কোরবানির সময়ে ঢাকা যেভাবে বদলে যায়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

ঢাকা শহরকে সাধারণত মানুষ চেনে তার ক্লান্তি দিয়ে। ধোঁয়া, জ্যাম, হর্ন, তাড়াহুড়ো আর কংক্রিটের ভিড়ে আটকে থাকা এক শহর। এখানে ঋতুর পরিবর্তনও অনেক সময় স্পষ্ট বোঝা যায় না। কিন্তু বছরে অন্তত একবার, কোরবানির ঈদের আগে এই শহর হঠাৎ করেই বদলে যেতে শুরু করে।

বদলটা শুধু রাস্তায় নয়, মানুষের আচরণে, বাতাসে, শব্দে, রাতের ভেতরেও। কয়েক দিনের জন্য ঢাকা যেন তার পরিচিত নগর-চেহারা সরিয়ে অন্য এক জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ঢাকার শরীরে সেই পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়।

অস্থায়ী হাটের শহর

ঢাকার কিছু জায়গা আছে, যেগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় সাধারণই লাগে। বড় খালি মাঠ, ধুলোমাখা জায়গা, ফাঁকা প্লট কিংবা ট্রাক দাঁড়ানোর স্থান। কিন্তু কোরবানির সময় এগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে।

গাবতলী, আফতাবনগর, বসিলা, শনির আখড়া কিংবা শহরের প্রান্তঘেঁষা আরও অনেক জায়গা কয়েক দিনের জন্য অন্যরকম এক জগতে পরিণত হয়। বাঁশের খুঁটি ওঠে, ত্রিপল টাঙানো হয়, খড়ের গাদা জমে, বিদ্যুতের অস্থায়ী লাইন আসে।

তারপর একদিন হঠাৎ দেখা যায়, জায়গাটা আর আগের মতো নেই। সেখানে সারি সারি গরু দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও বিশাল ষাঁড়, কোথাও ছোট বাছুর। কাদার ভেতর দিয়ে মানুষ হাঁটছে, কেউ দাম বলছে, কেউ দাঁত দেখে বয়স বোঝার চেষ্টা করছে, কেউ মোবাইলের আলো ফেলে পশুর শরীর দেখছে।

হাটের নিজস্ব শব্দ আছে। গরুর ডাক, ট্রাকের শব্দ, মাইকের ঘোষণা, মানুষের দরদাম করা, চায়ের দোকানের আড্ডা—সব মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেটা অন্য কোনো সময়ের ঢাকার সঙ্গে মেলে না।

এই সময় শহরের বাতাসেও আলাদা একটা গন্ধ থাকে। খড়ের গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ, পশুখাদ্যের গন্ধ, কখনও বৃষ্টির সঙ্গে মিশে থাকা কাঁচা কাদার গন্ধ।
ঢাকার মতো কংক্রিটের শহরে এই গন্ধগুলো হঠাৎ করেই মানুষকে গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ট্রাকভর্তি শহরের রাত

ঈদের আগে ঢাকার রাতগুলোতে সবচেয়ে বেশি বদলে যায় শহরের প্রবেশপথগুলো।

গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, আব্দুল্লাহপুর কিংবা সাইনবোর্ড এলাকায় গভীর রাতেও চোখে ঘুম নামে না। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে গরু আসতে থাকে। কোথাও ট্রাকের সারি, কোথাও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে খামারিরা। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ গরুর গায়ে পানি দিচ্ছে, কেউ মোবাইলে কথা বলছে।

একটা সময় বোঝা যায়, ঢাকা শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুরো দেশের গ্রামীণ জীবন যেন কয়েক দিনের জন্য এই শহরের দিকে এগিয়ে এসেছে।

রাতের শহরে তখন অদ্ভুত কিছু দৃশ্য দেখা যায়। লাল-সবুজ বাতির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গরু। ফ্লাইওভারের পাশে খড় নামানো হচ্ছে। কোনো ট্রাকের ছাদে বসে হেলপার ঘুমিয়ে পড়েছে।

একদিকে উজ্জ্বল বিলবোর্ড, অন্যদিকে পশুভর্তি ট্রাক। একই শহরে দুই ভিন্ন বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে।

বাসার নিচে পশু

কোরবানির ঈদের আগে ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোতেও এক ধরনের পরিবর্তন আসে।

যে গ্যারেজে সারা বছর শুধু গাড়ি থাকে, সেখানে হঠাৎ গরু-খাসি বাঁধা দেখা যায়। ভবনের নিচে বালতি ভর্তি পানি রাখা হয়। শিশুরা পশুটির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কেউ গাছের পাতা এনে খাওয়ায়, কেউ ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়।

অনেক পরিবারে কোরবানির পশু কিনে আনার পর সেটাকে ঘিরে ছোটখাটো এক উৎসব তৈরি হয়। আত্মীয় আসে, প্রতিবেশী আসে, সবাই দাম জিজ্ঞেস করে।

ঢাকার ব্যস্ত জীবনে যেখানে একই ভবনের মানুষও অনেক সময় একে অন্যকে খুব কম চেনে, সেখানে এই কয়েক দিনে হঠাৎ করেই যোগাযোগ বাড়ে। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে কোরবানির আলোচনা হয়। ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে পাশের বাসার মানুষ জিজ্ঞেস করে, ‘কত দিয়ে কিনলেন?’

শহুরে দূরত্বের ভেতরে সামান্য উষ্ণতা তৈরি হয়।

রাত জাগা পশুর হাট

ঢাকায় রাত নামে একটু দেরিতেই। কিন্তু কোরবানির সময় সেই রাতের ভেতরেও অন্যরকম প্রাণ আসে।

হাটগুলো গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। রাত দুইটা, তিনটাতেও সেখানে মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ শেষ মুহূর্তে গরু কিনতে এসেছে, কেউ শুধু দেখতে এসেছে।
চায়ের দোকানে তখন অন্যরকম আড্ডা বসে। রাজনীতি, বাজারদর, কোন জেলার গরু ভালো, কোন খামারি সৎ—সব নিয়ে আলোচনা হয়।

হাটের কাদা মাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ ক্লান্ত হয়, আবার অদ্ভুতভাবে আনন্দও পায়। অনেকেই ছোটবেলার গ্রামের ঈদের স্মৃতি খুঁজে পায় এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে।

কোথাও দেখা যায়, এক খামারি গরুর পাশে বসেই আধঘুমে চা খাচ্ছে। হয়তো তিনদিন ধরে ঠিকমতো ঘুম হয়নি তার। একটু দূরে কয়েকজন তরুণ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বিশাল এক ষাঁড়ের ভিডিও করছে। কোনো বাবা তার ছোট ছেলেকে কাঁধে তুলে গরু দেখাচ্ছে। শিশুটির চোখে তখন একইসঙ্গে বিস্ময়, ভয় আর আনন্দ।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটের ভেতরের আলোও অন্যরকম লাগে। কাদার ওপর সাদা বাতির প্রতিফলন ঘটে। কোথাও হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, কোথাও গরম চায়ের ধোঁয়া উঠছে। 
ঢাকার সাধারণ রাতের মতো এখানে নিঃসঙ্গতা নেই। অচেনা মানুষও হঠাৎ কথা বলে ফেলে, হাসে, দরদাম নিয়ে তর্ক করে।

ঢাকার অন্যান্য রাতের সঙ্গে এই রাতের পার্থক্য স্পষ্ট। এখানে তাড়াহুড়ো আছে, কিন্তু একেবারে যান্ত্রিকতা নেই। একটা অস্থায়ী মেলার আবহ আছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে হাট

গত কয়েক বছরে কোরবানির ঈদের সময়টায় ঢাকার আরেকটা পরিবর্তন খুব স্পষ্ট হয়েছে। সেটা ডিজিটাল স্ক্রিনের ভেতরে।

এখন শুধু হাটে গেলেই হয় না। ফেসবুকে বিশাল গরুর ভিডিও ভাইরাল হয়, ইউটিউবে খামারের ভ্লগ দেখা যায়, লাইভে দরদাম হয়। কেউ ভিডিও কলে গরু দেখিয়ে কিনছে, কেউ অনলাইনে টাকা পাঠাচ্ছে।

একসময় কোরবানির হাট ছিল পুরোপুরি শারীরিক অভিজ্ঞতা। এখন সেটার একটা অংশ চলে গেছে মোবাইলের স্ক্রিনে।

তবু মজার বিষয় হলো, ডিজিটাল হওয়ার পরও এই উৎসবের মূল আবহ বদলায়নি। মানুষ এখনও হাটে যায়, কাদা মাড়ায়, সামনে দাঁড়িয়ে পশু দেখে। কারণ কোরবানির ঈদের এই অভিজ্ঞতা শুধু কেনাবেচার নয়; এটা অনুভবেরও ব্যাপার।

