নেকড়ে কেন রাতে বের হয়?

রবিউল কমল
রবিউল কমল

উত্তর পোল্যান্ডের ৪২৫ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে পরিচালিত একটি বড় মাঠ-গবেষণায় দেখা গেছে, নেকড়েরা তাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় মানুষকে।

আর্থ ডট কমের প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষকেরা বনজুড়ে ক্যামেরা ও স্পিকার বসিয়েছিল। নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে কোনো বন্যপ্রাণী চলাচল করলেই এগুলো সক্রিয় হত। সেখানে শান্ত স্বরে মানুষের কণ্ঠ বেজে উঠলে দেখা যায়, নেকড়েরা অন্য যেকোনো শব্দের চেয়ে মানুষের কণ্ঠ শুনে দ্রুত পালিয়ে যায়।

মানুষের প্রতি নেকড়ের ভয় নিয়ে গবেষণা

ওই গবেষণার প্রধান গবেষক ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির লিয়ানা জানেট ও তার সহকর্মীরা এই গবেষণার পরিকল্পনা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, নেকড়েদের ভয় পরিমাপ করা।

তারা তিন ধরনের শব্দের প্রতিক্রিয়া তুলনা করেন। এগুলো হলো যথাক্রমে, মানুষের কথা, কুকুরের ঘেউ ঘেউ ও পাখির ডাক।

এটি ছিল এক ধরণের শব্দ-প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা। এই পদ্ধতিতে প্রাণীর আচরণ বোঝার জন্য রেকর্ড করা শব্দ বাজানো হয়। যন্ত্রগুলোতে প্রাণী থেকে প্রায় ৩৩ ফুট দূরে এই শব্দ বেজে উঠত। তারপর প্রাণীরা পালাল কি না ও কত দ্রুত পালাল তা ক্যামেরায় রেকর্ড হত।

গবেষণার স্থান ছিল বনের ২৪টি সংযোগস্থল। শত শত পরীক্ষার পর দেখা যায়, নেকড়েরা মানুষের কণ্ঠ শুনে দ্রুত পালিয়ে যায়।

একইভাবে হরিণ ও বন্য শূকরও মানুষের কণ্ঠ শুনে সবচেয়ে বেশি ও দ্রুত পালিয়েছে। সাধারণত নেকড়েরা রাতে এই প্রাণী শিকার করে।

কেন নেকড়েরা মানুষকে ভয় পায়

আর্থের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ হলো প্রকৃতির এক 'সুপার শিকারি'। কারণ অন্য যে কোনো শিকারির চেয়ে মানুষ অনেক বেশি হারে প্রাণী শিকার বা হত্যা করে।

বিশ্বব্যাপী জরিপে দেখা গেছে, মানুষ অন্যান্য শিকারির তুলনায় দ্রুত অনেক বেশি প্রাণী হত্যা করে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় করা আরেক গবেষণায় দেখা যায়, পুমা (মাউন্টেইন লায়ন) কুকুরের নয়, বরং মানুষের কণ্ঠ শুনে শিকার ফেলে পালায়।

এসব উদাহরণ দেখায়, কেন নেকড়েরা মানুষের কণ্ঠকে তাৎক্ষণিক বিপদ হিসেবে দেখে। কারণ বিবর্তন থেকে তারা শিখেছে, ভুল করলে মৃত্যু হতে পারে, তাই সাবধানতাই বুদ্ধিমানের কাজ।

wilf2.jpg
রয়টার্স ফাইল ফটো

রাত্রিকালীন জীবন তাদের নিরাপদ রাখে

গবেষকেরা নেকড়ের দিন ও রাতের জীবনযাপন অনুসরণ করেছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, মানুষ দিনে বনে যায়, আর নেকড়েরা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে। এই আচরণকে বলে নকচারনালিটি বা রাত্রিকালীন অভ্যাস বা নিশাচর স্বভাব।

একটি মহাদেশব্যাপী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যদি মানুষের উপস্থিতি কম থাকে, তাহলে নেকড়েরা দিনে সক্রিয় হয়।

এই নতুন গবেষণায় দেখায়, একই অঞ্চলে নেকড়ে ও তাদের শিকার প্রাণী উভয়ই মানুষের চেয়ে বেশি নিশাচর। অর্থাৎ মানুষের উপস্থিতি তাদের রাতের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এটি তাদের শক্তি ব্যবহার, শিকার করার সুযোগ, এমনকি মানসিক চাপের ওপরও প্রভাব ফেলে।

