অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনে ইসরায়েলি সেনা, ব্যাপক সমালোচনা ও বয়কটের ডাক
সাবেক এক ইসরায়েলি সেনাকে বিজ্ঞাপনে দেখিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে জার্মান ক্রীড়াপণ্য নির্মাতা অ্যাডিডাস। বিশ্বজুড়ে অ্যাডিডাসের পণ্য বয়কটের ডাক এসেছে।
আজ সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।
সম্প্রতি অ্যাম্পিউটি বা অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তিদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি এক পায়ের জন্য জুতা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের প্রচারণায় ইসরায়েলি সেনা শালেভ বিটনকে দেখানো হয়েছে। এতেই বিপত্তি দেখা দিয়েছে।
অ্যাডিডাসের ওই বিজ্ঞাপনে শালেভ বিটনকে ইসরায়েলের একটি দোকানে জুতা পরখ করতে এবং পরে সেটি পরে বাইরে দৌড়াতে দেখা যায়।
বয়কট আন্দোলনের এক সমন্বয়কারী বিজ্ঞাপনটিকে ‘ফিলিস্তিনিদের প্রতি চরম অবমাননাকর’ আখ্যা দেন।
২০২১ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় অভিযান পরিচালনার সময় আহত হন শালেভ। এতে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
ওই সময় টানা ১১ দিন ধরে অবরুদ্ধ গাজায় সামরিক অভিযান চালায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
মানবাধিকারকর্মী ও ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের কার্যকলাপের কারণে অ্যাডিডাসের বিরুদ্ধে মানুষ তাৎক্ষণিক ক্ষোভ দেখাবে এবং অনলাইনে পণ্য বয়কটের প্রচারণা শুরু করবে—এটাই স্বাভাবিক। এতে অ্যাডিডাসেরও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
দিনের পর দিন গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য ইসরায়েলকে সারা বিশ্বের কাছে ব্রাত্য করে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত সংগঠন পিএসিবিআই।
সংগঠনটি বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস (বিডিএস) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
ওই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়কারী স্টেফানি ওয়েস্টব্রুক আল জাজিরাকে বলেন, ‘এখানে বিষয়টা এমন না যে অ্যাডিডাস অন্যদের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল নয় বা পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারছে না। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা সেসব ফিলিস্তিনিদের প্রতি চরম অবমাননাকর আচরণ করেছে, যারা ইসরায়েলি হামলায় প্রিয়জন হারিয়েছেন বা নিজ দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়েছেন।’
স্টেফানি এ ধরনের প্রচারণার ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তার মতে, এসব প্রচারণা ‘ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অপরাধকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরবে এবং কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়াই তারা এগুলো চালিয়ে যেতে থাকবে।’
তিনি বর্ণনা দেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পা-হারানো ইসরায়েলি সেনার দুর্দশাকে উপজীব্য করে অ্যাডিডাস বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে গাজার নিরীহ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে গিয়ে আহত হয়েছে। সে যাদের পক্ষে যুদ্ধ লড়ছে, তারা জাতিগত নিধনে অংশ নিচ্ছে। তারা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড অবৈধভাবে সেনাদের মাধ্যমে দখল করে রেখেছে। তারা কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনমূলক শাসন চালিয়ে যাচ্ছে।’
তার মতে, এই বিজ্ঞাপনে ইসরায়েলি সেনার কুকীর্তি ছাপিয়ে ওই সেনার পা হারানোর গল্পকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃত সত্যের ভুল ব্যাখ্যা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরের শুরুর দিকেই গাজায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার ফিলিস্তিনি মানুষ অঙ্গচ্ছেদের শিকার হয়েছেন। এটি ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করার আগের তথ্য।
দুই বছরের সংঘাতে গুরুতর আঘাত পাওয়া ৪২ হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে তারাও অন্যতম।
যুদ্ধবিরতির প্রায় এক বছর পরও গাজায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রয়ে গেছে।
এর মূল কারণ, ইসরায়েল এখনো গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপনে ওই সেনাকে আবার রাস্তায় ব্যায়াম করতে ও দৌড়াতে দেখা যায়।
অপরদিকে, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন।
শত শত উদীয়মান ফুটবলার তাদের অঙ্গ হারিয়েছেন। তারা অঙ্গহারা ফুটবল দল গঠন করে নিজেদের কষ্টের মধ্যেও খেলাধুলার মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে নিচ্ছেন।
মাসের পর মাস স্বজন হারানো, আহত হওয়া এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও এসব খেলোয়াড় টিকে থাকার অবলম্বন হিসেবে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে আছেন এবং তাদের আগের জীবনের কিছুটা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তারকারাও অ্যাডিডাসকে বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিত স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে বয়কটের প্রচারণা তুলে ধরে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফিলিস্তিনি লেখক সুসান আবুলহাওয়া, পাকিস্তানি লেখক ফাতিমা ভুট্টো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনিরাও অ্যাডিডাসের পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন।
অধিকারকর্মী ওয়েস্টব্রুক গাজায় ইসরায়েলের অবরোধের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
ইসরায়েলি হামলায় ভূখণ্ডটির চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হওয়ার পরও এই অবরোধের কারণে গাজায় ওষুধ ও কৃত্রিম অঙ্গ প্রবেশ করতে পারছে না।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে গাজায় অঙ্গচ্ছেদের শিকার হওয়া মানুষের এক-চতুর্থাংশই শিশু।
মাথাপিছু শিশু অঙ্গহারা হওয়ার সংখ্যার হিসাবে গাজা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থান।
ওয়েস্টব্রুক বলেন, ইসরায়েল ‘গাজার স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে’, যার ফলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবায় চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অঙ্গহারা মানুষকে সহায়তা দিতে গাজায় কৃত্রিম অঙ্গ প্রবেশেও বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল, যার ফলে একটি ‘মানবসৃষ্ট’ সংকট তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪২ হাজার ফিলিস্তিনি গুরুতর আঘাতের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ হাজারই শিশু।

