এক্সপ্লেইনার

শ্যালো আর্থকোয়াক কী, এটি কেন বেশি বিপজ্জনক?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জন নিহত এবং ৭০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। 

রাজধানী কারাকাসে বহু ভবন ধসে পড়েছে, প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করতে হয়েছে এবং হাজারো মানুষ রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, দুটি ভূমিকম্পই ছিল অগভীর বা শ্যালো—যার গভীরতা ছিল যথাক্রমে প্রায় ২২ কিলোমিটার ও ১০ কিলোমিটার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অগভীরতাই ভূমিকম্প দুটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রশ্ন হলো—শ্যালো আর্থকোয়াক আসলে কী? কেন একই মাত্রার দুটি ভূমিকম্পের মধ্যে অগভীরটি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী হতে পারে?

শ্যালো আর্থকোয়াক বলতে কী বোঝায়?

ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা ফোকাস ভূপৃষ্ঠের কতটা গভীরে অবস্থিত, তার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত তিনটি ভাগ করা হয়—শ্যালো বা অগভীর ভূমিকম্প: শূন্য থেকে ৭০ কিলোমিটার গভীরতা, মধ্যবর্তী গভীরতার ভূমিকম্প: ৭০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার এবং গভীর ভূমিকম্প: ৩০০ থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত।

ইউএসজিএসের তথ্যমতে, পৃথিবীর অধিকাংশ ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পই অগভীর স্তরে ঘটে, কারণ এগুলোর উৎপন্ন শক্তি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে খুব কম দূরত্ব অতিক্রম করে। ফলে কম্পনের তীব্রতা অনেক বেশি থাকে।

ভেনেজুয়েলার সম্প্রতি জোড়া ভূমিকম্প তার একটি বাস্তব উদাহরণ। মাত্র ১০ থেকে ২২ কিলোমিটার গভীরতায় উৎপন্ন হওয়ায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রবল শক্তি রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় আঘাত হানে।

কেন অগভীর ভূমিকম্প বেশি বিপজ্জনক?

শক্তি ক্ষয় হওয়ার সুযোগ কম থাকে

ভূমিকম্পের সময় সৃষ্ট সিসমিক তরঙ্গ পৃথিবীর অভ্যন্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়। ভূমিকম্প যত গভীরে ঘটে, তরঙ্গগুলোকে তত বেশি পথ অতিক্রম করতে হয় এবং সেই যাত্রাপথে শক্তির একটি বড় অংশ ক্ষয় হয়ে যায়।

কিন্তু অগভীর ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই সুযোগ থাকে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকম্পবিদ সুসান হাফ একে তুলনা করেছেন ‘একটি শহরের ঠিক নিচে বোমা বিস্ফোরণের’ সঙ্গে। ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি হওয়ায় কম্পনের শক্তি সরাসরি মানুষের বসতি ও অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানে।

ভবন ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়

অগভীর ভূমিকম্পে মাটির অনুভূমিক ও উল্লম্ব দোলন অনেক বেশি হয়। ফলে পুরোনো ভবন, দুর্বল নির্মাণকাঠামো, সেতু, রাস্তা ও গ্যাসলাইন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভেনেজুয়েলায় কারাকাসের আলতামিরা এলাকায় ২২ তলা একটি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে, বহু বাসাবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিমানবন্দরের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একই মাত্রার একটি ৭ দশমিক ৫ ভূমিকম্প যদি ৪০০ কিলোমিটার গভীরে ঘটত, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারত।

ভূমিকম্পের পর কারাকাসের আলতামিরা এলাকায় ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

আফটারশক বা পরাঘাতের আশঙ্কা বেশি থাকে

অগভীর ভূমিকম্পের পর একই অঞ্চলে একাধিক পরাঘাত বা আফটারশক দেখা দেওয়ার প্রবণতা থাকে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, মূল দুই ভূমিকম্পের পর অন্তত ২০টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে এবং মানুষ ঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছে।

আফটারশক অনেক সময় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে, যা প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়ায়।

ভূমিধস ও মাটিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়

অগভীর ভূমিকম্প পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক ভূমিধস ঘটাতে পারে।

জাপান আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, উচ্চমাত্রার কম্পনে ভূমিতে বড় ফাটল, পাহাড়ধস ও ভূমির আকৃতি পরিবর্তনের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এ ধরনের ঝুঁকি বিশেষভাবে বিদ্যমান বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প ছিল ‘সিসমিক ডাবলেট’

ইউএসজিএসের ভাষায়, ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি ছিল একটি ‘ডাবলেট’—অর্থাৎ পরপর দুটি বড় ভূমিকম্পের যুগল ঘটনা।

প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ফোরশক বা পূর্বকম্পন আঘাত হানে। মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার মূল ভূমিকম্পটি ঘটে।

এ ধরনের ডাবলেট ভূমিকম্প বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে পড়া ভবন দ্বিতীয় আঘাতে পুরোপুরি ধসে পড়ে।

মানুষের জন্যও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় থাকে না।

পৃথিবীর কোন অঞ্চলে শ্যালো ভূমিকম্প বেশি হয়?

বিশ্বের অধিকাংশ অগভীর ভূমিকম্প টেকটোনিক প্লেটের সীমান্তে সংঘটিত হয়।

ভেনেজুয়েলা অবস্থিত ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে। এই ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে দেশটি নিয়মিত ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকে।

একইভাবে জাপান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, চিলি ও নেপালও পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে।

জাপানকে ঘিরে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এ চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের মিলন ঘটেছে। বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ ভূমিকম্প জাপানে সংঘটিত হয়।

কৌতূহলজনকভাবে ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ পরই উত্তর জাপানে ৭ দশমিক ২ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। তবে সেটির কেন্দ্র অপেক্ষাকৃত গভীরে এবং ক্ষয়ক্ষতিও সীমিত ছিল।

সব শ্যালো ভূমিকম্প কি সমান বিপজ্জনক?

না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—মাত্রা বা ম্যাগনিটিউড, গভীরতা, জনবসতির ঘনত্ব, নির্মাণমান, মাটির প্রকৃতি, সময়, আফটারশকের সংখ্যা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি।

উদাহরণ হিসেবে, সমুদ্রে সংঘটিত কোনো অগভীর ভূমিকম্প বড় সুনামি সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থলভাগে জনবসতি কম থাকলে প্রাণহানি সীমিত হতে পারে।

অন্যদিকে, একই মাত্রার ভূমিকম্প যদি ঘনবসতিপূর্ণ শহরের নিচে ঘটে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

ভেনেজুয়েলার কারাকাসে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন জরুরি সেবার সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স

ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা?

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক বিপর্যয় আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে কেবল মাত্রা নয়, গভীরতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক সময় ৬ দশমিক ৮ মাত্রার অগভীর ভূমিকম্প ৭ দশমিক ৫ মাত্রার গভীর ভূমিকম্পের চেয়েও বেশি ক্ষতি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা তাই ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোকে ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণনীতি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

কারণ পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তি কখন মুক্তি পাবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে বলা না গেলেও তার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি নেওয়া মানুষের হাতেই রয়েছে।