ঈদের সকালের ব্যস্ততা

ঈদের সকাল ঢাকাকে আবার নতুনভাবে বদলে দেয়।

ফজরের পর থেকেই অলিগলিতে ব্যস্ততা শুরু হয়। কোথাও ছুরি ধার দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কসাই এসে পৌঁছেছে, কোথাও বড় বড় পলিথিন বিছানো হচ্ছে।

শহরের শব্দও পাল্টে যায়। সকালে গাড়ির হর্নের চেয়ে মানুষের ডাকাডাকি বেশি শোনা যায়। কেউ পানি আনছে, কেউ মাংস কাটার লোক খুঁজছে, কেউ আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একসময় পুরো শহর যেন একই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ঢাকার বহুতল ভবন, সরু গলি, অভিজাত এলাকা, পুরোনো মহল্লা—সব জায়গায় একই ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। সামাজিক পার্থক্যগুলো কিছুক্ষণের জন্য অন্তত ঝাপসা হয়ে আসে।

তারপর ধীরে ধীরে মাংস ভাগ করা শুরু হয়। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, দরিদ্র মানুষ—সবার ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছায়। শহরের ভেতরে এক ধরনের আদান-প্রদান শুরু হয়ে দিনব্যাপী চলমান থাকে।

বৃষ্টিভেজা কোরবানির ঢাকা

কোরবানির সময় বৃষ্টি হলে ঢাকার দৃশ্য আরও আলাদা হয়ে ওঠে।

হাটের কাদা তখন আরও নরম হয়। ট্রাকের চাকা আটকে যায়। খড় ভিজে গন্ধ ছড়ায়। কোথাও ত্রিপলের ওপর বৃষ্টির শব্দ শোনা যায়, কোথাও ভিজতে ভিজতেই মানুষকে দরদাম করতে দেখা যায়।

বৃষ্টির সময় হাটের পরিবেশও বদলে যায়। ভেজা বাতির নিচে গরুর শরীর চকচক করে। কাদায় মানুষের পায়ের ছাপ জমে থাকে। কেউ প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটছে, কেউ স্যান্ডেল হাতে নিয়ে খালি পায়ে এগোচ্ছে।

ঢাকার বর্ষার সঙ্গে এমনিতেই বিশৃঙ্খলার একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু কোরবানির সময় সেই বিশৃঙ্খলা যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানির ভেতর ট্রাকের চাকা ঘুরছে, ছিটকে কাদা লাগছে মানুষের কাপড়ে। তবু কেউ খুব বিরক্ত হচ্ছে না। কারণ সবাই যেন বুঝে নিয়েছে, এই কয়েক দিনের শহর এমনই হবে।

কোথাও দেখা যায়, বৃষ্টির ভেতর গরুর গা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে খামারি। কোথাও কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে ত্রিপল ধরে দাঁড়িয়ে আছে যাতে পানি না পড়ে। চায়ের দোকানে তখন ভিড় আরও বাড়ে। ভেজা জামা গায়ে দিয়েই মানুষ গরম চায়ে চুমুক দেয়।

ঈদের সকালেও যদি বৃষ্টি নামে, শহরের দৃশ্য আরও আলাদা লাগে। ভবনের নিচে জমে থাকা পানির পাশে কোরবানির প্রস্তুতি চলছে। ভেজা রাস্তায় রিকশা ধীরে চলছে। কোথাও কসাই বৃষ্টির পানি এড়িয়ে ছুরি মুছছে, কোথাও শিশুরা বারান্দা থেকে নিচের ব্যস্ততা দেখছে।

কোরবানির দিন বৃষ্টি হলে শহরজুড়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কিন্তু এর ভেতরেই কোরবানির সময়ের ঢাকার আসল চরিত্রটা লুকিয়ে থাকে।

কারণ এই শহর বছরের অন্য সময় যতই আধুনিক, দ্রুত আর ক্লান্ত হয়ে উঠুক না কেন, কোরবানির সময়ে সে আবার মানুষে, পশুতে, কাদায়, গন্ধে, কথাবার্তায় ভরা এক জীবন্ত শহরে পরিণত হয়।

কয়েক দিনের জন্য ঢাকা তখন নিছক রাজধানী থাকে না। এটি হয়ে ওঠে গ্রামের স্মৃতি, নগরের বাস্তবতা, ধর্মীয় আবেগ, মৌসুমি অর্থনীতি আর মানুষের সাময়িকভাবে কাছাকাছি আসার বিরল অভিজ্ঞতার সম্মেলন।