হিমবাহ হ্রদের পানি কমিয়ে কি বন্যা ঝুঁকি কমানো সম্ভব? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
হিমবাহ ধস থেকে প্রাকৃতিক হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঘটনা নেপালে এই প্রথম ঘটেনি। এর আগে ২০১২ সালেও হিমালয় রেঞ্জের অন্নপূর্ণা-৪ থেকে বরফ-পাথরের বিশাল ধসের পর প্রাকৃতিক হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল।
২০২৩ সালে ভারতের সিকিমের উত্তরের দক্ষিণ লোনাক হ্রদে বিস্ফোরিত হয়েও একই রকম আকস্মিক বন্যা ঘটেছিল।
তবে গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া বন্যা ও ভূমিধস দেখিয়েছে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানান, ওই দিন নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতার হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। বরফের ওই অংশ প্রায় ৪ হাজার ফুট নিচে পড়ে এবং পাহাড়ের ঢাল ক্ষয় করে দ্রুত নিচে নেমে এসে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
How did a mudslide hit Gyirong Port on the China-Nepal border in southwest China's Xizang Autonomous Region? pic.twitter.com/03FwjncUUz
— China Xinhua News (@XHNews) August 29, 2026
চীনা ভূতত্ত্ববিদের মতে, ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে নিচে নেমে আসে ধ্বংসাবশেষের স্রোত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গ্রামের পর গ্রাম।
হিমালয় রেঞ্জে হিমবাহ ধসে বন্যার কারণে কেবলমাত্র নেপাল নয়, ভাটিতে থাকা ভারত-বাংলাদেশও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এসব ধারাবাহিক দুর্যোগ একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে—আগামীতে কীভাবে এ ধরনের ধস ও বন্যা ঝুঁকি কমানো যায়?
হিমবাহ ধস ও বন্যা ঝুঁকি কমাতে নেপাল সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে—নেপালের সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হয়েছে। একইসঙ্গে এই উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে কতটা কাজে আসবে তাও বিশেষজ্ঞের বরাতে বলা হয়েছে।
যা করছে নেপাল সরকার
২৬ আগস্টের ঘটনার পর ভোতেকোশি ও গণ্ডকী অববাহিকার উজানে থাকা চারটি হিমবাহ হ্রদের পানির স্তর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার।
চারটি হ্রদ হলো—সোলুখুম্বুর লুমডিং সো, হোঙ্গু-২, সংকুয়াসভার লোয়ার বারুন ও মানাংয়ের থুলাগি।
২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক যৌথ গবেষণায় এই চার হ্রদকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে, এমন ৪৭টি হ্রদ আছে সেগুলো থেকে হঠাৎ পানি নেমে এসে নেপাল, তিব্বত ও ভারতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এগুলো ২১টি নেপালের সীমানায় পড়েছে।
গবেষকরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্প ও ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে যেকোনো সময় এসব হ্রদ ভেঙে বন্যা হতে পারে।
এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি হ্রদের পানি কমানো হয়েছে। ২০০০ সালে দোলখার থো রোলপা হ্রদের পানি তিন মিটার এবং ২০১৬ সালে সোলুখুম্বুর খুম্বু অঞ্চলের ইমজা হ্রদের পানি প্রায় ৩ দশমিক ৪ মিটার কমানো হয়।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পর বাকি হ্রদগুলোর বিষয়ে কী করা হবে, সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন প্রকল্পে কী আছে
বন্যা ঝুঁকি কমাতে নেপাল সরকারের নেওয়া নতুন প্রকল্পটির নাম ‘গ্লফ বা জিএলওএফ সঞ্জীবনী প্রকল্প’। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ (ডিএইচএম) ও ইউএনডিপি যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে।
৫ কোটি ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ভোতেকোশি ও গণ্ডকী অববাহিকায় থাকা চারটি হ্রদ থেকে পানি সরিয়ে ঝুঁকি কমানো।
জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে প্রকল্পটিতে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলার অনুদান দেওয়া হচ্ছে। নেপাল সরকার ও অংশীদার সংস্থাগুলো আরও ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার সংগ্রহ করবে।
এর ফলে পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ২৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে ডিএইচএম।
প্রকল্পটির জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক রাজন ভট্টরাই বলেন, ‘এ বছর নির্মাণকাজ শুরু হবে না। নকশা চূড়ান্ত করব আমরা।’
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের কাজের মধ্যে রয়েছে পরামর্শক নিয়োগ এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ।
