কেন স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে বিভিন্ন দেশ
একটা সময় ছিল যখন প্রতি আউন্স বা ২ ভরি ৫ আনা স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত হতো। বৈশ্বিক স্বর্ণের বাজার বারবার এই সীমানায় এসে থেমে যেত, আর সেটাকে ভাঙা প্রায় অসম্ভব মনে করা হতো।
এখন সময় পাল্টে গেছে। গত এক বছরে স্বর্ণের দাম এতই বেড়েছে, যা আগে কখনো কল্পনাই করা যায়নি।
এ বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫৮৯ ডলার পৌঁছায়, যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই মূল্য ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বেশি।
শুধু রেকর্ড নয়, স্বর্ণের দাম যত দ্রুতগতিতে বেড়েছে তাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন নতুন রেকর্ড হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম সিবিএসের প্রতিবেদনের বলা হয়, স্বর্ণের এই বিস্ময়কর উত্থান কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এটা কয়েকটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করার ফল।
এতে বলা হয়, বিশ্বে অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, স্বর্ণের প্রতি আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে আসে কীভাবে ঝুঁকি ও অস্থিরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভ বাড়াতে আরও বেশি করে স্বর্ণ কিনছে।
স্বর্ণের মজুত বাড়ছে কবে থেকে
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করে। এই সম্পদের বেশিরভাগই ছিল ইউরো ও ডলারে।
পশ্চিমা দেশগুলোর এই পদক্ষেপ ছিল মুদ্রাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কৌশল। তারা তাদের নিজস্ব মুদ্রাকে (ডলার-ইউরো) গলার কাঁটা হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
মস্কোকে চাপে ফেলার জন্য ডলার ও ইউরোতে রাশিয়ার বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে।
মূলত এ ঘটনা দেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও বিনিয়োগকারীরা ভয় পেয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে, ডলার বা ইউরোতে রিজার্ভ রাখা সবসময় নিরাপদ নয়। কারণ রাজনৈতিক কারণে যেকোনো সময় তা আটকে যেতে পারে।
তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বিনিয়োগকারীদের অনেকেই নিজেদের সম্পদ নিরাপদ রাখতে ডলারের বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ মজুতের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তাদের যুক্তি, স্বর্ণ যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা নয়, তাই এটি কারো পক্ষে জব্দ করা কঠিন।
এ বছর ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পুরো বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিলে এই প্রবণতা আরও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আদাম গ্লাপিনস্কি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আমাদের এই ধারণাকেই জোরালো করেছে যে—অস্থিরতাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, টানা তিন বছর ধরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে বছরে এক হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি স্বর্ণ যোগ করেছে।
রক্ষণাবেক্ষণ কষ্টসাধ্য হলেও নিরাপদ হওয়ায় স্বর্ণ মজুত বাড়াতে শুরু করে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট লুইস স্ট্রিট বলেন, ‘২০২৬ সালে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা অনেক বেড়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে এশীয় বিনিয়োগকারীরাই মূলত এই চাহিদাকে বাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
ভবিষ্যতে উচ্চ সুদের হার কিছুটা বাধা হলেও, স্বর্ণের প্রতি ঝোঁক বজায় থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কোন দেশ কত মজুত করছে
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র দেড় বছরে স্বর্ণের দাম দ্বিগুণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর চাহিদা।
গত কয়েক বছরে স্বর্ণের অন্যতম বড় ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত ও চীন।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল বলছে, গত এক বছর বিশ্বের অন্তত ১৮টি দেশ তাদের স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—চীন, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, তুরস্ক, কম্বোডিয়া, উজবেকিস্তান, মিশর, এল সালভাদর, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, মাল্টা, মঙ্গোলিয়া, ফিলিপাইন, সার্বিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইউরোভুক্ত দেশগুলো।
চীন গত এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সোনা কিনেছে মার্চে এবং একই মাসে গুয়াতেমালাও এই তালিকায় নাম লেখায়।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ১২০ মেট্রিক টনের বেশি স্বর্ণ বিক্রি বা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো তুর্কি লিরার মূল্যকে শক্তিশালী করা।
ছোট অর্থনীতির 'গোল্ড-ফরোয়ার্ড' কৌশল
কিছু দেশ তাদের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সিংহভাগই স্বর্ণে রূপান্তর করেছে। যেমন—উজবেকিস্তানের রিজার্ভের প্রায় ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ স্বর্ণ। এছাড়া চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ভেনেজুয়েলার রিজার্ভের ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ স্বর্ণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দেশগুলোর জন্য স্বর্ণ বিলাসিতা নয়, বরং মুদ্রার পতন রোধে এটিই তাদের শেষ প্রতিরক্ষা ব্যুহ।
