১০০ বছর ভেনেজুয়েলার তেল তুলবে যুক্তরাষ্ট্র, কার লাভ কার ক্ষতি

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেল রপ্তানি নিয়ে এক নজিরবিহীন চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছে ভেনেজুয়েলা।

গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেসের সঙ্গে এমন এক চুক্তি করেছেন, যার ফলে তার দেশ ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল (৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল) তেলের নিয়ন্ত্রণ নেবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিদিন দেশটি ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ব্যারেল। এর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল যুক্ত হলে মোট পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ১১১ বিলিয়ন ব্যারেল।

দেশজুড়ে সমালোচিত হলেও এই চুক্তির স্বপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন দেশটির নেতা দেলসি রদ্রিগেস। এর সুফলের অন্ত নেই—এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।

চুক্তি সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ পায়নি। তবে সার্বিকভাবে এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। এতে ১৭টি তেলক্ষেত্র থেকে জ্বালানি উত্তোলনে ১০০ বছর ছাড় পাবে যুক্তরাষ্ট্র।

এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, সৌদি আরবের আরামকো ছাড়া এ মুহূর্তে আর কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এত বড় তেলের উৎস নিয়ন্ত্রণ করে না।

প্রায় আট মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্স ভেনেজুয়েলার তৎকালীন শাসক নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। সে সময় ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আভাস দিয়েছিলেন।

চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয় প্রকাশ না পেলেও ইতোমধ্যে এই খবরে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার ট্রাম্প এই ‘যুগান্তকারী’ চুক্তির ঘোষণা দেন।

তিনি একে ‘ঐতিহাসিক লেনদেন’ উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুদ দ্বিগুণেরও বেশি হবে এবং ভেনেজুয়েলাকে ‘অসাধারণ সাফল্য ও ব্যাপক সমৃদ্ধির’ পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

গতকাল রোববার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে আমি যেসব কাজ করব, তার একটি হলো কৌশলগত জাতীয় রিজার্ভ পূরণ করা। স্লিপি জো বাইডেনের কারণে এটি প্রায় খালি হয়ে গেছে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এই মজুদ পূরণের প্রক্রিয়া খুব শিগগিরই শুরু হবে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য ভেনেজুয়েলার উপহার।’

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তিতে পেন্টাগনের অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটাল যুক্ত থাকবে।

সংস্থাটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত প্রকল্পে অর্থায়ন করে। এতে যুক্ত থাকবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুরের মালিকানাধীন একটি বেসরকারি কোম্পানিও।

বেতানকুর ট্রাম্প প্রশাসন ও রদ্রিগেসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

দেলসি রদ্রিগেসের যুক্তি

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস তার সরকারের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বিষয়টি জানানো হয়।

তার দাবি, চুক্তি সত্ত্বেও লাতিন আমেরিকার দেশটি তাদের বিপুল তেল মজুদের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে।

গত শনিবার টেলিভিশনে এসে চুক্তির সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেস দাবি করেন, ‘এর সুফল অন্তহীন।’

ছয় মিনিটের টেলিভিশন ভাষণে তিনি দাবি করেন, চুক্তিটি তার দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আয় করবে এবং ভেনেজুয়েলা বিশ্বে ‘জ্বালানি পরাশক্তি’ হিসেবে আবির্ভুত হবে।

‘সবাই জানেন, আমাদের দেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদ রয়েছে। কিন্তু মাটির নিচে সম্পদ থাকাই যথেষ্ট নয়। এই সম্পদকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে আমাদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজন’, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তেল মজুদ মাটির নিচে পড়ে থাকল, শুধু পরিসংখ্যান বা হিসাবের খাতায় থাকল, কিন্তু আমরা তা ভেনেজুয়েলার উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারলাম না—এতে কোনো লাভ নেই।’

টেলিভিশন ভাষণে রদ্রিগেস বিদেশি শক্তির কাছে ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ সমর্পণ করার অভিযোগ নাকচ করেন।

এই চুক্তির জন্য ট্রাম্প ও মার্কো রুবিওকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় একেবারে পরিষ্কার করা দরকার: ভেনেজুয়েলা তার সম্পদের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখছে।’

‘আমরা ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যতের কথা ভাবছি। মাদুরোর ১৩ বছরের শাসনামলে কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়ে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল’, বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাম্পের হুমকিতে চুক্তি?

৩ জানুয়ারি মাদুরোকে আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রদ্রিগেসকে সতর্ক করেছিলেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা না মানলে তাকে আরও ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সে যদি সঠিক কাজ না করে, তাহলে তাকে চড়া মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি।’

এর আগে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমসকে রদ্রিগেস বলেছিলেন, ‘ভেনেজুয়েলার মজুদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সব সময়ই পেন্টাগনের একটি কৌশলগত লক্ষ্য ছিল।’

ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে। এর পরিমাণ আনুমানিক ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল। সেই তুলনায় সৌদি আরবের মজুত ২৬ হাজার ৮০০ কোটি এবং ইরানের ২০ হাজার ৮০০ কোটি ব্যারেল।

রদ্রিগেস বলেন, চুক্তির আওতায় ১৭টি ‘কৌশলগত তেলক্ষেত্র’ রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

দেশজুড়ে সমালোচনা

তবে চুক্তিটি ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের সদস্যদের পাশাপাশি মিত্রদের মধ্যেও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মত, দেশের স্বার্থ নয়, বরং ট্রাম্পের হুমকিতে ভয় পেয়ে এই চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন দেলসি।

শুক্রবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রভাবশালী বিরোধী নেতা মত দেন, যুক্তরাষ্ট্র মাফিয়াচক্রের মতো লোভী। তারা ভেনেজুয়েলার বিশাল সম্পদ দখলের চেষ্টা করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান রাফায়েল রামিরেজ রদ্রিগেস প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘নব্য ঔপনিবেশিক’ এই চুক্তির মাধ্যমে ‘দেশের হৃদপিণ্ডে ছুরি চালানোর’ অভিযোগ করেন।

স্থানীয় একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি, আমার মনে হয় বিশ্বের অন্য কোথাও নয়।’

শনিবার বামপন্থীদের একটি গ্রুপ কারাকাসে মিছিল করেন।

চুক্তির সমালোচকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক একটি মিম ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর নাম বদলে ‘পিডিইউএসএ’ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিরোধী রাজনীতিকদের আশঙ্কা, এই চুক্তি ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ও নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টা ভেস্তে দেবে।

ভবিষ্যতে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে রদ্রিগেস অস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কোনো একদিন’ তা হবে।

ট্রাম্পও বলেছেন, ভেনেজুয়েলা নির্বাচনের জন্য ‘এখনো প্রস্তুত নয়’।

এক্সে বিরোধী নেতা হুয়ান পাবলো গুয়ানিপা লিখেছেন, ‘দীর্ঘ মেয়াদে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে পুনরুজ্জীবিত করা এবং এই চুক্তি থেকে উভয় পক্ষের লাভ নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো অবাধ নির্বাচন।

নির্বাচনের মাধ্যমে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হলে সব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নিয়ম ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, যা আমাদের সম্পদ স্বচ্ছভাবে এবং দেশের স্বার্থে ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেবে।’

গুয়ানিপা আরও বলেন, এগুলো নিশ্চিত না করে জ্বালানি চুক্তি করা ‘তাসের ঘর তৈরির মতো’ একটি ঘটনা।