ঘরে দেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া রাখবেন যেভাবে
ঘর আসলে এমন জিনিসে পরিপূর্ণ থাকা উচিত যা কেবল চোখ, মন ও শরীরকে প্রশান্তি দেয় না, বরং ঘরের মানুষের সৃজনশীলতা ও নৈতিক বোধেরও প্রতিফলন ঘটায়। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলাদেশে দেশজ ও সাংস্কৃতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ গৃহসজ্জার সামগ্রীর ব্যবহারে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া ও খানিকটা ভিন্নতা। আসলে টেকসই ভাবনা ছাড়া তৈরি প্রাণহীন, গণহারে উৎপাদিত মিনিমালিজম আর মন ভরাতে পারছে না। সমসাময়িক ঘরের জন্য ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী বেছে নেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।
বিশেষ করে ২০২৬ সালে এসে, আমাদের ঘরবাড়ি হয়ে গেছে আকারে ছোট। এখানে দাদির আমলের ভারী কাঠের আলমারি কিংবা লোহার সিন্ধুক ভাবতেই গা ছমছম করে! তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে কীভাবে সংস্কৃতি আর বাকি সব বিবেচনা করে ঘর সাজাবো?
লোকজ রিকশা আর্ট
লাল, হলুদ, কমলা বা নীলের মতো উজ্জ্বল ও নজরকাড়া রঙে সাহসী তুলির টানে আঁকা টিউলিপ, লিলি, ময়ূর, হাতি, পাখি, গাছ, মানুষের মুখ কিংবা পটচিত্র—এসব বাংলাদেশের রিকশার পেছনের অংশে দেখা বহুদিন ধরে পরিচিত ও চেনা দৃশ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই লোকজ শিল্পরূপটি আমাদের নগরজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই শিল্পধারাটি নতুন রূপ পেয়েছে এবং এখন তা আসবাবপত্র ও নানা ধরনের শোপিস সাজাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। হাতে আঁকা জলচৌকি, টিস্যু বক্স, সানগ্লাস কেস, ফুলদানি ইত্যাদি যেকোনো ঘর বা বসার জায়গা সাজাতে এগুলো ব্যবহার করা যায়। এই ধরনের সামগ্রী ঘরে এনে দেয় প্রাণবন্ততা ও রঙের উচ্ছ্বাস।
প্রবেশপথের দেয়ালে রিকশা পেইন্টিং করা আয়না ঝুলিয়ে দিলে তা নিঃসন্দেহে ঘরের মানুষ ও অতিথি সকলেরই নজর কাড়বে। যাত্রা, দেশি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘বেশিদেশি’ ইত্যাদি জায়গায় জলচৌকি, ফুলদানি ও নানা ধরনের শোপিস সহজেই পাওয়া যায়।
এছাড়াও ট্রে, কোস্টার সেট, টেবিল ম্যাট, টব, মগের মতো নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীতেও এখন এই ব্যতিক্রমী শিল্পধারার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। পটচিত্র কিংবা নানা নকশা ও মোটিফ আঁকা ক্যাবিনেট, আলমারি ও জুতার র্যাকও আধুনিক বিকল্পগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

বাঁশ ও বেত
মিনিমালিস্ট রুচি আর খরচ কমানোর প্রবণতার কারণে বহু বছর অবহেলায় থাকা বেতের আসবাব, বিশেষ করে দোলনা সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘরবাড়ি, অফিস ও রেস্তোরাঁয় দারুণভাবে ফিরে এসেছে।
টেকসই উপাদান, পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য এবং সূক্ষ্ম কারুশিল্পসহ সব মিলিয়ে বেতের আসবাব নৈতিক ও পরিবেশ—উভয় দিক থেকেই চমৎকার। বসার ঘর বা লনের আরামদায়ক পরিবেশ তৈরিতে বেতের তৈরি হালকা সোফা ও টেবিল ব্যবহার করতে পারেন।
বাঁশ ও বেতের সংমিশ্রণে তৈরি ট্রে, ল্যাম্প, ফুলের টব, ঝুড়ি ও ফুলদানি দৈনন্দিন জীবনে যোগ করতে পারে শৈল্পিক সৌন্দর্য। বাঁশের পর্দাও এখন বেশ জনপ্রিয়। ব্যবহারে সহজ এবং পাশাপাশি ঘরে ঐতিহ্যবাহী একটি আবহ তৈরি করে।
পান্থপথ, গ্রিন রোড, গুলশান ১ এর ডিসিসি মার্কেট, মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটসহ বিভিন্ন পরিচিত বেতের দোকানে এসব আসবাব ও অনুষঙ্গ সহজেই পাওয়া যায়।

পাটের অনুষঙ্গ
দেশের হস্তশিল্পের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে পাট, যা চমৎকার একটি টেকসই বিকল্প। জটিল কিন্তু দৃষ্টিনন্দন নকশার পাটের দরজার মাদুর ও টেবিল ম্যাট আপনার ঘরে এনে দিতে পারে উষ্ণ ও শৈল্পিক ছোঁয়া।
অনেক সময় রঙ করা কিংবা রঙিন পুঁতি ও পাথরে সাজানো পাটের ঝুড়ি, গয়নার বাক্স, দোলনা ও দেয়াল সাজানোর সামগ্রী সঠিকভাবে ব্যবহার করলে আপনার রুচির পরিমার্জিত প্রকাশ ঘটাবে। আড়ং আউটলেট, বেশিদেশি এবং দোয়েল চত্বরের বিভিন্ন দোকানে নানা ধরনের পাটের সামগ্রী পাওয়া যায়।

নকশিকাঁথা ও জামদানি
একসময় ভালোবাসা আর প্রয়োজনের তাগিদে মা-দাদিদের হাতে তৈরি কাঁথা হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল নকশিকাঁথা। এখন সূক্ষ্ম ও চোখে পড়ার মতো সূচিকর্মের কারণে এটি দেয়ালসজ্জার আকর্ষণীয় উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
নকশিকাঁথা ও পুরোনো জামদানি শাড়ি দুটোই সোফা বা বিছানার থ্রো হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আবার সরাসরি দেয়ালে ঝুলিয়ে সাজানো যায় যা ঘরে এনে দেয় ঐতিহ্য আর নান্দনিকতার অনন্য মেলবন্ধন।

টেরাকোটা ও মাটির শিল্প
মাটির কাছাকাছি আবহ আনতে টেরাকোটার পুতুল, ফুলদানি, ছোট বা মাঝারি আকারের মূর্তি, টব কিংবা সূক্ষ্ম খোদাই ও নকশায় সাজানো দেয়ালসজ্জা ব্যবহার করতে পারেন।
ঘরের কোণা, তাক বা টেবিলটপে মাটির তৈরি শোপিস যেমন ছোট আকারের হাঁড়িপাতিলের খেলনা কিংবা নানা পশুপাখির অবয়ব সহজেই সৌন্দর্য যোগ করতে পারে। এ ছাড়া মাটির তৈরি বাসনপত্র বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা যায়, কিংবা শুধুই সাজসজ্জার উপাদান হিসেবেও রাখা যেতে পারে।
ঢাকায় দোয়েল চত্বরে মাটির তৈরি এসব সামগ্রী পাওয়া যায়।
দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি এমন অসংখ্য অনন্য শিল্পসামগ্রীতে ভরপুর বাংলাদেশ। রিকশা, ভ্যান, সাইকেল, বেবি ট্যাক্সির ছোট ছোট মডেল বা প্রতিরূপ এখনো নানা জায়গায় ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও আগের মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা নেই, তবু তামা ও পিতলের তৈরি সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করা বাক্স, বাতি ও শোপিস এখনো কিছু রুচিশীল মানুষের ঘরে জায়গা করে নেয়।
এই নতুন করে ফিরে আসা ঐতিহ্য শুধু ব্যক্তিগত রুচি ও স্বকীয়তাই প্রকাশ করে না, বরং একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়। ঐতিহ্যের প্রশ্নে বাংলাদেশের হস্তশিল্প সবসময়ই পছন্দের শীর্ষে। এর বৈচিত্র্যময়তাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
অনুবাদ করেছেন সৈয়দা সুবাহ আলম