পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬

রেকর্ড গড়লো পশ্চিমবঙ্গ, ভোট পেল কে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘ভীতি’ না ‘ভরসা’—ঠিক কোন ভাবনা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ‘হুমড়ি’ খেয়ে পড়েছিল—এটিই এখন জন্ম দিয়েছে শত আলোচনার। নানান দিক থেকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছেন শীর্ষ রাজনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ।

রেকর্ড গড়া পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোট পেল কোন দল?—এমন প্রশ্নের জবাবও মিলছে ভিন্ন ভিন্ন।

গত ২৩ এপ্রিল ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার প্রথম দফায় রেকর্ড ৯২ শতাংশ ভোট পড়ার কারণ নিয়ে একের পর এক বিশ্লেষণ প্রকাশ করে যাচ্ছে।

কারণ যাই হোক না কেন, এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নতুন নজির সৃষ্টি করেছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই, বলেও মন্তব্য করছেন অনেক।

তবে এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি ঠিক কতটা ‘স্বাস্থ্যসম্মত’ ছিল তা নিয়েও চর্চার অন্ত নেই।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ’ শেষে বিজেপির ‘বিশাল বিজয়ের’ সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন প্রথম দফা ভোটের পরদিন সকালেই।

একইদিনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতাসীন তৃণমূলের ‘ফিরে আসার’ আশা ব্যক্ত করেছেন।

গত ২৪ এপ্রিল বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—পশ্চিমবঙ্গে ‘রেকর্ড ভোটদানের’ পেছনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়, নাকি অন্য সমীকরণ?

প্রতিবেদনে বলা হয়—কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও সমাজের সব স্তরের মানুষ ভোট দিয়েছেন। জাল ভোট বা কারচুপির তেমন গুরুতর অভিযোগ আসেনি কোনো দলের পক্ষ থেকে।

এতে আরও বলা হয়, এর আগে তথা ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছিল। সেবছর ভোটের হার ছিল ৮৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।

পশ্চিমবঙ্গের সেই নির্বাচনকে ‘মাইলফলক’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজ্যটিতে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছিল।

সেই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের সেই হার দেখে এক শুনানিতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেছিলেন, ‘দেশের মানুষ ভোটদানে এগিয়ে এলে গণতন্ত্র মজবুত হয়’।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় মানুষ গণতন্ত্রকে ‘মজবুত’ করতে ভোট দিয়েছিলেন, নাকি গণতন্ত্রের ‘কোপে’ অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষায় ভোট দিয়েছিলেন, তা জানা যাবে ফল প্রকাশের দিন।

আগামী ২৯ এপ্রিল বিধানসভার দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের পর ভোট গোনা হবে ৪ মে।

এত ভোটের কারণ?

গত ২৩ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—রাজ্যে ভোটদানের গড় হার ৯২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সর্বোচ্চ ৯৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ ভোট পড়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায়।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, বিজেপিকে বিধানসভা ভোটে ‘বিশেষ সুবিধা’ পাইয়ে দিতে নির্বাচন কমিশন প্রথম দফায় সেই সব আসনে ভোটের ব্যবস্থা করেছিল যেসব আসনে গতবার বিজেপি ভালো ফল করেছিল।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে প্রথম দফা নির্বাচন হয় ১৫২ আসনে। অধিকাংশ আসন ছিল ‘উত্তরবঙ্গ’ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয়। সেখানে তৃণমূলের তুলনায় বিজেপির প্রভাব বেশি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে ১৪২ আসনে। এসব ভোট হবে ‘দক্ষিণ বঙ্গ’ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোয়।

বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, বেশি সংখ্যক আসনে ভোট হয়ে গেলেও একটি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হবে দ্বিতীয় দফার ভোটে।

তারা মনে করেন, প্রথম দফায় বিজেপি-প্রভাবিত আসনগুলোয় ভোট হয়ে যাওয়ায় দলটি অনেকটাই ভারমুক্ত। এখন তারা পুরো শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে দ্বিতীয় দফার ‘ভোট যুদ্ধে’।

একইভাবে ক্ষমতাসীন তৃণমূলকে সর্বশক্তি দিয়ে বিজেপি ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে।

আজ ২৪ এপ্রিল এবিপি আনন্দ-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ ভোটদান? কী কারণ? বিশেষজ্ঞদের কী মত?’

