নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আগাম হামলা চালানোর দাবি ইরানের
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বা দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্য খুব বেশি শোনা যাচ্ছে না। বরং তেহরানের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও অবিচল দৃষ্টিভঙ্গির নানা দিক তুলে ধরছেন দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ সেনাপতি মোহসেন রেজাই।
বর্তমানে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।
কিছুদিন আগেই জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতে যুদ্ধ কৌশল বদলাচ্ছে ইরান। তেহরান এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগে নিজেদের সীমিত রাখবে না।
সেই ধারায় গতকাল সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে রেজাই জানান, নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পেয়েছে দেশটির সেনা। এর মাধ্যমে ইরান এখন তার শত্রুদের বিরুদ্ধে আগাম হামলা চালাতে প্রস্তুত।
আজ মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
মোহসেন রেজাই ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কথা তুলে ধরে দাবি করেন, একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে ‘পরীক্ষা’ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এপি জানায়, সলিড-ফুয়েলের মাধ্যমে চালিত ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্র বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর হাতে এসেছে। তবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই সেই ‘পরীক্ষা’ চালানো হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়, এই উন্নত প্রযুক্তির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তেহরানের নতুন সামরিকনীতি তুলে ধরেছে। সেই নীতি হলো, ‘কেউ হামলার হুমকি দিলে তা বাস্তবায়নের আগেই তার বিরুদ্ধে আগাম হামলা চালাবে ইরান।’
গত শনিবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি জানায় ওয়াশিংটন। এই হামলার জবাবে ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায় মার্কিন সেনারা।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মার্কিন জাহাজে আগাম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উসকানিমূলক এবং এতে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা বেড়ে যেতে পারে।
তারা আরও বলেন, এর আগে ছয় মাসের যুদ্ধে সমুদ্রে ইরানের হামলার লক্ষ্য ছিল মূলত বাণিজ্যিক পণ্য ও তেলবাহী জাহাজ। এবারই প্রথম যুদ্ধজাহাজে সরাসরি হামলার খবর পাওয়া গেল।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় শুধু মোহসেন রেজাই নন, ইরানের পক্ষ থেকে আসা সকল বক্তব্যেই বাড়তি আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার ছাপ লক্ষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
ইরানের অন্যতম উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ‘কাসেম বাসির’কে বিবেচনা করা হচ্ছে। দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও নির্ভুলতা আগের কয়েকটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
গত বছর প্রথমবারের মতো ‘কাসেম বাসির’-এর নাম শোনা যায়। সে সময় বলা হয়েছিল, এটি অন্তত এক হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দূরে আঘাত হানতে পারবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সব আন্তর্জাতিক আইন অবজ্ঞা করে ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা চালিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই সামরিক ক্ষমতাধর দেশের এই হামলার পেছনে একাধিক কারণের অন্যতম ছিল ইরানের গতিশীল ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে রাশ টেনে ধরা। পাশাপাশি, দেশটির পরমাণু কর্মসূচিও চিরতরে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু।
তবে ওই যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো এসব লক্ষ্য পূরণের ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারেননি এই দুই নেতা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাণিজ্যে উল্টো যোগ হয়েছে বাড়তি খরচ।
গত ৬ সেপ্টেম্বর মোহসেন রেজাই ঘোষণা দেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি ‘সীমিত চলাচল’ এলাকা তৈরি করবে। এটি শুরু হবে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নৌ-অবরোধ এলাকা থেকে। সেখান থেকে এটি হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনেও বিষয়টি জানা গেছে।
রেজাই জানান, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হবে।
তবে গতকাল এই পরিকল্পনা নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস। তাদের দাবি, হরমুজের পুরো অংশই এখন উন্মুক্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র এর নিরাপত্তা দিচ্ছে।
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিটি মাইনমুক্ত করেছে এবং আগামীতে সেখানে ইরান ছাড়া অন্যান্য দেশের উদ্দেশ্যে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বাড়বে।
ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশটির বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৯৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং তিনটি জাহাজ চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েছে।



