বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

সংকটে জর্জরিত দেশের সর্ববৃহৎ কুষ্ঠ হাসপাতাল

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

কুষ্ঠ রোগীদের জন্য দেশের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা কেন্দ্র সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল। অথচ নানান সংকটে ভুগছে হাসপাতালটি। সম্প্রতি সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঝুঁকি নিয়ে চলছে চিকিৎসা সেবা। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে।

হাসপাতালের কর্মচারীরা জানান, বৃষ্টি এলেই হাসপাতালের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। তিনটি টয়লেটের কোনটির দরজা নেই, বাথরুমগুলোও ময়লায় পরিপূর্ণ। রোগীদের সময় কাটানোর জন্য রাখা টেলিভিশনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সেখানে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বেশিরভাগ রোগী চা-বাগানের শ্রমিক।

চিকিৎসকেরা জানান, সচেতনতার অভাবে চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশি। তারা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে তারা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ম অনুযায়ী ওষুধ খেলে কুষ্ঠরোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে দ্রুত চিকিৎসা না নিলে রোগীর বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল ৮০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও বর্তমানে কেবল ৪৮ শয্যা আছে। বেশিরভাগ সময় এগুলো ফাঁকাই থাকে।

গতকাল শনিবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি ওয়ার্ডে ১৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী।

shylet3.jpg
খসে পড়ছে দেওয়ালের পলেস্তারা। ছবি: শেখ নাসির/স্টার

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক টেকনিশিয়ান জানান, 'বর্তমানে হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ আছে। জনবল না থাকায় অভ্যন্তরীণ বিভাগের রোগীরা সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।'

এছাড়া হাসপাতালে ৫০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৯ জন। কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ জুতা তৈরিতে হাসপাতালে একজন কর্মী থাকার কথা থাকলেও গত পাঁচ বছর ধরে সেই পদটি শূন্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, 'আগে ছয়জন মিলে কাজ করেও সামাল দিতে পারতাম না। আর এখন আমরা চারজন কাজ করছি।'

হাসপাতালের প্রধান সহকারী সাব্বির আহমেদ বলেন 'ভবনের যে অবস্থা তাতে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। না জানি কখন দুর্ঘটনা ঘটে।'

shylet4.jpg
সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল। ছবি: শেখ নাসির/স্টার

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আক্তার হোসেন (৬০) বলেন, '১৪দিন আগে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। সারাদিনে একবার ডাক্তার এসে দেখে যান। এই বিল্ডিংয়ে থাকতে ভয় লাগে। কখন যে ভেঙে পড়ে কে জানে।'

হাসপাতালের স্টেটিসটিক্যাল অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, গত বছর মোট ৫৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়েছিলেন। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালেই সর্বোচ্চ ৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

১৮৯০ সালে সিলেট নগরীর শেখঘাট এলাকায় ৪ দশমিক ৭২ একর জমিতে সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে বর্তমান ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। শুরুতে একতলা ভবনে চালু করা হলেও এবং পরবর্তীতে তা তিনতলায় উন্নীত করা হয়।

জানতে চাইলে হাসপাতালটির কনসালট্যান্ট ডা. নাহিদ রহমান বলেন, 'বাংলাদেশে তিনটি কুষ্ঠ রোগের হাসপাতালগুলোর মধ্যে সিলেটের হাসপাতালটি সবচেয়ে বড়। অথচ এই হাসপাতালের অবস্থা খুবই করুণ। আমরা বারবার উচ্চপর্যায়ে চিঠি পাঠালেও কোনো কাজ হয়নি।'

shylet2.jpg
খসে পড়ছে দেওয়ালের পলেস্তারা। ছবি: শেখ নাসির/স্টার

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, 'আগে মানুষের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নিয়ে সচেতনতা তেমন ছিল না। তবে এখন সচেতনতা বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।'  

জনবল ও নানাবিধ সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা ডেপুটেশনে কিছু লোক নিয়োগ দিয়ে থাকি। ওখানে যে পরিমাণে রোগী ভর্তি হয়, তাতে লোকবল ঠিক আছে বলে মনে হয়। এছাড়া নিয়োগের ব্যাপারটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আওতাধীন। অবকাঠামোগত সংস্কারের ব্যাপারে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তারা দেখে ব্যবস্থা নেবেন। আমরা ছোট ছোট কিছু সংস্কারের কাজ করি। তবে ভবনটি অনেক পুরনো হওয়ায় বড় ধরনের সংস্কারে জটিলতা আছে।'

উল্লেখ্য, আজ বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস। প্রতিবছরের জানুয়ারি মাসের শেষ রোববার বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়।