বিপুল সংখ্যক ভোটদানকে ‘সুনামি’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভোটার তালিকা নিবিড়ভাবে সংশোধনের পর এটি ছিল প্রথম ভোট। তাই ভোট না দিলে পরে নাম কাটা যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় মানুষ দলে দলে ভোট দিতে বের হয়েছেন।

তারা আরও মনে করেন—দ্বিতীয়ত, প্রচুর সংখ্যক ভোট পড়ার কারণ হতে পারে—তৃণমূলবিরোধী মনোভাব।

অর্থাৎ, ২০১১ সালে যেমন বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়ে বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তেমনি ২০২৬ সালে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে হয়ত তৃণমূলকে ‘তাড়ানো’র জন্য।

প্রতিবেদন অনুসারে, তৃতীয় কারণ হতে পারে যে তালিকায় মৃত বা নকল ভোটার না থাকায় মানুষ উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে গিয়েছিলেন।

যদিও সংশোধিত তালিকায় জীবিত ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা ও প্রথম দফা নির্বাচনে একজনের ভোট আরেক জনের দিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এত মানুষের ভোট দেওয়ার কারণ যাই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভায় প্রথম দফার ভোট দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘দৃষ্টান্ত’ হয়ে থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না, বলে মন্তব্য করছেন দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ।

কার ঘরে গেল ভোট?

গত ৩১ জানুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছিল—পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন বিজেপির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘এখন গোটা দেশে বিজেপি ও বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ২১টি সরকার আছে। কিন্তু, ২১টি সরকার গঠনের পরেও সারা দেশে আমাদের কর্মীরা বা আমাদের নেতা নরেন্দ্র মোদি খুশি নন।’

‘নরেন্দ্র মোদির মুখে হাসি সেদিন ফুটবে, যেদিন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জিতবে,’ যোগ করেন অমিত শাহ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ‘খুশি’ করতে দেশটির নির্বাচন কমিশনসহ সব রাষ্ট্রযন্ত্র পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিকে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ তৃণমূলপ্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

গত ২৩ এপ্রিল তথা ভোটের দিন বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক জনসভায় বলেছেন, ‘মানুষ মনে করছেন এটা তাদের অধিকার রক্ষার লড়াই। ডিলিমিটেশন (আসন-সীমা), এনআরসি (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) প্রভৃতি বিষয়ে মানুষ ভয় পেয়েছিল।’

গত ২৫ এপ্রিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘বাংলায় এবার বিজেপির ‘ডাবল সেঞ্চুরি’! প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই ২০০ পারের গ্যারান্টি হিমন্তের’।

এতে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ২০০ আসন জয় নিশ্চিত বলে দাবি করলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তার ভাষ্য: ‘পশ্চিমবঙ্গে এবার বিজেপির জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা। প্রথম দফাতেই বিজেপি ১১০ আসন পকেটে পুরে ফেলেছে।’

অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপি উভয়ই আশা করছে যে এই রেকর্ড সংখ্যক ভোট তাদের ঝুলিতেই পড়েছে।

গত ২৩ এপ্রিল জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের ‘রেকর্ড ৯২ শতাংশ ভোট পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে, কারণ কী?’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা ভোটে একটা বয়ান তৈরি হয়ে গেছে। সেটি ধর্মীয় মেরুকরণের বয়ান। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন।

এতে আরও জানানো হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের পর এর মধ্যে ধর্মীয় বয়ান চলে এসেছে। ফলে পুরো ভোটটাই কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে দুটো দলের মধ্যে। একদিকে তৃণমূল, অন্যদিকে বিজেপি।

অর্থাৎ, মূল লড়াইটা হচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে।

এতে আরও জানানো হয়—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সাধারণত কোনো রাজ্য নির্বাচনকে ঘিরে এরকম আগ্রহ দেখান না। এখানে তারা সবশক্তি এক করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই দলের মধ্যে ভোটের পার্থক্য ১০ শতাংশের একটু বেশি।

বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য—এবার ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ বাদ পড়ায় বিজেপি বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে বাদ পড়া সবাই যে তৃণমূলের ভোটার ছিলেন তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বিজেপির ঘোষণা ছিল, তারা এবার পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়বেই। তাদের ভাষ্য: মানুষ আর মমতাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে দেখতে চায় না। সরকার গড়ার কাছাকাছি সংখ্যক আসন পেলেই তারা ক্ষমতা নেবে।

ভোটারা কাকে ভোট দিয়েছেন সে বিষয়ে কেউই মুখ খুলছেন না বলেও সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করছে। তাই ভোট পরবর্তী জনমত পাওয়া যায়নি।

গত ৮ এপ্রিল তথা ভোটের আগে এপিবি আনন্দ জনমত জরিপের ওপর ভিত্তি করে এক প্রতিবেদনে জানায়—তৃণমূল পেতে পারে ১৪০ থেকে ১৬০ আসন। বিজেপি পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৫০ আসন।

সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৪৮ আসন।

এখন দেখার বিষয় এই ভোট-বিপ্লব আর জন-জোয়ারে ভেসে যায় কোন দল।

যারা এই নির্বাচনকে ‘ফুল বদলের ভোট’ বলে বিবেচনা করছেন, তারা জানতে পারবেন কোন ফুল ফোটে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জমিনে—‘ঘাসফুল’ নাকি ‘পদ্ম’। 

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সব খবর পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে।