ইরানের জন্য যত প্রতিরক্ষা কৌশল ছিল খামেনির

স্টার অনলাইন ডেস্ক

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইরানের হাল ধরেন। খোমেনি ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

যদিও পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো বিপ্লবের পেছনে আদর্শিক শক্তি ছিলেন খোমেনি, তবে খামেনি সেই সামরিক ও আধা-সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা শত্রুদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং দেশের সীমানার বাইরেও ইরানের প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করে।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে খামেনি আশির দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইরানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে ইরাককে সমর্থন দিয়েছিল পশ্চিমা শক্তি। তখন থেকেই খামেনির মনে পশ্চিমাদের প্রতি এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের জন্ম হয়।

এই মনোভাবই তার কয়েক দশকের দীর্ঘ শাসনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এই ধারণাকে সুদৃঢ় করেছিল যে ইরানকে অবশ্যই বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে।

‘ইরানস গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটিজি: অ্যা পলিটিক্যাল হিস্ট্রি’ বইয়ের লেখক ভালি নাসর বলেন, ‘অনেকে ইরানকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র মনে করে। কারণ, খামেনি পাগড়ি পরেন এবং রাষ্ট্রীয় ভাষাও ধর্মভিত্তিক। কিন্তু বাস্তবে তিনি যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে তিনি বুঝতে পারেন ইরান নিরাপত্তাহীন। যুক্তরাষ্ট্র শত্রু, আর বিপ্লব, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ আলাদা নয়—তাই এসব রক্ষা করা জরুরি।’

খামেনির এই রূপকল্পের অধীনে ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) একটি আধা-সামরিক বাহিনী থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারে মূল ভূমিকা পালন করে।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক নার্গেস বাজোগলি বলেন, ‘তিনি এমন একজন নেতা, যার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল ইরাক যুদ্ধের মাধ্যমে—এটিই তার অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়। তিনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে সামরিক ও আধা-সামরিক কাঠামো তৈরির দিকে মনোযোগ দেন।’

নব্বইয়ের দশকে ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রয়োজন বাড়লেও বিপ্লবের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। ১৯৯৭ সালে জনমতের চাপ পশ্চিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাইতে গিয়ে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির বিজয় হয়। খামেনি তা হুমকি হিসেবে দেখতেন এবং তাই তিনি নিজের অনুগত সমর্থকদের মাধ্যমে সামরিক ও আধা-সামরিক শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।

‘ইরান ফ্রেমড’-এর লেখক বাজোগলি বলেন, ‘খোমেনির তুলনায় খামেনির নিজের কোনো স্বাভাবিক জনভিত্তি ছিল না। তাই তিনি আধা-সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকা তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পুনর্গঠনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, যাতে তারা পরবর্তীতে নেতৃত্বে উঠে আসতে পারে।’

এর অর্থ ছিল আইআরজিসিকে ব্যবসার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া, যা তাদের ইরানের অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে তার আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ‘বাসিজে’র তরুণ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরও জোরদার করা হয়।  

যদিও এই বাহিনী সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল, তবে খামেনির পশ্চিমা-বিরোধী চিরস্থায়ী প্রতিরোধের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর পরিসর বাড়ানো হয়। বাজোগলি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারা লড়াই করতে এবং প্রাণ দিতেও প্রস্তুত ছিল।’


২০১৫ সালে পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে মারাত্মক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে দেশ যখন ধুঁকছিল, তখন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং নিজের শাসনের বৈধতা বাড়াতে খামেনি অর্থনৈতিক চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

তাই তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পশ্চিমের সঙ্গে আলোচনার সবুজ সংকেত দেন। ফলস্বরূপ ২০১৫ সালের ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ স্বাক্ষরিত হয়। ইরান এবং বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে সই হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

নাসর বলেন, “কখনো কখনো রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য আপস করতে হয়। খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘শান্তিও নয়, যুদ্ধও নয়’ এমন নীতি পছন্দ করতেন। তবে পারমাণবিক চুক্তিটি (যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সংকীর্ণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতদের সাথে করেছিল।’

কিন্তু সেই চুক্তি সইয়ের তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন, যা সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টায় ইতি টানে। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন করে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর খামেনি আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরে আসেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা বর্জন করেন এবং চুক্তির শর্তগুলো ধীরে ধীরে ভঙ্গ করার প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানান।

পরবর্তী কয়েক বছরে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। এই স্তর থেকে ৯০ শতাংশ বা অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা সহজ। অবশ্য ইরান জোর দিয়ে বারবার বলেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ প্রকৃতির।

প্রতিরক্ষা জোট 

খামেনি মনে করতেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ প্রতিপক্ষদের সম্ভাব্য আগ্রাসন বা সীমা লঙ্ঘন ঠেকাতে এবং ‘অগ্রভাগে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ ব্যবস্থা বজায় রাখতে দেশের বাইরেও শক্তি ও ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। এর ফলে তৈরি হয় প্রক্সি বা ছায়া সম্পর্কের এক জাল।

এর আওতায় ইরানের বাইরের মিত্রদের একটি বলয়ের কাছে অস্ত্র তৈরির জ্ঞান ও সম্পদ স্থানান্তর করা হয়। এটি ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত এবং এটি ছিল খামেনির সবচেয়ে কৌশলগত পদক্ষেপ।

এই কৌশলের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন কাসেম সোলাইমানি। তিনি খামেনির একজন কট্টর সমর্থক এবং আইআরজিসির অভিজাত শাখা ‘কুদস ফোর্সে’র কমান্ডার, যারা মূলত বিদেশের অভিযানগুলোর দায়িত্বে থাকে। ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় সোলাইমানি নিহত হন।

এই জোটের মধ্যে ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর এই ‘অক্ষ’ বা জোটটি দুর্বল হতে শুরু করে।

ইসরায়েল তখন গাজায় একটি বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু করে, যাতে এ পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

যুদ্ধে হামাসের অনেক ঊর্ধ্বতন নেতা নিহত হন। ইসরায়েল লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপরও হামলা চালায় এবং এর সেক্রেটারি জেনারেল হাসান নাসরুল্লাহসহ অনেক ঊর্ধ্বতন নেতাকে হত্যা করে।

এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটে। এর ফলে সিরিয়ার মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহকে রসদ পাঠানোর যে করিডোর ইরান ব্যবহার করত, তা বন্ধ হয়ে যায়।

ইরানের মিত্ররা দুর্বল হয়ে পড়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সুযোগটি কাজে লাগান। তিনি কয়েক দশক ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে হামলার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। গত বছরের ১৩ জুন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানে হামলা চালায়।

এর জবাবে ইরান তেল আবিবে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা নিক্ষেপ করে।

খামেনির নেতৃত্বে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ে তুলেছিল এবং চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। এই কৌশলের মাধ্যমে ইরান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন পেতে চেয়েছিল, যা আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তার অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়ক হয়েছিল।

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। উভয় পক্ষ ‘অগ্রগতি’র ইঙ্গিত দিলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জেনেভায় অনুষ্ঠিত একাধিক দফা বৈঠক শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।

ওয়াশিংটন জানায়, তাদের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমানো এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা। বিপরীতে, তেহরান বেসামরিক প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিলেও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও মিত্রদের ইস্যুতে আলোচনায় রাজি হয়নি।

এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে ফেলে। উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একটি ‘অভিযান’ শুরু করেছে। শনিবার শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানেই নিহত হন খামেনি।