কেমন দেশ জাপান
তোমরা নিশ্চয়ই জাপানের নাম শুনেছ। এটাও জানো জাপানের মানুষ খুবই ভদ্র ও নম্র স্বভাবের হয়। কিন্তু, তোমরা জাপান দেশটি নিয়ে কতটুকু জানো? আজ তাহলে জাপান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নাও।
ভৌগলিক অবস্থান
জাপান এশিয়া মহাদেশের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এটি মূলত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। জাপানের প্রধান চারটি দ্বীপ হলো- হোক্কাইদো, হনশু, শিকোকু ও কিউশু। এছাড়া প্রায় চার হাজার ছোট ছোট দ্বীপ আছে জাপানে। জাপানের নিকটতম প্রতিবেশী হলো তিনটি দেশ। দেশটির উত্তরে রাশিয়ার সাইবেরিয়ান অঞ্চল, দক্ষিণে কোরিয়া ও চীন।
জাপানের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ পাহাড়। জাপানি আল্পস পর্বতমালা দেশটির বৃহত্তম দ্বীপ হনশুর কেন্দ্রস্থল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট ফুজি, এটি শঙ্কু আকৃতির আগ্নেয়গিরি। মাউন্ট ফুজিকে অনেক জাপানি পবিত্র স্থান বলে মনে করেন।
ভূমিকম্পের জন্য জাপান একটি বিপজ্জনক জায়গা। পৃথিবীর ভূত্বক গঠনকারী তিনটি টেকটোনিক প্লেট এর কাছাকাছি মিলিত হয়েছে। এগুলো প্রায়ই একে অপরকে ছাড়িয়ে যায়, ফলে ভূমিকম্প হয়। জাপানে প্রতি বছর এক হাজারেরও বেশি ভূমিকম্প আঘাত হানে। জাপানে প্রায় ২০০টি আগ্নেয়গিরি আছে। যার মধ্যে ৬০টি সক্রিয়।
মানুষ ও সংস্কৃতি
জাপানিরা কঠোর পরিশ্রমী হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত। এখানকার মানুষের ছোট থেকে বিভিন্ন ধরনের আদবকেতা শেখা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো- বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানো। ফলে, জাপানের শিশুরা নিজের প্রয়োজন নিয়ে কম চিন্তা করে। তারা পরিবার ও দেশের জন্য যা ভালো তাই করতে শেখে।
জাপানি খাবার অন্যান্য দেশের চেয়ে আলাদা। তারা ভাত, মাছ ও শাকসবজি খায়। কিন্তু, মাংস অনেক কম খায়। তারা চর্বিযুক্ত খাবার কম খায় এবং তাদের ডায়েট খুবই স্বাস্থ্যকর। ফলে, তারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে বেশিদিন বাঁচে। মানে জাপানের মানুষের গড় আয়ু বেশি।
প্রকৃতি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি জাপানিদের গভীর আবেগ আছে। প্রাচীন শিন্টো ধর্মীয় মত অনুসারে, পাহাড়, জলপ্রপাত ও বনের নিজস্ব আত্মা আছে। জাপানের বেশিরভাগ অংশ গ্রামাঞ্চল। কিন্তু, ছোট এই দেশটিতে একশ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বসবাস করে। ফলে, কিছু বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশটিতে এখন পরিবেশ দূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সড়ক নির্মাণ ও অন্যান্য কাজের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ক্ষতি হয়েছে। জাপানে প্রায় ১৩৬টি প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে, জাপানের চারপাশের সমুদ্র মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীতে সমৃদ্ধ।
সরকার ও অর্থনীতি
জাপান বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে একজন সম্রাট রাজত্ব করেন। সম্রাটের প্রকৃত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এখনো দেশের ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সম্মানিত হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জাপানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু, জাপানিদের কঠোর পরিশ্রম ও নানান উদ্ভাবন দেশটিকে বদলে দিয়েছে। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। জাপানের হাইটেক শিল্প বিশ্বের জনপ্রিয় কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি করে।
ইতিহাস
জাপানে প্রথম মানুষের পা পড়েছিল প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে। তখন জাপানের মূল ভূখণ্ড সাইবেরিয়া ও কোরিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। মূল ভূখণ্ড শুকনো থাকায় মানুষ পায়ে হেঁটে পার হতেন। সেখানে প্রথম সমাজ ব্যবস্থা জোমন সংস্কৃতি নামে পরিচিত। এটি প্রায় ১২ হাজার বছর আগে উদ্ভূত হয়েছিল। প্রায় একই সময়ে সাইবেরিয়া থেকে নৌকায় করে সেখানে আইনু জনগোষ্ঠী আসে।
জোমন ও আইনু হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে ছিল। তারা শিকার, মাছ ধরা এবং উদ্ভিদ সংগ্রহ করত। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে কোরিয়া ও চীন থেকে হনশু দ্বীপে ইয়ায়োই সম্প্রদায়ের মানুষেরা আসে। তারা ছিল দক্ষ তাঁতি ও কৃষক। তারা সেখানের উর্বর জমিতে ধান চাষ শুরু করে।
৬৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জাপানের প্রথম সম্রাট জিম্মু তেনো ক্ষমতায় আসেন। সম্রাটরা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জাপান নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এরপর শোগুন নামে পরিচিত সামরিক শাসকরা জাপানের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং দেশটি শাসন করেন।
১৫৪৩ সালে ইউরোপীয়রা প্রথম জাপানে আসেন। ১৬৩৫ সালে শোগুন শাসকরা জাপানে বিদেশিদের আসা বন্ধ করে দেয় এবং জাপানিদের বিদেশ ভ্রমণ করতে নিষেধ করে। এই নিয়ম ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চালু ছিল। ১৮৬৮ সালে শোগুনদের উৎখাত করে আবার ক্ষমতায় আসেন সম্রাটরা। এটি জাপানের জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এরপর থেকে জাপানের আধুনিকীকরণ শুরু হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৭) জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যুদ্ধ করে। কিন্তু, ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান পার্ল হারবারে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরে বোমা বর্ষণ করে। ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের সামরিক নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯৪৫ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এতে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর কিছুদিন পর জাপান আত্মসমর্পণ করে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি