ভেড়ার লোমে হিমবাহের গলন ঠেকানো সম্ভব?
সুইজারল্যান্ডে দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসা হিমবাহ রক্ষায় নানা উপায় খুঁজছেন গবেষকেরা। এরইমধ্যে আল্পস পর্বতমালায় চলছে ব্যতিক্রমী এক পরীক্ষা।
রয়টার্স জানিয়েছে, কম মূল্য পাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ ভেড়ার লোম ব্যবহার করে হিমবাহের গলন ঠেকানো যায় কি না, তা পরীক্ষা করছেন বিজ্ঞানীরা।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বরফ গলে যাওয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে আল্পসের উচ্চভূমির ভূদৃশ্যের অংশ হয়ে থাকা হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে গ্রীষ্মকালে হিমবাহের বরফ ও তুষারের ওপর কৃত্রিম ত্রিপল বিছিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করা এবং তাপ শোষণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এসব ত্রিপল সাধারণত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেখান থেকে দূষণকারী মাইক্রোফাইবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ‘কিপ ইট উল’ প্রকল্পের অধীনে পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সামিট ফাউন্ডেশন ও ইউনিভার্সিটি অব লসানের গবেষকরা পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের তসানফ্লেরোঁ হিমবাহের গলন ধীর করতে উল ব্যবহার করছেন।
এ বছরের রেকর্ড তাপপ্রবাহে হিমবাহগুলোর তুষার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক সপ্তাহ আগেই গলে গেছে। এতে বরফের ক্ষয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার কারণে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ে।
২০২৫ সালে ব্লাটেন গ্রাম ধ্বংসকারী ভয়াবহ ভূমিধস এবং গত সপ্তাহে হিমালয়ে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়কর আকস্মিক বন্যার মতো ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক তিমোথি স্টেইনার বলেন, দলটি এমন একটি জৈব অবক্ষয়যোগ্য বিকল্প নিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছে, যা একইসঙ্গে সুইজারল্যান্ডের অব্যবহৃত উলকেও কাজে লাগাতে পারে। দেশটিতে প্রতিবছর উৎপাদিত ভেড়ার উলের ৪০ থেকে ৭০ শতাংশই ফেলে দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স পর্যায়ের চার শিক্ষার্থী এই পরীক্ষার ধারণা দেন এবং তা বাস্তবায়নে কাজ করেন।
জুন মাসে সুইস প্রতিষ্ঠান ফিসোলানের তৈরি দুটি পরীক্ষামূলক উলের চাদর তসানফ্লেরোঁ হিমবাহের ২০০ বর্গমিটার (দুই হাজার ১০০ বর্গফুট) এলাকায় বিছিয়ে দেওয়া হয়। পুরো গ্রীষ্মজুড়ে গবেষকরা প্রচলিত কৃত্রিম জিওটেক্সটাইল আচ্ছাদনের সঙ্গে উলের চাদরের কার্যকারিতা তুলনা করেন।
প্রাথমিক ফলাফল প্রত্যাশার চেয়েও ভালো এসেছে। স্টেইনার জানান, প্রতি দুই সপ্তাহে নেওয়া পরিমাপ থেকে দেখা গেছে, উলের চাদরও কৃত্রিম আচ্ছাদনের মতোই বরফ গলার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে।
ফিসোলানের কর্মকর্তা নিকলাউস সেগেসার উলের স্থায়িত্ব দেখে বিস্মিত হয়েছেন। তিনি বলেন, শুরুতে তার ধারণা ছিল উপাদানটি হয়তো যথেষ্ট স্থিতিশীল হবে না।
শিক্ষার্থী এলিয়ট গাফিও বলেন, দলটি শুরুতে ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। এখন তারা এমন একটি ফল পেয়েছে, যা চোখে দেখা এবং হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। তার ভাষায়, এটি ‘অবিশ্বাস্যভাবে ভালো’ কাজ করেছে।
তবে প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা জোর দিয়ে বলছেন, উলের চাদর বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কোনো সমাধান নয়।
সুইজারল্যান্ডের মোট হিমবাহ এলাকার মাত্র প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য দুই শতাংশে প্রতিরক্ষামূলক আচ্ছাদন ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের ক্ষয় ধীর করার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো। এসব গ্যাসের প্রধান উৎস জীবাশ্ম জ্বালানি।
