যুক্তরাষ্ট্রের চাপ স্বত্ত্বেও কেন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালু রেখেছে আমিরাত?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের পুরোনো বাজারের দোকানগুলোতে এখনো ইরান থেকে আসা জাফরান, জিরা, পেস্তা ও কাঠবাদামে ভরপুর। দেখে বোঝার উপায় নেই—উপসাগরের দুই প্রান্তের এই দুই দেশ এখন যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে এবং গত ১৮ আগস্ট মার্কিন মিত্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে।

বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুবাইয়ের পুরোনো বাজারে বহু বছর ধরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন ইরানি ব্যবসায়ীরা। সেখানে কেউ মনে করছেন না যে আমিরাতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাই ও দক্ষিণ ইরানের মধ্যে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এত সহজে ভেঙে যাবে।

মুদি দোকানি মোরতেজা আসাদি এএফপিকে বলেন, ‘১৯৬৩ সালে আমার বাবা এই পুরোনো বাজারে দোকানটি দেন। যুদ্ধ শুরুর পর কিছু ইরানি পণ্য বাজারে কম পাওয়া যাচ্ছে এটা সত্যি এবং কয়েকটির দামও বেড়েছে।’

তবে বাদাম ও পার্সিয়ান রান্নায় ব্যবহৃত ছোট লাল ফল জেরেশকের মতো বেশিরভাগ ঐতিহ্যবাহী পণ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

আসাদি বলেন, ‘পণ্য আসছে। কীভাবে আসছে? আমি জানি না। কিন্তু আসছে।’

দুবাইয়ে ইরানের মসলার দোকান। ছবি: এআইয়ে সহায়তায় তৈরি

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দুই পাইকারি ব্যবসায়ী এএফপিকে জানান, ওমান বন্দর ব্যবহার করে ইরান থেকে পণ্য কিনছেন তারা।

একজন বলেন, ‘আমরা এখন আর আমিরাত থেকে সরাসরি রপ্তানি করতে পারছি না। তবে কিছু পণ্য এখনো আনা সম্ভব হচ্ছে।’

ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদ থেকে আকাশপথে জাফরানের মতো মূল্যবান মসলা দুবাইতে আনা হচ্ছে বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।  

ইরান ও আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক

প্রতিবেদনে বলা হয়, দুবাইয়ে কয়েক লাখ ইরানি বসবাস করেন। আমিরাতের বাণিজ্যিক বিকাশে তাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। তেহরানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন।

ছবি: সংগৃহীত

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের’ গবেষণা ও কর্মসূচি বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক মেহরান হাগিরিয়ান বলেন, ‘২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও দুবাইয়ের ব্যবসায়ীরা আবুধাবিকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া কেন দরকার।’

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির ৩০ শতাংশের বেশি আমিরাতের মাধ্যমে এসেছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজারও ছিল ইউএই। ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ১২ শতাংশ এসেছে ইউএই থেকে। যার মূল্য ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

নিষেধাজ্ঞা কাজ করছে না যেসব কারণে

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানের আর্থিক লেনদেন চালানোর নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দুবাই।

তাই ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গত মাসের শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা অংশীদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরই অংশ হিসেবে দুবাইয়ে ইরানের ব্যাংক মেল্লির শাখার পরিচালকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ব্যাংকটি এখনো গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। নাম না প্রকাশের শর্তে ব্যাংকের এক কর্মী এএফপিকে বলেন, ‘আমরা তো বহু বছর ধরেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছি।’

দুবাই। ছবি: রয়টার্স

মেহরান হাগিরিয়ানের মতে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিতের ঘোষণা মূলত তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখা।  

তবে এর ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ নাও হতে পারে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।

দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হলে দুবাইয়ের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।

হাগিরিয়ান বলেন, ‘হঠাৎ করে সবকিছু বন্ধ করে দিলে এর প্রভাব পড়বে। অর্থনীতির একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। সেই অংশ সহজে অন্য কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।’

দুবাইয়ে ইরানি মসলার দোকান। ছবি: সংগৃহীত

যদিও সম্প্রতি দুবাইয়ের এক সম্মেলনে আমিরাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী নাসের আল-শেখ বলেছেন, ‘ইরান এখন দুবাইয়ের অর্থনীতির জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সম্পর্কটি দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক ছিল। তবে যুদ্ধের সময় অগ্রাধিকার বদলে যায়।’

দুবাইয়ের পুরোনো বাজারের মুদি দোকানি মোরতেজা আসাদি বিশ্বাস করেন, বর্তমান সংকটেও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য টিকে থাকবে।

আরব আমিরাত ও দক্ষিণ ইরানের উপকূলের মাঝে উপসাগরের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘ওখানে পানি দেখছেন? পানি পাহাড়ও ভেঙে দিতে পারে।’