চারটি হ্রদের পানির স্তর কতটা কমানো হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ভট্টরাই বলেন, ‘এ বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে থো রোলপা ও ইমজায় যতটা পানি কমানো হয়েছিল, প্রায় ততটাই কমানো হবে।’
উল্লেখ, ওই দুই হ্রদের পানির স্তর তিন মিটার করে কমানো হয়।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেজ্ঞদের আপত্তি মূলত তিন মিটারের মানদণ্ড নিয়ে।
তারা জানান, থো রোলপা ও ইমজা হ্রদের পানি গবেষণার ভিত্তিতে নয়, বরং বাজেটের ওপর নির্ভর করে কমানো হয়েছিল।
এ বিষয়ে মার্কিন পর্বত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অ্যালটন সি. বায়ার্স বলেন, ‘তিন মিটার কমানোর ধারণাটি থো রোলপাকে ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। এটি যথেষ্ট নয়। থো রোলপার মূল পরিকল্পনা পানির স্তর সর্বোচ্চ ২০ মিটার কমানোর কথা ছিল। কিন্তু বাজেটের কারণে তিন মিটারে কাজ থেমে যায়।’
তার মতে, থো রোলপাকে মানদণ্ড ধরে ইমজার পানিও মাত্র তিন মিটার কমানো হয়েছিল।
বায়ার্সের মতে, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী হ্রদের পানি কমানো হলেও ভাটিতে থাকা জনবসতিগুলো নিরাপদ হবে না।
যদিও নেপালের ডিএইচএমের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পরাজুলি বলেন, ‘সামান্য হলেও পানির স্তর কমালে হঠাৎ পানি বের হয়ে আসার ঝুঁকি কমে।’
তিনি জানান, ভৌগোলিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে এ ধরনের কাজে খরচ অনেক বেশি।
বায়ার্সও এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন। তবে তার মতে, ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে এমন একটি মাত্রা নির্ধারণ করা ঠিক নয়, যা ঝুঁকি কমাতেই পারবে না।
তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি সত্যিকার অর্থে কমানোর মতো পর্যায়ে পানি নামাতে হবে। তা না হলে এটা হবে অর্থের অপচয়।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেন্টার ফর ওয়াটার রিসোর্সেস স্টাডিজের গবেষক নিতেশ খাডকা বলেন, ‘একটি হ্রদের পানি দুই বা চার মিটার কমাতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে খুব বেশি লাভ হবে না। এতে নিচের দিকে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। হ্রদের পানি কমাতে হলে তা যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে হবে, যাতে নিচের দিকে অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো যায়।’
এ বিষয়ে বায়ার্স বলেন, ‘প্রতিটি হ্রদের জন্য আলাদা করে গবেষণা করে নির্ধারণ করতে হবে কতটা পানি কমানো প্রয়োজন।’
তার মতে, নেপালের ২১টি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের নতুন করে স্যাটেলাইট ও রিমোট সেন্সিং তথ্য সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ে মূল্যায়ন, গভীরতা ও পানির পরিমাণ নির্ণয় করা দরকার।
এরপর কম, মাঝারি ও বেশি মাত্রার পানি প্রবাহে কী ধরনের বন্যা হতে পারে, তার মডেল তৈরি করতে হবে। সেই অনুযায়ী, হ্রদের পানি কমানো, হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ শক্তিশালী করা কিংবা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুধু পানি কমালেই হবে না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থো রোলপা ও ইমজার পানি কমানো হলেও হ্রদ দুটি এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
মার্কিন হিমবাহ বিশেষজ্ঞ জেফরি এস. কারগেল বলেন, ‘হ্রদ থেকে পানি বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। এতে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পানির স্তর কমানোর পাশাপাশি ভাটিতে থাকা জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামোর ঝুঁকি নিয়েও ভাবতে। হিমবাহ থেকে বন্যার সম্ভাব্য পথে অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।
নেপাল ও ভারতের কিছু স্থানে এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা নেওয়া হয়নি বলে মনে করেন এই মার্কিন বিশেষজ্ঞ।
তার মতে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ স্থান বেছে নেওয়া উচিত। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
নজর দিতে হবে ছোট হ্রদগুলোর দিকেও
নেপালে হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ বিশেষজ্ঞ রিজন ভক্ত কায়াস্থের মতে, শুধু বড় হ্রদগুলোই বিপজ্জনক, এমন ধারণা ভুল।
তিনি বলেন, ‘হ্রদের পানি কমানো আর ঝুঁকি দূর করা এক বিষয় নয়। নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর বেশিরভাগ নিয়ে এখনো গবেষণা হয়নি।’
নেপালের আরও শত শত ঝুঁকিপূর্ণ ছোট হ্রদ রয়েছে বলে জানান তিনি।
কায়াস্থ আরও বলেন, ‘ঝুঁকি শুধু হিমবাহ হ্রদ থেকেই আসে এমন নয়, হিমবাহও একইভাবে বিপজ্জনক।’
এ অবস্থায় তালিকাভুক্ত হ্রদের বাইরে অন্য ছোট হ্রদগুলোও মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।