মঙ্গল গ্রহ লাল কেন

আমরা জানি মঙ্গল গ্রহ লাল। এ কারণে মঙ্গলকে ‘রেড প্ল্যানেট’ ডাকা হয়। কিন্তু মঙ্গল গ্রহ এত লাল কেন? শত শত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই লাল রঙের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। এতদিন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা ছিল, হেমাটাইটের কারণ মঙ্গল গ্রহ লাল। হেমাটাইট মূলত একটি লৌহ-অক্সাইড খনিজ।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে শুরু হওয়া ‘অ্যামাজোনিয়ান যুগে’ মঙ্গলের পৃষ্ঠ ছিল অত্যন্ত শুষ্ক। তখন পানিশূন্য পরিবেশে শিলার দীর্ঘমেয়াদি অক্সিডেশন ও ক্ষয়ের ফলে হেমাটাইট তৈরি হয়।

পৃথিবীতে যেমন লোহার ওপর মরিচা পড়ে লালচে হয়ে যায়, তেমনি মঙ্গল গ্রহের মাটিতেও দীর্ঘ সময় ধরে অক্সিজেনের প্রভাবে লৌহ-অক্সাইড তৈরি হয়ে পুরো গ্রহটি লাল রঙ ধারণ করেছে। আর এটাই ছিল বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ব্যাখ্যা।
কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এই তত্ত্ব মোটেও এতটা সহজ নয়।

সম্প্রতি একদল গবেষক বিভিন্ন মহাকাশযানের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ভিন্ন এক ফলাফল পেয়েছেন। তারা তথ্য নিয়েছেন নাসার মার্স রিকনেসান্স অরবিটার, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মার্স এক্সপ্রেস ও এক্সোমার্সসহ বিভিন্ন মিশন থেকে। পাশাপাশি এই বিশ্লেষণে নাসার মঙ্গল রোভারগুলোর পরিমাপও যুক্ত করা হয়েছে।

এই গবেষণায় উঠে এসেছে একটি নতুন খনিজ, যার নাম ফেরিহাইড্রাইট। এটি পানি-সমৃদ্ধ একটি ফেরিক অক্সিহাইড্রোক্সাইড।
গবেষকরা দেখেছেন, মঙ্গলের ধূলিকণায় এই ফেরিহাইড্রাইট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। এমনকি মাটির নিচের শিলাস্তরেও এর উপস্থিতি থাকতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

তারা দাবি করেছেন, মঙ্গলের লাল রঙের পেছনে এই খনিজই প্রধান ভূমিকা রাখছে।

এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে মঙ্গলের মতো একটি কৃত্রিম খনিজ মিশ্রণ তৈরি করেন। এতে ছিল ব্যাসাল্ট ও ফেরিহাইড্রাইট।

এই মিশ্রণের ওপর পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি মহাকাশযান থেকে পাওয়া তথ্যের চেয়ে (হেমাটাইট) বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, এতদিন যে হেমাটাইটের কথা বলা হচ্ছিল, তা হয়তো পুরো ব্যাখ্যা নয়।

অবশ্য ফেরিহাইড্রাইট তৈরিতে লৌহের সঙ্গে বিক্রিয়া করার মতো অক্সিজেন ও পানি প্রয়োজন হয়। তবে আজকের মঙ্গল অত্যন্ত শুষ্ক ও ঠাণ্ডা। আর সেখানে পানি প্রায় নেই বললেই চলে। তাহলে ফেরিহাইড্রাইট কীভাবে উৎপন্ন হবে? গবেষকরা বলছেন, অতীতে হয়তো মঙ্গলে অক্সিজেন ও তরল পানি ছিল।

আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো পৃথিবীতে ফেরিহাইড্রাইট খুব দ্রুত আয়রন অক্সাইডে পরিণত হয়। কিন্তু মঙ্গলের ঠাণ্ডা ও শুষ্ক পরিবেশে একবার তৈরি হলে তা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।

যদি নতুন এই ব্যাখ্যার সঙ্গে অন্য বিজ্ঞানীরা একমত হন, তাহলে মঙ্গল সম্পর্কে আমাদের ধারণায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এটাই চূড়ান্ত নয়। কারণ মহাকাশ নিয়ে প্রতিনিয়ত নানান গবেষণা হচ্ছে। সামনে হয়তো আরও নতুন নতুন তত্ত্ব আমাদের সামনে হাজির হবে।

  • সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস