দাড়ি ‘বেশি ছোট করার’ কারণে শাস্তি পাচ্ছেন আফগান নাপিতরা
বিপাকে পড়েছেন আফগানিস্তানের নাপিতরা। দেশটির তালেবান শাসকগোষ্ঠী আইন তাদের বিরুদ্ধে আইন না মানার অভিযোগ এনেছে। আফগানদের দাড়ি ‘বেশি ছোট করে’ ছাঁটার অভিযোগে শাস্তি পাচ্ছেন তারা।
আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
গত মাসে তালেবানদের নীতিনৈতিকতা–বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, এখন থেকে হাতের মুঠোর চেয়ে লম্বা দাড়ি রাখা ‘বাধ্যতামূলক’। আগের নির্দেশনার তুলনায় এবারের নির্দেশনায় ‘দ্বিগুণ’ বড় দাড়ি রাখার বিধান চালু হয়েছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
ওই দপ্তরের মন্ত্রী খালিদ হানাফি বলেন, ‘সবার বেশভূষা যাতে শরিয়াহ আইন (ইসলামিক আইন) অনুযায়ী হয়, সেটা নিশ্চিতের দায়িত্ব সরকারের।’

তিনি জানান, এই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সর্বক্ষেত্রে ইসলামিক ব্যবস্থা প্রচলন করতে বাধ্য।
ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শহরগুলোতে টহল দিয়ে এ বিষয়টি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এ বিষয়ে কয়েকজন আফগান নাপিত এএফপির সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
নাপিত ও কাস্টোমার উভয়ই বিপাকে
দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গজনী এলাকার ৩০ বছর বয়সী এক নাপিত বলেন, তাকে তিন রাত আটকে রাখে হয়েছিল। নাপিত দাবি করেন, তার সেলুনের কর্মী এক কাস্টোমারের চুল ‘পাশ্চাত্যের স্টাইলে’ কেটেছিল—এমন তথ্য জানতে পেরে কর্মকর্তারা তাকে আটক করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাকে শুরুতে একটি ঠাণ্ডা হলঘরে আটকে রাখে। মুক্তির দাবি জানানোর পর তারা আমাকে একটি ঠাণ্ডা শিপিং কন্টেইনারে স্থানান্তর করে।’

পরবর্তীতে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই তিনি মুক্তি পান। এখনো তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে টহলকর্মীদের আগাতে দেখলে তিনি লুকিয়ে থাকেন বলে জানান।
ওই নাপিত বলেন, ‘ব্যাপারটা হলো, কেউ তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না বা তাদের সঙ্গে তর্ক করতে পারে না।’
‘সবাই তাদেরকে ভয় পায়’, বলেন তিনি।
তিনি জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাপিত ও কাস্টোমার, উভয়কেই আটক করা হয়েছে।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাস্টোমারকে ছেড়ে দিলেও নাপিতকে আটক রাখা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে, মন্ত্রণালয়ের আইন ভঙ্গের অভিযোগে গত বছর কুনার প্রদেশে তিন নাপিতকে তিন থেকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
নৈতিকতা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি তালেবান ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকেও কঠোর নির্দেশনা এসেছে।
নভেম্বরে মসজিদের ইমামদের কাছে আট পৃষ্ঠার নির্দেশনা পাঠানো হয়।
সেখানে দাড়ি কেটে ফেলাকে ‘বড় ধরনের অপরাধ’ আখ্যা দেওয়ার জন্য ইমামদের নির্দেশ দেওয়া হয়। এমন কী, নামাজের খুতবার সময় তারা যেন এ বিষয়টি উল্লেখ করেন, সে নির্দেশও দেওয়া হয়।

ধর্মমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, দাড়ি কেটে পুরুষরা ‘নারীদের মতো বেশ ধারণ’ করার চেষ্টা করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, তালেবান শাসনে আফগান নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি নেই।
কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জানান, ‘প্রভাষকরা আমাদেরকে হুশিয়ার করেছেন। আমাদের বেশভূষা যদি ইসলামসম্মত না হয়, তাহলে তারা আমাদের পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দেবেন।’
ইসলামিক বেশভূষা বলতে মূলত মুখে দাড়ি ও মাথা ঢেকে রাখার বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া হচ্ছে বলে ওই শিক্ষার্থী উল্লেখ করেন।
রাজধানী কাবুলে এক নাপিত (২৫) দুঃখ করে বলেন, ‘তরুণরা ছোট করে দাড়ি কামিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু এ বিষয়টিতে অনেক বিধিনিষেধ চালু করা হয়েছে।’

‘নাপিতরা ব্যক্তি পর্যায়ে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করেন। চুল-দাড়ি কত বড় বা ছোট হবে, সেটা একেকজন মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে কারো নাক গলানো উচিৎ নয়’, যোগ করেন তিনি।
নৈতিকতা মন্ত্রী হানাফি এই যুক্তি উড়িয়ে দেন। তিনি গত মাসে বলেন, ‘শরিয়াহ আইন অনুযায়ী দাড়ি’ রাখার বিষয়ে কোনো আপত্তি শোনা হবে না। এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়।
নাপিতদের ব্যবসায় ভরাডুবি
আফগানিস্তান একটি মুসলিম প্রধান দেশ। তবে ২০২১ সালে তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসার আগে পর্যন্ত দেশটির বাসিন্দারা নিজের চেহারা ও বেশ-ভূষার সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারতেন।
শুধু যেসব এলাকায় মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে তালেবান যোদ্ধারা লড়ছিল, সেসব এলাকার তরুণরা ‘ভীতি’ থেকে লম্বা দাড়ি রাখত।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বেশিরভাগ পুরুষ দাড়ি ছোট করছেন না। যার ফলে কাবুলের নাপিতদের ব্যবসায় ভরাডুবি দেখা দিয়েছে। ২৫ বছর বয়সী কাবুলের নাপিত জানান, তার ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
তিনি জানান, বেশিরভাগ সরকারি কর্মকর্তারা প্রতি সপ্তাহে একাধিকবার চুল-দাড়ি ছোট করতে আসতেন। কিন্তু এখন তারা সবাই লম্বা দাড়ি রাখছেন। যার ফলে মাসে একবারও তারা এখানে আসছেন না।
অপরদিকে, নীতিনৈতিকতা পুলিশ প্রতিদিন তার দোকান পরিদর্শন করেন বলে জানান এক ৫০ বছর বয়সী নাপিত।
ওই নাপিত বলেন, চলতি মাসে এক কর্মকর্তা এসে তার কাছে জানতে চান, ‘এভাবে কেন চুল কেটেছেন?’
আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, যে সে একটি শিশু।
কিন্তু ওই কর্মকর্তা কোনো যুক্তি মানতে রাজি নন। তিনি বলেন, ‘ইসলামিক কায়দায় চুল কাটতে হবে। ইংরেজ চুল চলবে না।’