চেক প্রজাতন্ত্রের ন্যাশনাল ব্যাংকের বোর্ড সদস্য ইয়ান কুবিচেক জানান, তিন বছর আগে ব্যাংকটি সোনার মজুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে তাদের সোনার পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ মেট্রিক টনের কম।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বসূরিরা মনে করতেন স্বর্ণ ধরে রাখার মতো সম্পদ নয়। এটিকে সেকেলে এবং ব্যবহারিক দিক থেকে অসুবিধাজনক মনে করা হতো।’
কিন্তু, ইউক্রেন যুদ্ধের পর চেক প্রজাতন্ত্রও সোনা কেনার মিছিলে যোগ দেয়। ২০২৮ সালের মধ্যে তারা ১০০ মেট্রিক টন সোনার মালিক হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
কেন স্বর্ণ মজুত করা হয়
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও অস্থিরতা: যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক উত্তেজনার সময় স্বর্ণ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুদ্রাস্ফীতি থেকে সুরক্ষা: মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে স্বর্ণ সাধারণত মূল্য ধরে রাখে।
রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণ: শুধু ডলার বা ইউরোর ওপর নির্ভর না করে রিজার্ভকে বৈচিত্র্যময় করতে সোনা রাখা হয়।
নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুবিধা: স্বর্ণ ভৌত সম্পদ হওয়ায় অন্য দেশ সহজে এটিকে ফ্রিজ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
দ্রুত নগদে রূপান্তর: জরুরি পরিস্থিতিতে স্বর্ণ অল্প সময়ের মধ্যে যে কারও কাছে বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া যায়।
মুদ্রার মান রক্ষা: দেশের মুদ্রা দুর্বল হলে স্বর্ণ বিক্রি করে বাজারে নিয়ন্ত্রণ আনা যায়।
কোনো দেশের দায় নয়: স্বর্ণ অন্য কোনো দেশের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে না, এটি নিজেই একটি সম্পদ।
বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত ও তরল: স্বর্ণ বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সহজে গ্রহণযোগ্য ও লেনদেনযোগ্য।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকায় স্বর্ণ দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ায়।
সংকটকালে নিরাপদ আশ্রয়: আর্থিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝোঁকে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এটি ধরে রাখে।
স্বর্ণের বর্তমান প্রেক্ষাপট
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও মূল্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
চাহিদা: বর্তমানে বৈশ্বিক বার্ষিক স্বর্ণের মোট চাহিদা এক হাজার ২৩১ টনে পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। পরিমাণের দিক থেকে বৃদ্ধি সামান্য হলেও, চাহিদার আর্থিক মূল্য ৭৪ শতাংশ বেড়ে ১৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আরেকটি নতুন রেকর্ড।
সরবরাহ: স্বর্ণের মোট সরবরাহ ২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২৩১ টনে দাঁড়িয়েছে। খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলনে এ বছরের প্রথম চার মাসে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, উচ্চমূল্য সত্ত্বেও পুরনো স্বর্ণ রিসাইকেল বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার হার মাত্র ৫ শতাংশ বেড়েছে।
বিনিয়োগ: খুচরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণে স্বর্ণের বার ও কয়েনের চাহিদা ৪২ শতাংশ বেড়ে ৪৭৪ টনে দাঁড়িয়েছে।
চীনের আধিপত্য: চীনে স্বর্ণের বার ও কয়েনের চাহিদা রেকর্ড ৬৭ শতাংশ বেড়ে ২০৭ টনে পৌঁছেছে। এছাড়া ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানেও কেনার হার বেড়েছে।
পশ্চিমা বাজার: আমেরিকা ও ইউরোপেও বার ও কয়েনের চাহিদা যথাক্রমে ১৪ ও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান: বছরের প্রথম তিন মাসে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্মিলিতভাবে মোট ২৪৪ টন স্বর্ণ রিজার্ভে যোগ করেছে।
তুরস্ক, রাশিয়া ও আজারবাইজানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু স্বর্ণ বিক্রি করলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংকগুলোর ক্রয় অব্যাহত রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ কৃষাণ গোপাল নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘বাজারের পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন স্বর্ণের বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন চাহিদার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ
স্বর্ণ মজুদ করা যেমন নিরাপদ, তেমনি এর কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। সোনা কোনো সুদ বা লভ্যাংশ প্রদান করে না। এছাড়া অতিমাত্রায় স্বর্ণ নির্ভরতা কোনো দেশের নগদ তারল্য সংকটের কারণ হতে পারে, যদি দ্রুত তা নগদায়ন করা না যায়।
ছবি: ব্যাংক অব ইংল্যান্ড
২০২৬ সালের স্বর্ণের রিজার্ভের মানচিত্রটি আসলে একটি নতুন পৃথিবীর মানচিত্র। এটি জানান দিচ্ছে যে, একক মেরুভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিশ্ব এখন একটি বহুমুখী ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্বর্ণই হয়ে উঠেছে প্রধান অস্ত্র।