শীতে বারান্দা কিংবা ছাদ রঙিন করে তুলবে যেসব গাছ

কে টি হুমায়রা

শীতকাল যেন কুয়াশার চাদরে ঢেকে ফেলেছে বাংলাদেশের এই ছোট্ট সবুজ ভূখণ্ডটিকে। শীতের ছোঁয়ায় চারপাশ ধূসর হয়ে ওঠে, আর কবিতার মতো এক নীরব আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সূর্য যেন লাজে মুখ লুকিয়েছে, শহরের চিরচেনা ঝলমলে রূপ ফিকে হয়ে গেছে, আর সকালগুলো রঙহীন কুয়াশায় মোড়া।

এই শান্ত ও শীতল সময়ের নিজস্ব এক সৌন্দর্য আছে। তবে তার মধ্যেও কোথাও যেন রঙিন কিছুর জন্য এক মৃদু আকুলতা থেকে যায়। যেন কেউ কানে কানে ফিসফিস করে বলে, 'তুলির এক আঁচড়ে চারপাশটা কি একটু রাঙিয়ে দেবে?' সেই নীরবতাই ভেঙে হাজির হয় শীতের ফুলেরা—শীতের দিনগুলোয় চারপাশে রঙ ছড়িয়ে দিতে।

তবে শীতকাল মানেই যে চারপাশ ধূসর আর প্রাণহীন হয়ে থাকবে—তা কিন্তু নয়। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে নানা রকম রঙিন ফুলের সমাহারে চারপাশ ঠিক কতটা রঙিন হয়ে উঠতে পারে? আপনার বারান্দা বা ছাদে পেটুনিয়াস, কসমস বা ক্যালেন্ডুলাস ফুলের কয়েকটি টব রাখলে দেখবেন চারপাশটা কত রঙিন হয়ে উঠেছে, আর সেখানে বসে একটু সময় কাটানোর ইচ্ছে নিজে থেকেই জাগবে।

কমলা রঙের গাঁদা ফুল, বেগুনী রঙের ডায়ান্থাস ফুল কিংবা গোলাপি রঙের জিনিয়া ফুলের শোভা সকাল সকাল আপনার মন ভালো করে দেবে। সকাল বেলা মিষ্টি রোদের হাতছানিতে কাঁচা ঘুম ভেঙে আপনি যখন চোখ খুলে তাকাবেন তখন মনে হবে পর্তুলিকা ফুলগুলো আপনাকে বলছে 'শুভ সকাল'। কারণ এই ফুলোগুলো কেবলমাত্র সূর্যালোকের স্পর্শেই ফুটে থাকে।

মজার ব্যাপার হলো, শীতকালীন গাছগুলোর খুব একটা যত্নআত্তির প্রয়োজন হয় না। সামান্য পানি আর একটু রোদ পেলেই তারা আপনাতেই বেড়ে ওঠে এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুলে ফুলে চারপাশের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকায় এবং পরিবেশ তুলনামূলকভাবে আর্দ্র হওয়ায় গ্রীষ্ম বা বসন্তের তুলনায় মাটি অনেক বেশি সময় ভেজা থাকে। ফলে দিনে একবার পানি দিলেই বেশিরভাগ গাছের জন্য যথেষ্ট—যা নিঃসন্দেহে একটি বাড়তি সুবিধা। তা ছাড়া এসব গাছের ডাল কাটা বা ছাঁটাই করারও তেমন প্রয়োজন পড়ে না; গাছগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠতে দেওয়া যায়।

শাহবাগের ফুল বিক্রেতা আব্দুর রহমান বলেন, 'ইচ্ছে থাকলেও যারা গাছ লাগানো ও পরিচর্যার জন্য খুব বেশি সময় বের করতে পারেন না, তারা সাধারণত শীতকালীন গাছই বেছে নেন। কারণ এসব গাছের খুব একটা যত্নের প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি এই সময়ে গাছে পোকামাকড়ের উপদ্রবও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে এদিক থেকে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকা যায়।'

'তবে মনে রাখতে হবে, সব গাছ ঘরের ভেতরে রাখা যায় না। গুল্মজাতীয় কিছু গাছের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক প্রয়োজন,' যোগ করেন তিনি।

গাঁদা, ডায়ান্থাস ও ক্যালেন্ডুলার চারা সাধারণত ৬০ টাকার আশপাশেই পাওয়া যায়। আর আকারভেদে হাইব্রিড গোলাপের চারার দামও ৪০০ টাকার বেশি নয়। ফুটপাতের এসব দোকানে টবসহ গাছ মিলছে, ফলে আলাদা করে টবে গাছ লাগানোর ঝামেলাও পোহাতে হয় না।

আগারগাঁওয়ে রাস্তার ধারে ফুল বিক্রেতা আসাদ জানালেন, শীতের ফুলগুলোর বেশিরভাগেই তীব্র সুগন্ধ না থাকলেও উজ্জ্বল রঙের জন্য বাংলাদেশে এগুলো দারুণ জনপ্রিয়। আর যদি সুগন্ধি ফুল চান, তাহলে বেছে নিতে হবে চাইনিজ বা ইরানিয়ান গোলাপ।

ঝামেলা ছাড়াই বারান্দা বা ছাদকে চোখে পড়ার মতো সুন্দর করে তুলতে শীতকাল যেন আদর্শ সময়। টবে লাগানো এই ফুলগাছগুলো শুধু আশপাশের সৌন্দর্য বাড়ায় না, শীতের বিষণ্নতাকেও রঙিন করে তোলে। কল্পনা করুন—চোখজুড়ানো ফুলের সমাহার, তার চারপাশে উড়ছে রঙবাহারি প্রজাপতি। এই সৌন্দর্য, মুগ্ধতা আর আনন্দ একবার উপভোগ করলে মন নিজেই চাইবে কাছের কোনো নার্সারি থেকে ফুলের গাছ কিনে এনে বারান্দা বা ছাদ ভরিয়ে তুলতে।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী