৫৪ ধারা কী, কখন প্রয়োগ হয়?
অতি পরিচিত একটি শব্দ ৫৪ ধারা। সাধারণভাবে আমরা ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার মানে সন্দেহজনক গ্রেপ্তার বুঝি। এই সন্দেহজনক গ্রেপ্তার কী? মূলত আমলযোগ্য অপরাধ সংগঠন করার আশঙ্কার সন্দেহ থেকে এ ধরনের গ্রেপ্তার হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করলে পুলিশ এই ধারার অধীনে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে।
৫৪ ধারা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ পারভীন মৌ।
৫৪ ধারা কী, কখন প্রয়োগ হয়
আইনজীবী মমতাজ পারভীন মৌ বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৫৪ ধারা পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেট বা পরোয়ানা ছাড়াই (উইদাউট ওয়ারেন্ট) যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের বিশেষ ক্ষমতা দেয়। নয়টি সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুলিশ কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করতে পারে। গ্রেপ্তারের জন্য আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আদেশ লাগে না, থানায় কোনো অভিযোগ থাকারও দরকার হয় না।
১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী যেসব ক্ষেত্রে পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করতে পারে:
১. কেউ আমলযোগ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে।
২. আমলযোগ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ বা সন্দেহ থাকলে।
৩. আইনসঙ্গত অজুহাত ছাড়া কারও কাছে ঘর ভাঙার সরঞ্জাম থাকলে।
৪. সংবাদপত্র বা গেজেটের মাধ্যমে ঘোষিত অপরাধী হলে।
৫. সামরিক বাহিনীর পলাতক সদস্য হলে বা প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে পালিয়ে গেলে।
৬. পুলিশের কাজে বাধা দিলে।
৭. পুলিশের হেফাজতে থেকে পালিয়ে গেলে।
৮. দেশের বাইরে অপরাধ করে পালিয়ে এলে।
৯. চোরাই মাল থাকলে বা অন্য কোনো থানা থেকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ থাকলে যেকোনো ব্যক্তিকে পুলিশ সন্দেহবশত গ্রেপ্তার করতে পারবে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং আরও কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার করা রিটে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়ে ৫৪ ধারা প্রয়োগে কারও সঙ্গে স্বেচ্ছাচারিতা না করা, আটক বা গ্রেপ্তারের সময় পরিচয় দেওয়া, কাউকে নিবর্তনমূলক আটকাদেশ না দেওয়া, রিমান্ডে নির্যাতন না করা, আলোচ্য ধারাটি সংশোধনের তাগিদসহ ১৫ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়।
২০১৬ সালের ২৪ মে আপিল বিভাগে এ রায় বহাল থাকে। ওই বছরের ১০ নভেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তব্য বিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়, নাগরিকের সম্মান রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উঁচুমানের পেশাদারিত্ব দেখাতে হবে। সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিকের অধিকার রক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
৫৪ ধারা সংশোধনের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। আইনটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত পুলিশকে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
১. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে না।
২. কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে।
৩. গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে।
৪. বাসা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তির নিকট আত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিষয়টি জানাতে হবে।
৫. গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে তার পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী ও আত্মীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে।
৬. গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে কারাগারের ভেতরে কাঁচের তৈরি বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দিতে হবে। ওই কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকট আত্মীয় থাকতে পারবেন।
৭. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির মেডিকেল পরীক্ষা করাতে হবে।
৮. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিকেল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নেবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে।
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের পর প্রতিকার
আইনজীবী মমতাজ পারভীন মৌ বলেন, পুলিশের সন্দেহ করার কারণ থাকলে পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরে তাদেরও বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক। তাই ভুক্তভোগীর ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব একজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
বিনা পরোয়ানায় এই ধারায় গ্রেপ্তার করার পর পুলিশের প্রথম কাজ হচ্ছে যেই সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। পুলিশ যদি মনে করে সন্দেহ অমূলক হয়েছে, তবে ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর ছেড়ে দিতে পারে। আর যদি সন্দেহ সত্যি বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা মামলার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগোবে।
সন্দেহের ফলাফল যাই হোক, যদি পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধের কোনো আলামত বা সম্পৃক্ততা খুঁজে না পায়, সেক্ষেত্রে পুলিশ সেই ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারার অধীনে আদালতে হাজির করবে এবং এটি একটি সাংবিধানিক অধিকার, যা আমাদের সংবিধানের ৩৩ (২) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে।
এরপর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সব বিষয় বিবেচনা করে তদন্তের স্বার্থে তাকে আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারেন বা জামিন দিতে পারেন বা অব্যাহতি দিতে পারেন।
তাই ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর আইনজীবীর মাধ্যমে প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে জামিনের আবেদন করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট জামিন মঞ্জুর না করলে দায়রা জজ আদালতে জামিনের আবেদন করতে হবে এবং দায়রা জজ আদালতও যদি জামিনের আবেদন মঞ্জুর না করেন, তবে উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করা যায়।
অন্যদিকে, যদি কাউকে হেনস্থার জন্য বা অসৎ উদ্দেশ্যে ৫৪ ধারায় আটক করা হয়, তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অবৈধ আটকের মামলা করারও সুযোগ রয়েছে।


