বোটানিক্যাল গার্ডেনে খালি পায়ে হাঁটার রাস্তায় একদিন

By জাওয়াদ সামি নিয়োগী
25 November 2025, 06:03 AM

মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা আদি ও অকৃত্রিম। কিন্তু ইট-পাথরের ঢাকা শহরে আমরা সেই শেকড়ের টান ভুলতে বসেছি। চারদিকে শুধু পিচঢালা পথ আর দালানকোঠা। এখানে মাটির ছোঁয়া পাওয়া যায় না বললেই চলে। অথচ ঘাস বা মাটির ওপর খালি পায়ে হাঁটার সামান্য সুযোগও এনে দিতে পারে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।

ঢাকার বুকেই এই সুযোগ এনে দিয়েছে মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন কর্তৃপক্ষ। এর নাম 'বেয়ারফুট ট্রেইল' বা 'খালি পায়ে হাঁটার রাস্তা'। ফুল, পাখি আর সবুজের সমারোহে এখনে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির স্পর্শ পাওয়ার সুযোগ।

কেমন সেই হাঁটার পথ? উদ্যানের 'যাত্রাবাড়ী' নামক অংশে তৈরি করা হয়েছে ৫০ মিটার দীর্ঘ এই বিশেষ পথ। পুরো পথটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। প্রবেশপথেই চোখে পড়ে দুটি সাইনবোর্ড, যেখানে খালি পায়ে হাঁটার উপকারিতা ও সতর্কতার কথা লেখা রয়েছে।

walking_trail_1.jpg
ছবি: জাওয়াদ সামি নিয়োগী

পথটি তৈরি করা হয়েছে ধাপে ধাপে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি পাওয়া যায়। শুরুতে পায়ের নিচে পড়বে শীতল বালু। এরপর কাঠের গুঁড়ি বিছানো পথ, যা পায়ের পাতায় আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করে। এরপরই নুড়ি পাথরের অংশ। এখানে পাথরের ছোট ছোট খোঁচা স্নায়ুগুলোকে সজাগ করে তোলে। এরপরই নরম মাটি, অগভীর পানি এবং সবশেষে গোড়ালি সমান কাদা।

এই পথে পা রাখলেই মনে হয়, যেন গ্রামের বৃষ্টিভেজা কোনো পথ দিয়ে হাঁটা হচ্ছে। বালুর শীতলতা, নুড়ি পাথর আর কাদার স্পর্শ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। পুরো পথটি শেষ করার পর মনে হয়, শরীরের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর অস্থিরতা যেন নিমেষেই উবে গেছে।

কৌতূহল নিয়ে অনেকেই ভিড় করছেন এই নতুন রাস্তায়। কেউ আসছেন শরীরচর্চার অংশ হিসেবে, কেউবা নিছক অভিজ্ঞতার জন্য।

ব্যবসায়ী মাহবুব মোরশেদ প্রথমবারের মতো পরিবার নিয়ে এসেছেন এই ট্রেইলে। তিনি বলেন, 'আমি পরিবারের সবাইকে নিয়ে এই অভিজ্ঞতা নিতে এসেছি। তবে একটা বিষয় চোখে পড়ল, অনেকেই জুতা পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছেন, যেটা একদমই উচিত নয়। এ ছাড়া বাকি সব মিলিয়ে এটি দারুণ এক অভিজ্ঞতা।'

walking_trail_2.jpg
ছবি: জাওয়াদ সামি নিয়োগী

গৃহিণী শিরিন নিয়মিত বোটানিক্যাল গার্ডেনে আসেন যোগব্যায়াম করতে। নতুন এই রাস্তার কথা শুনে তিনিও দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, 'এটি সত্যিই খুব কাজের কাজ হয়েছে। শহরে বেড়ে ওঠা শিশুরা তো গ্রাম দেখার সুযোগ পায় না, কিন্তু মাটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। গার্ডেনের গেট থেকে এই জায়গাটা অনেকটা দূরে হলেও, এতটুকু পথ আসা সার্থক।'

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার আব্দুল লতিফ একে আখ্যায়িত করেছেন 'থেরাপি' হিসেবে। তিনি বলেন, 'এক কথায় বলতে গেলে এটা থেরাপি। বয়স্ক মানুষ বা যাদের শারীরিক সমস্যা আছে, তাদের জন্য এই শহরে এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যদিও সব বয়সের মানুষই এর সুফল পেতে পারে। আমার মনে হয়, ঢাকার প্রতিটি এলাকায় এমন হাঁটার পথ থাকা উচিত।'