একদিকে হাম, অন্যদিকে ডেঙ্গু: হাসপাতালগুলোর জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

প্রতিদিন হামের নয় শতাধিক রোগী ভর্তির চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

গত বছরগুলোতে হাজার হাজার ডেঙ্গু রোগীর ভার সামলানো ঢাকার বড় সরকারি হাসপাতালগুলো এখন হামের রোগীতে ঠাসা। বিশেষজ্ঞদের ভয়, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে এবং স্বাভাবিক সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দুশ্চিন্তার বড় কারণ হলো, গত বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী সামলানো ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালটি মার্চের মাঝামাঝি থেকে পুরোপুরি হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

এটি আর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করছে না, যার ফলে সম্ভবত রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালের ওপর চাপের বোঝা স্থানান্তরিত হচ্ছে।

জুন মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ এবং মৃত্যুতে ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা এ বছর এ পর্যন্ত রেকর্ড করা মোট সংক্রমণের ৪৮ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৭২ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্ষার ভরা মৌসুম অর্থাৎ জুলাই এবং আগস্ট মাসে এই উভয় সংখ্যা আরও বাড়তে পারে; যদি না ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, হামের সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে, তবে তা প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত নয়।

তিনি গতকাল বুধবার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বর্ষাকাল মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে এবং এরইমধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। এটি অবশ্যই হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট এড়াতে তিনিসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা লার্ভা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা, অস্থায়ী চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো এবং দ্বৈত রোগের চাপ সামাল দিতে স্বতন্ত্র ডেঙ্গু ইউনিট স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ডেঙ্গুর বিস্তার ও হামের দাপট

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে হাম কিংবা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে ৭১৮ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি, যাদের অধিকাংশই শিশু।

এপ্রিল ও মে মাসে পরিচালিত একটি জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ অতি-সংক্রামক এই রোগের বিস্তার ধীর করতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

টিকাদান কর্মসূচি চললেও হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী আসা তেমন কমেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জুন মাসে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৬৬। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ১০২ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ওই মাসে হাম বা হামের মতো লক্ষণ নিয়ে ২৭ হাজার ৭৪১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়, অর্থাৎ গড় ৯২৫।

১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে সর্বমোট ৮৫ হাজার ৫০৯ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে ৮১ হাজার ৮৮২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং তিন হাজার ৬২৭ জন এখনও চিকিৎসাধীন।

একই সময়ে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। উল্লেখ্য, এই বর্ষাকালই হলো এডিস মশার বংশবিস্তারের প্রধান সময়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ৬ হাজার ১০৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যার মধ্যে ২ হাজার ৯০৭ জন বা ৪৮ শতাংশই ভর্তি হয়েছেন কেবল জুন মাসে।

এ বছর দেশে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৮ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জন বা ৭২ শতাংশই মারা গেছেন জুনে। গতকাল আরও একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে আরও ১৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেন, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

তিনি সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর একটি বড় ধরনের উল্লম্ফন বা প্রকোপ দেখা দিতে পারে; বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোসহ দেশের আরও কিছু অঞ্চলে।

তিনি জেলা শহরগুলোতে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, লার্ভিসাইডিং (লার্ভা নিধন) কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

চাপের মুখে হাসপাতালগুলো

৫৫টি আইসিইউ শয্যা সংবলিত ৬০০ শয্যার ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল গত বছর ৬ হাজার ৪৮৪ ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্যে এমনটি জানানো হয়েছে। তবে হাসপাতালের নিজস্ব রেকর্ড অনুযায়ী এই সংখ্যা ৭ হাজার ২০৫।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এটিকে একটি বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে রূপান্তর করার পর থেকে এখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রূপান্তরের আগে হাসপাতালটি ৮১ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করেছিল।

গতকাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ হায়দার বলেন, আমাদের প্রতিটি তলায় হামের রোগী রয়েছে, তাই আমরা এখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করতে পারছি না। যদি কোনো ডেঙ্গু রোগী হামে আক্রান্ত হন, তবে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে

হাসপাতালটি এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৮৪ জনকে হামের চিকিৎসা দিয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৮২।

তিনি আরও যোগ করেন, ঈদুল আজহার পর হামের রোগীর সংখ্যা কমেছে, তবে তা উল্লেখযোগ্যভাবে নয়।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট গত বছর ৫৮৪ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করেছে, যদিও এর অভ্যন্তরীণ রেকর্ড অনুযায়ী এই সংখ্যা ছিল ৯১৭।

৬৮১ শয্যার এই হাসপাতালটি বর্তমানে গুরুতর হামের রোগীদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালটি ১ হাজার ৪৮৭ জনকে হামের চিকিৎসা দিয়েছে। এখনো ভর্তি ৯৯ রোগী।  

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের চাপ না থাকলে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া আরও সহজ হতো। তবে আমরা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু রোগীদের সংকুলানে হাসপাতালে একটি অস্থায়ী ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে।

দেশের বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত বছর ৩ হাজার ৭২৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নেন। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বর্তমানে ৫০ শয্যার একটি নির্ধারিত ওয়ার্ড রয়েছে।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক আশরাফুল আলম জানান, গতকাল ওই ওয়ার্ডে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। পাশাপাশি আলাদা একটি ইউনিটে আরও ৩২ জন হামের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ফজলে রাব্বি বলেন, একই সঙ্গে দুটি রোগের প্রাদুর্ভাব একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। কারণ উভয় রোগই শিশুদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে, আবার ডেঙ্গু বয়স্কদের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

তিনি আরও বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় এই রোগীদের কঠোর আইসোলেশনে রাখা জরুরি। ফলে তাদের ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, যা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

সামনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কায় তিনি শুধু ঢাকায় নয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ডেঙ্গু ইউনিট স্থাপনের জন্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিভিল সার্জনরা অংশ নেন।

যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা শয্যার ব্যবস্থা এবং ওষুধ ও স্যালাইনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা শিগগিরই আরও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশীদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার জন্য সিটি করপোরেশনগুলোকে ইতিমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ডিএনসিসি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করতে না পারার সীমাবদ্ধতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হামের সংক্রমণ আরও কমে গেলে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখবে।