড্রয়িংরুমে কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। বাইরে থেকে দেখলে সব স্বাভাবিক। কিন্তু ভেতরে জমে আছে বহু বছরের অভিমান, হিংসা, অপূর্ণতা, ভালোবাসা আর না-বলা বাক্য। এটাই ছিল ঋতুপর্ণের জগৎ।
তিনি সহিংসতাপূর্ণ বা মারদাঙ্গা পরিচালক নন। তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিচালক। বাংলা সিনেমা যখন একদিকে বাণিজ্যিক ফর্মুলার মধ্যে আটকে যাচ্ছিল, অন্যদিকে তথাকথিত শিল্পচলচ্চিত্রের দর্শক ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছিল, তখন ঋতুপর্ণ এক অদ্ভুত জায়গা তৈরি করলেন। সেখানে বুদ্ধিবৃত্তি আছে, কিন্তু দুর্বোধ্যতা নেই। আবেগ আছে, কিন্তু অতিনাটকীয়তা নেই। সাহিত্য আছে, কিন্তু ভারী ভাষার অহংকার নেই।
তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় নাটকগুলো প্রায়ই ঘরের ভেতরে ঘটে। একজন মায়ের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে জমে থাকা দূরত্ব। একটি পরিবারের অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই। একা হয়ে যাওয়া একজন নারীর নিঃসঙ্গ দুপুর। এসব বিষয় শুনতে যত সাধারণ লাগে, ঋতুপর্ণের হাতে সেগুলো তত গভীর হয়ে উঠত।
কারণ তিনি ঘটনাকে নয়, মানুষের ভেতরকে দেখতেন। অনেক পরিচালক চরিত্র নির্মাণ করেন। ঋতুপর্ণ মানুষের ভেতরের আবহাওয়া নির্মাণ করতেন।
তার সিনেমায় প্রায়ই দেখা যায়, কেউ একটি কথা বলতে চায় কিন্তু বলে না। কেউ ক্ষমা করতে চায় কিন্তু পারে না। কেউ ভালোবাসে, অথচ প্রকাশ করতে জানে না। এই না-পারা, না-বলা, না-ঘটা বিষয়গুলোর মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নাটক। সম্ভবত এ কারণেই তার সিনেমা শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মাথার ভেতরে দৃশ্যগুলো চলতে থাকে।
তবে ঋতুপর্ণকে বোঝার জন্য শুধু তার সিনেমা দেখলেই হয় না। তার দিকে তাকাতে হয় আরও বড় পরিসরে। বাংলা সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল। মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে যা-ই হোক, জনসমক্ষে তাকে একটি গ্রহণযোগ্য মুখোশ পরে থাকতে হবে। সমাজের স্বস্তি নষ্ট করা যাবে না। প্রচলিত ধারণাকে খুব বেশি প্রশ্ন করা যাবে না।
ঋতুপর্ণ এই নিয়ম মানেননি। তিনি নিজের উপস্থিতিকেই এক ধরনের সাংস্কৃতিক বক্তব্যে পরিণত করেছিলেন।
অনেকে তাকে বুঝতে পারেননি। কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করেছেন। কেউ উপহাস করেছেন। কিন্তু তিনি থামেননি।
কারণ তার লড়াই কেবল নিজের জন্য ছিল না, ছিল মানুষের নিজের মতো হওয়ার অধিকারের পক্ষে। তিনি যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, পরিচয় কোনো একরৈখিক বিষয় নয়। মানুষকে একটি মাত্র বাক্সে ভরে ফেলা যায় না। মানুষের ভেতর অনেক স্তর থাকে। অনেক রঙ থাকে, অনেক অস্পষ্টতা থাকে।
এই কথাগুলো আজ শুনতে পরিচিত লাগতে পারে। কিন্তু দুই দশক আগে দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক বাস্তবতায় এমন অবস্থান নেওয়া মোটেই সহজ ছিল না।
ঋতুপর্ণ সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এবং এ কারণেই তার গুরুত্ব শুধু চলচ্চিত্রের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি একটি সামাজিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি একটি সাংস্কৃতিক প্রশ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি একটি প্রয়োজনীয় অস্বস্তি হয়ে ওঠেন।
মজার ব্যাপার হলো, তার শিল্প আর তার জীবনকে আলাদা করে দেখা কঠিন। যে মানুষটি পর্দায় জটিল, সংবেদনশীল, বহুমাত্রিক চরিত্র নির্মাণ করতেন, তিনিও নিজে ছিলেন তেমনই এক জটিল, সংবেদনশীল, বহুমাত্রিক সত্তা।
তার জীবন যেন তার শিল্পেরই সম্প্রসারণ। আর তার শিল্প যেন তার জীবনেরই প্রতিধ্বনি। এই জায়গাটাই তাকে অনন্য করেছে।
কারণ অধিকাংশ শিল্পী তাদের কাজের মাধ্যমে কথা বলেন। ঋতুপর্ণ তার কাজের মাধ্যমেও কথা বলেছেন, নিজের উপস্থিতির মাধ্যমেও কথা বলেছেন। তিনি জানতেন, সমাজকে বদলাতে হলে শুধু পর্দায় গল্প বললেই হয় না। কখনো কখনো নিজেকেও গল্পের অংশ করে তুলতে হয়।
তবে এতসব আলোচনা, বিতর্ক, পরিচয় রাজনীতি কিংবা সাংস্কৃতিক গুরুত্বের মধ্যেও একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়।
সেটি হলো তার গভীর মানবিকতার বোধ। ঋতুপর্ণ মানুষের প্রতি কৌতূহলী ছিলেন। তিনি মানুষকে বিচার করার চেয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন বেশি। তার চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে স্পষ্ট খলনায়ক খুব কম। মানুষ ভুল করছে, আঘাত দিচ্ছে, ব্যর্থ হচ্ছে, স্বার্থপর হচ্ছে—কিন্তু তবুও তারা মানুষ। এই মানবিক দৃষ্টিই তার কাজকে সময়ের সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
কারণ সমাজ বদলায়। রাজনীতি বদলায়। বিতর্কের বিষয় বদলায়। কিন্তু মানুষের একাকীত্ব বদলায় না। ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা বদলায় না। স্বীকৃতির প্রয়োজন বদলায় না। অপূর্ণতার যন্ত্রণা বদলায় না। ঋতুপর্ণ সেই চিরন্তন জায়গাগুলো স্পর্শ করেছিলেন। তাই তার সিনেমা আজও পুরোনো লাগে না।
আজকের পৃথিবী অনেক দ্রুতগতির। মানুষের মনোযোগ কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের বেশি থেমে থাকার অভ্যাসও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঋতুপর্ণকে নতুন করে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়।
তিনি স্থিরতার শিল্পী ছিলেন। তিনি দর্শককে থামতে বাধ্য করতেন। শুনতে বাধ্য করতেন। অনুভব করতে বাধ্য করতেন। একটি দীর্ঘ নীরবতার মধ্যেও তিনি অর্থ খুঁজে পেতেন। একটি দৃষ্টির মধ্যেও তিনি গল্প খুঁজে পেতেন। একটি অসমাপ্ত বাক্যের মধ্যেও তিনি সম্পর্কের ইতিহাস শুনতে পেতেন।
এই ক্ষমতা খুব কম শিল্পীর থাকে। হয়তো এ কারণেই তার কাজ নিয়ে আলোচনা শেষ হয় না। নতুন প্রজন্মও বারবার তার কাছে ফিরে আসে। কেউ সিনেমার জন্য, কেউ সংলাপের জন্য, কেউ সাহসের জন্য। কেউ নিজের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে।
ঋতুপর্ণ ঘোষকে ঘিরে এত বছর পরও আগ্রহ টিকে থাকার কারণ আসলে এখানেই। তিনি কেবল কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। তিনি একটি দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেছিলেন। মানুষের দিকে তাকানোর একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। আমাদের পরিচিত জীবনকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
বাংলা সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে অনেক সফল পরিচালক এসেছেন। অনেক জনপ্রিয় শিল্পীও এসেছেন। কিন্তু খুব কম মানুষই এমনভাবে সময়কে স্পর্শ করতে পেরেছেন, যেখানে শিল্প, জীবন, পরিচয়, সাহস ও সংবেদনশীলতা এক বিন্দুতে এসে মিশে যায়। ঋতুপর্ণ ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।
তাকে মনে রাখার কারণ শুধু তার সিনেমা নয়। শুধু তার ব্যক্তিত্বও নয়।
বরং, কারণ এই যে, তিনি আমাদের এমন কিছু প্রশ্ন করে গেছেন, যেগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। এমন কিছু অনুভূতির ভাষা দিয়ে গেছেন, যেগুলো এখনো আমাদের স্পর্শ করে। এমন এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন, যেখানে তাকালে আমরা শুধু তাকে দেখি না, নিজেদেরও দেখতে পাই। সত্যি বলতে, কোনো শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য খুব বেশি নেই।