যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট

স্টার অনলাইন ডেস্ক

দেশের জনপ্রিয় নেতা থেকে ঘৃণিত অপরাধী। ১৪ মাসের মধ্যে এভাবেই নিজের ভাগ্য বদলে যেতে দেখেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল। আজ দেশটির আদালত তাকে দেশদ্রোহের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে এএফপি। 

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে টিভিতে প্রচারিত ভাষণে হঠাৎ করেই দেশে সামরিক শাসন চালুর ঘোষণা দেন এককালের জনপ্রিয় এই নেতা। কারণ হিসেবে জানান, ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিদের’ দমন করতে এই উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। দেশটির পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এ কথা বলেন তিনি।

তবে তার এই ঘোষণা ভালো চোখে দেখেননি দেশের মানুষ। 

পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতারা ভোটের মাধ্যমে সে রাতেই ইউনের 'পাগলাটে' সিদ্ধান্ত বদলে দেন। 

পরবর্তীতে ৬৫ বছর বয়সী কট্টর ও রক্ষণশীল নেতাকে অভিশংসন ও গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ, আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া সহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়। 
বিচারক জি গুই-ইয়েঅন বলেন, ইউন পার্লামেন্ট ভবনে সেনা মোতায়েন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কণ্ঠরুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। 

‘আদালতের মত, তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় ধরে পার্লামেন্টকে অকেজো করে রাখার উদ্দেশ্যে এই কাজ করেন’, যোগ করেন বিচারক জি। 

South Korea

সিউলের কেন্দ্রীয় জেলা আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারপতি আরও বলেন, ‘সামরিক আইন জারি করায় দেশবাসীকে অনেক বড় মূল্য চুকাতে হয়েছে। আমরা অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো অনুতাপ খুঁজে পাইনি।’

‘আমরা ইউনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিচ্ছি’, বলেন তিনি। 

এর আগে ভিন্ন অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন ইউন। সামরিক আইন জারির পর তাকে গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়া এবং সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে এই সাজা পেয়েছিলেন তিনি। 

এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তোলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম ইয়ং-হাইউন। ইউনের সহযোগী হিসেবে তিনি ৩০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। 

ইউনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলেন কৌঁসুলিরা। জানুয়ারিতে শুনানির সময় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। 

তবে দেশটিতে অনানুষ্ঠানিক মৃত্যুদণ্ড বিরোধী নীতির প্রচলন আছে। ১৯৯৭ সালের পর দক্ষিণ কোরিয়ায় কাউকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। 

রায় ঘোষণার সময় ইউনের হাজারো সমর্থক আদালতের বাইরে অবস্থান নেন। তাদের হাতে ছিল ‘ইউন গ্রেট এগেইন’ ও ‘প্রেসিডেন্ট ইউনের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাতিল কর’ লেখা ব্যানার। 
নীল রঙের বাসে করে ইউনকে আদালতে আনা হলে অসংখ্য মানুষ চিৎকার করে ওঠেন। 
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আদালতের বাইরে বিপুল পরিমাণ রায়ট পুলিশ মোতায়েন করা হয়। 

Bus

পুলিশের সদস্যরা বেশ কয়েকটি বাস পাশাপাশি রেখে একটি অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করেন। 

দীর্ঘসময় দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ায় গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত। মিলিটারি শাসন কায়েম করে ইউনের একক আধিপত্য স্থাপনের প্রচেষ্টা দেশের মানুষকে ৬০ ও ৮০’র দশকে সেনা অভ্যুত্থানের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। 

নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন ইউন। তার দাবি, ‘স্বাধীনতার সুরক্ষা’ ও বিরোধীপক্ষের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘আইনি একনায়কতন্ত্র’ থেকে দেশকে সুরক্ষা দিয়ে সাংবিধানিক নিয়ম চালুর চেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। 

অপরদিকে, কৌঁসুলিরা তার বিরুদ্ধে ‘একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদে শাসকের ভূমিকায় থেকে যাওয়ার লালসা’ থেকে আসা ‘দেশদ্রোহিতামূলক’ কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ আনেন।  

Yoon

২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতীয় টিভিতে বক্তব্য রাখেন ইউন। দেশবাসীকে স্তব্ধ করে সামরিক আইনের ঘোষণা দেন। 

উত্তর কোরিয়ার প্রভাব ও বিপজ্জনক ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির’ অস্পষ্ট হুমকির কথা বলে সামরিক শাসন জারি করেন ইউন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বেসামরিক সরকার স্থগিত করেন।  

তবে ছয় ঘণ্টা নাগাদ আইনপ্রণেতারা জরুরি ভোটে তার ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। 

সেনা সদস্যরা যাতে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকতে না পারেন, সেজন্য আইনপ্রণেতারা দরজার সামনে বিভিন্ন ভারী আসবাবপত্র দিয়ে রাখেন। 

সামরিক আইন ঘোষণার পরই দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সিউলের পূঁজিবাজারে ধ্বস নামে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্ররাও এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ে।