গবেষণা বলছে, রাতে তাদের চলাফেরা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় পুরো ইকোসিস্টেমের কার্যপ্রণালিও বদলে যায়।

মানুষ ও নেকড়ে নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেক আলোচনায় দাবি করা হয়, নেকড়েরা নাকি এখন আর মানুষকে ভয় পায় না।

ইউরোপীয় কমিশনের এক প্রতিবেদনে মানুষের আশপাশে নেকড়ের উপস্থিতি বেড়েছে।

কিন্তু প্রধান গবেষক জানেট বলেন, 'ইউরোপীয় ইউনিয়নে যখন নেকড়ে সুরক্ষায় কঠোর আইন ছিল, তখনও মানুষ আইনসম্মত বা বেআইনিভাবে তাদের হত্যা করেছে। আর সেই হার ছিল প্রাকৃতিক মৃত্যুর হারের ৭ গুণ বেশি।'

তার মানে নেকড়েরা এখনো মানুষকে ভয় পায়। তবে মানুষের আশপাশে তাদের উপস্থিতি বাড়ার মানে এই নয় যে, তাদের ভয় কমেছে।

বিজ্ঞান দেখায়, তারা এখনো মানুষকে ভয় পায়। তারা কেবল খাবারের জন্য কখনো কখনো ঝুঁকি নেয়। এজন্য মানুষের আশপাশে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে।

নেকড়ে বেড়েছে কেন

আর্থের প্রতিবেদনে বলা হয়, বহু বছর পর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক এলাকায় আবারও নেকড়ে ফিরে এসেছে। আর বেশি নেকড়ে মানে মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। এমনকি তারা ভয় পেলেও।

এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো খাবার। কারণ কখনো কখনো মানুষ নিজেই তাদের খাবারের সুযোগ তৈরি করে দেয়। যেমন আবর্জনা, মৃত পশু বা পোষা প্রাণীর খাদ্য। এগুলো নেকড়েকে গ্রামে বা খামারের দিকে টেনে আনে।

এই গবেষণা স্পষ্ট করেছে, নেকড়ে মানুষের কণ্ঠ শুনলে পালায়। কিন্তু খাবারের সন্ধান পেলে তারা সেই ভয় উপেক্ষা করে মানুষের আশপাশে থাকে। অর্থাৎ নেকড়েরা খাবারের জন্য ঝুঁকি নিয়ে থাকে।

wolf1.jpg
রয়টার্স ফাইল ফটো

গবেষণার পরিকল্পনা ও ফলাফল

গবেষক দলটি প্রতিটি শব্দের আওয়াজের মাত্রা ও শুরু হওয়ার সময় নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এর ফলে তারা প্রাণীরা শুধু শব্দ শুনছে কি না তা নয়, বরং তারা শব্দের মানে বা ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা কতটা ব্যবহার করছে, সেটিও যাচাই করতে পেরেছেন।

এই গবেষণায় কুকুরের শব্দও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারণ কুকুর ও নেকড়ের পূর্বপুরুষ একই এবং কুকুরের উপস্থিতিকে ঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফলাফল দেখায়, মানুষের কণ্ঠ কুকুরের চেয়ে অনেক বেশি ভয় ধরায়। এটি আগের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ওপর করা পরীক্ষাগুলোর ফলাফলের সঙ্গেও মিলে যায়।

একই জায়গার ভেতরে পাশাপাশি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সব ক্ষেত্রেই ভয় পাওয়ার ধরন একই ছিল। অর্থাৎ নেকড়ে ও অন্যান্য প্রাণী সবচেয়ে ভয় পেয়েছে মানুষকে, তারপরে কুকুর, তারপর পাখির শব্দ।

এই গবেষণার ফলাফল বলছে, ভয় পাওয়ার বিষয়টি কেবল শিকার প্রাণীর আচরণ বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না, বরং মানুষের উপস্থিতিই প্রাণীদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের উৎস।

অর্থাৎ, বন ব্যবস্থাপনা বা প্রাণী সংরক্ষণ নীতিতে এটি বোঝা জরুরি যে, নেকড়ে (এবং অন্যান্য প্রাণী) মানুষের প্রতি স্বাভাবিকভাবে ভীত। এই ভয় তাদের আচরণ ও পরিবেশের ভারসাম্যে বড় ভূমিকা রাখে।

গত ২০ অক্টোবর কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।